“বিআইডব্লিউটিএ-তে গডফাদারের উত্থান ! ” শত শত কোটি টাকার হরিলুট, ক্ষমতার ছত্রছায়ায় নিজাম উদ্দিন পাঠানের দাপট !

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক :  নদীমাতৃক বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)—যার হাতে দেশের নদীপথ, বন্দর ও টার্মিনাল উন্নয়নের বিশাল দায়িত্ব। অথচ সেই প্রতিষ্ঠানই এখন দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও লুটপাটের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে—এমনই বিস্ফোরক অভিযোগ উঠে এসেছে একাধিক অনুসন্ধানে।


বিজ্ঞাপন

এই অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন এক সময়ের অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার, বর্তমানে প্রভাবশালী কর্মকর্তা নিজাম উদ্দিন পাঠান—যিনি আজ সংস্থার “অঘোষিত চেয়ারম্যান” ও “গডফাদার” হিসেবে পরিচিত।

নিম্নপদ থেকে ক্ষমতার শীর্ষে :  অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে চাকরি শুরু করলেও, শুরু থেকেই বড় বড় ঠিকাদারদের সঙ্গে গড়ে তোলেন ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। সেই সম্পর্কের জোরেই ধাপে ধাপে নির্বাহী প্রকৌশলীর পদ বাগিয়ে নেন। এরপর আর তাকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি—ক্ষমতা, প্রভাব আর অর্থের জোরে হয়ে ওঠেন সংস্থার অন্যতম নিয়ন্ত্রক ব্যক্তি।


বিজ্ঞাপন

সম্পদের পাহাড়: বনশ্রী থেকে নোয়াখালী  : অভিযোগ রয়েছে—নিজাম উদ্দিন পাঠানের নামে-বেনামে রাজধানীর বনশ্রী-রামপুরা এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও সম্পদের পাহাড় গড়ে উঠেছে :জে ব্লকে ২টি অ্যাপার্টমেন্ট, এস ব্লকে ১টি, সি ব্লকে ৩টি। আশপাশে অসংখ্য প্লট ও বাড়ি,  গ্রামের বাড়ি নোয়াখালী হওয়ায় স্থানীয়দের প্রতি তার কোনো তোয়াক্কা নেই বলেও অভিযোগ রয়েছে। এমনকি অফিস ও ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও রয়েছে নানা বিতর্ক ও গুঞ্জন।


বিজ্ঞাপন

৫০০ কোটি টাকার প্রকল্পে ‘নিজের আধুনিকায়ন’ :  বাঘাবাড়ি নদী বন্দর আধুনিকায়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) থাকাকালীন সময়েই মূল কেলেঙ্কারির সূচনা। অভিযোগ—প্রায় ৫০০ কোটি টাকার প্রকল্পে বড় ধরনের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—মোহাম্মদ জাফর নামের এক ঠিকাদারকে পুরো কাজ পাইয়ে দেন, বিনিময়ে প্রায় ১০০ কোটি টাকা কমিশন নেন এবং বাস্তবে কাজ না করেই বিল উত্তোলন।নগরবাড়ী-বাঘাবাড়ি প্রকল্পে মাঠপর্যায়ে কাজের অস্তিত্ব না থাকলেও কাগজে সম্পূর্ণ দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ।

ঠিকাদারদের সঙ্গে গোপন পার্টনারশিপ : অভিযোগ আরও ভয়াবহ—দুর্নীতির টাকায় ঠিকাদারদের সঙ্গে “ডেভেলপার ব্যবসা” শুরু করেন তিনি।

মোহাম্মদ জাফরের সঙ্গে যৌথ ব্যবসা :  “এস এস রহমান কোম্পানি”-র মালিক মোহাম্মদ দিপুকে প্রায় ২৪০ কোটি টাকার কাজ প্রদান এবং প্রতিটি প্রকল্প থেকেই কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ। সরকারি টাকার একটি বড় অংশ ব্যক্তিগত ব্যবসায় ঢুকে পড়েছে—এমনটাই বলছেন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।

তদন্তে নড়েচড়ে বসেছে সচিবালয়  : অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পের সব ফাইল প্রস্তুত করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, সচিবালয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা পড়েছে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, তদন্তে বিল, ভাউচার ও পেমেন্ট যাচাই করে দেখা যাচ্ছে— একই কাজের জন্য একাধিকবার বিল তোলা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে কাজ না করেই সম্পন্ন দেখানো হয়েছে।

বিআইডব্লিউটিএ-তে ‘যোগ্যতা নয়, প্রভাবই মূলধন’ : সূত্রমতে, সংস্থাটিতে দীর্ঘদিন ধরে চলছে এক অস্বাস্থ্যকর সংস্কৃতি– প্রভাব ও রাজনৈতিক পরিচয়ে নিয়োগ, “পারিবারিক কোটায়” চাকরি,
অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তার আত্মীয়দের পুনঃনিয়োগ, এবং মেধাবীদের বঞ্চনা, একজন ঠিকাদারের ভাষায়: “যে কর্মকর্তা ঠিকাদারের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখে, সেই-ই টিকে থাকে।”

হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়ম : অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও বিস্ময়কর তথ্য—- প্রায় ৫০০০ কোটি টাকার প্রকল্পে কাজ হয়েছে অর্ধেকেরও কম নিম্নমানের নির্মাণ, অসম্পূর্ণ প্রকল্প, কাগজে-কলমে উন্নয়ন, বাস্তবে শূন্যতা, নগরবাড়ী, বাঘাবাড়ী ও খানপুর পোর্ট ডেভেলপমেন্ট—সবখানেই একই চিত্র।

দুদকের নজরদারি : দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতোমধ্যেই প্রাথমিক তদন্ত শুরু করেছে। একজন কর্মকর্তা বলেন:
“রাষ্ট্রের অর্থ আত্মসাৎ প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

নীরব শীর্ষ কর্তারা : বিষয়টি নিয়ে বিআইডব্লিউটিএ-র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তাদের ভাষ্য—“তদন্তাধীন, এখনই কিছু বলা সম্ভব নয়।”

এখনই সংস্কার না হলে ভয়াবহ পরিণতি :  বিশেষজ্ঞদের মতে, অবিলম্বে যা প্রয়োজন—স্বচ্ছ নিয়োগ ও পদোন্নতি ব্যবস্থা, ডিজিটাল মনিটরিং, উন্মুক্ত অডিট রিপোর্ট এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় জবাবদিহিতা।

শেষ কথা : বিআইডব্লিউটিএ শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়—এটি বাংলাদেশের নদীপথ অর্থনীতির প্রাণ। কিন্তু যদি এই প্রতিষ্ঠানই দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়, তাহলে “নদী বাঁচাও” পরিকল্পনা কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

এখন প্রশ্ন একটাই—নিজাম উদ্দিন পাঠানের মতো ‘গডফাদারদের’ হাত থেকে কি আদৌ মুক্তি পাবে বিআইডব্লিউটিএ?

👁️ 39 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *