
নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশজুড়ে ভেজাল ইউনানি, আয়ুর্বেদিক ও হারবাল ওষুধের ভয়ংকর বিস্তার এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য এক নীরব মহামারীতে রূপ নিয়েছে। যৌনশক্তিবর্ধক, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ও ভিটামিনের নামে বাজারে ছড়ানো হচ্ছে এমনসব ওষুধ—যেগুলো স্বল্পমেয়াদে “মিরাকল” দেখালেও দীর্ঘমেয়াদে ডেকে আনছে হৃদরোগ, লিভার ও কিডনি বিকল, এমনকি ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধি। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়—এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মাঝেও কার্যত নিশ্চুপ ভূমিকা পালন করছে তদারকির দায়িত্বে থাকা সংস্থা ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। অভিযোগ উঠেছে, লাইসেন্স দেওয়ার পর কার্যকর নজরদারির কোনো বাস্তব উদ্যোগ নেই—ফলে ভেজাল ও ক্ষতিকর ওষুধ প্রস্তুতকারীদের জন্য বাজার যেন উন্মুক্ত স্বর্গে পরিণত হয়েছে।

“হারবাল” নামে কেমিক্যাল বোমা ! অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য—অনেক প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত ভেষজ উপাদান ব্যবহার না করে সস্তা ও ঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যাল ব্যবহার করছে। বিশেষ করে: সিলডেনাফিল সাইট্রেট (ভায়াগ্রার উপাদান) ডেক্সামেথাসন (স্টেরয়েড) এসব কেমিক্যাল ব্যবহার করে “হারবাল” বা “ইউনানি” লেবেল লাগিয়ে বাজারজাত করা হচ্ছে ওষুধ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের ওষুধ ১–২ ঘণ্টার মধ্যেই কাজ করে—যা ভেষজ চিকিৎসার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের সম্পূর্ণ বিপরীত এবং ভেতরে কেমিক্যাল থাকার স্পষ্ট ইঙ্গিত।
দ্রুত ফল, ধীরে মৃত্যু : যেখানে প্রকৃত ইউনানি-আয়ুর্বেদিক ওষুধ ধীরে ধীরে কাজ করে, সেখানে এসব ভেজাল ওষুধ তাত্ক্ষণিক ফল দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলছে।

ব্যবহারকারীদের অভিযোগ : শুরুতে কার্যকারিতা পরে মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রোগের জটিলতা বৃদ্ধি, বিশেষ করে যৌনশক্তিবর্ধক ও “মোটা হওয়ার” ওষুধে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি।

কমিশনের খেলায় ভেজালের রাজত্ব : বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অনেক কোম্পানি বিক্রেতাদের ৫০% থেকে ৮০% পর্যন্ত কমিশন দিচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, আসল ভেষজ উপাদান দিয়ে এই ধরনের মুনাফা সম্ভব নয়—ফলে সস্তা কেমিক্যালই হয়ে উঠছে মূল ভরসা।
শীর্ষ ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ : অনুসন্ধানে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে (অভিযোগগুলো সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো অস্বীকার করতে পারে): আরগন ফার্মাসিউটিক্যালস ময়মনসিংহের লাইসেন্স, কিন্তু ঢাকায় কার্যক্রম, “ফার্মাসিউটিক্যালস” শব্দ ব্যবহার করে বিভ্রান্তি, ‘নাইটেক্স’, ‘রিষ্টোর’সহ অনুমোদনহীন যৌনশক্তিবর্ধক পণ্য, জিকে ফার্মা (ইউনানী), লাইসেন্স ৫০ টি, বাজারে সীমিত পণ্য, ‘কমান্ড’, ‘গোল্ডেন লাইফ’ নামে উচ্চমূল্যের ওষুধ, ডায়াবেটিস ওষুধে কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন, ন্যাচার ফার্মাসিউটিক্যালস (ইউনানী) লিঃ অনুমোদন ছাড়া উৎপাদন ও বাজারজাতের অভিযোগ, গোপন ডিপো থেকে সরবরাহের দাবি, সুরমা ফার্মাসিউটিক্যালস এর ‘আরক পুদিনা’, ‘সেব-এস’ সিরাপ নিয়ে প্রশ্ন , নমুনা পরীক্ষার রিপোর্টে বিলম্ব—সন্দেহ আরও ঘনীভূত । হামজা ল্যাবরেটরীজ,
যৌনশক্তিবর্ধক ওষুধে ভায়াগ্রার উপাদান ব্যবহারের অভিযোগ
অন্যান্য পণ্যে অ্যালোপ্যাথিক কাঁচামাল , চিত্রা ল্যাবরেটরীজ, দীর্ঘদিন ধরে নিম্নমান ও ভেজালের অভিযোগ, সিরাপ ও ভিটামিনে অতিরিক্ত কেমিক্যাল ব্যবহারের দাবি।
ফেসবুকই এখন “ওষুধের বাজার” : অভিযোগ রয়েছে, এসব কোম্পানি নিজেদের ওয়েবসাইটে তথ্য না দিয়ে ফেসবুক পেজের মাধ্যমে প্রচারণা চালাচ্ছে। এতে: নিয়ন্ত্রণহীন বিপণন, ভুয়া দাবি এবং সাধারণ মানুষের বিভ্রান্তি বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে ।
প্রশ্নের মুখে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর : সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এইসব কর্মকাণ্ড কি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চোখ এড়িয়ে চলছে, নাকি নীরব সমর্থন রয়েছে? অভিযোগগুলো হলো: লাইসেন্স দিয়ে দায় শেষ, নিয়মিত ল্যাব টেস্টের অভাব, বাজার মনিটরিং দুর্বল, প্রভাবশালী চক্রের কারণে ব্যবস্থা গ্রহণে শৈথিল্য। ফলে ভেজাল ওষুধ প্রস্তুতকারীরা কার্যত অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে।
জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে, ঐতিহ্য প্রশ্নবিদ্ধ : এই অনিয়মের ফলে শুধু মানুষের জীবনই ঝুঁকির মুখে নয়—ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শতাব্দীপ্রাচীন ইউনানি, আয়ুর্বেদ ও হারবাল চিকিৎসার বিশ্বাসযোগ্যতা।
এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নিলে ভয়াবহ পরিণতি : বিশেষজ্ঞদের জোর দাবি: নিয়মিত ও বাধ্যতামূলক ল্যাব পরীক্ষা, অনুমোদনহীন পণ্যের বিরুদ্ধে অভিযান, দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি
জনসচেতনতা বৃদ্ধি নচেৎ, “ওষুধ” নামের এই বিষ একসময় জাতীয় স্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হবে—যার দায় এড়াতে পারবে না সংশ্লিষ্ট কোনো সংস্থাই।
