
নিজস্ব প্রতিবেদক : জাতীয় সংসদের ত্রয়োদশ অধিবেশনের প্রথম দিনেই ঘটে যাওয়া সাউন্ড সিস্টেম বিপর্যয় এখন শুধু যান্ত্রিক ত্রুটি নয়—এটি রূপ নিয়েছে এক সম্ভাব্য ‘বড়সড় আর্থিক কেলেঙ্কারি’র ইস্যুতে।

গত বৃহস্পতিবার ১২ মার্চ অধিবেশন চলাকালে মাইক্রোফোন বিকল হয়ে পড়লে নবনির্বাচিত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদকে হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করতে বাধ্য হতে হয়—যা দেশের সংসদীয় ইতিহাসে এক বিব্রতকর ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
স্পিকার নিজেই স্বীকার করেন, “যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে কথাবার্তা ঠিকমতো শোনা যাচ্ছে না”—এবং ২০ মিনিটের জন্য অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—এই ‘গোলযোগ’ কি সত্যিই কেবল যান্ত্রিক ?


১২ কোটি টাকার প্রকল্পে ‘ত্রুটি’, নাকি পরিকল্পিত দুর্নীতি ?প্রাথমিকভাবে জানা যায়, সংসদ ভবনের এসি, আলো ও সাউন্ড সিস্টেম আধুনিকায়নে ২৩ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব করা হলেও তা কমিয়ে ১২ কোটিতে নামিয়ে আনা হয়। এখানেই শুরু সন্দেহ। প্রকল্পে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান পি-রেশাস কমিউনিকেশনস-এর সিইও লারস ভিডেক্যামকে—যিনি ২০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ। তিনি স্পষ্টভাবে পরামর্শ দেন—পুরো সাউন্ড সিস্টেম পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই, শুধুমাত্র লুট হওয়া যন্ত্রাংশ পুনঃস্থাপন করলেই সমস্যা সমাধান সম্ভব। কিন্তু চাঞ্চল্যকরভাবে—এই পরামর্শ পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়!

৪.৫ কোটি টাকার ‘হেডফোন নাটক’ : সূত্র জানায়, সংসদে নতুন করে হেডফোন ও গুজনেক মাইক্রোফোন বসাতে খরচ হয়েছে প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা। প্রতিটি গুজনেক মাইক্রোফোন: ৫৫–৬০ হাজার টাকা এবং প্রতিটি হেডফোন: ৪–৫ হাজার টাকা। যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় অডিও ব্র্যান্ড ‘শিওর’-এর পণ্য ব্যবহার করা হয়েছে বলে দাবি করা হলেও—বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থাপনের মান ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের।
ফলাফল ? মাত্র দুই দিনের মধ্যেই পুরো সিস্টেম অচল! এখন আবার সব হেডফোন পরিবর্তনের প্রস্তুতি—অর্থাৎ আরও অর্ধকোটি টাকা গচ্চা !
“হেডফোন নয়, আসল সমস্যা কেবলে”—বিশেষজ্ঞদের বিস্ফোরক দাবি : আমাদের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও ভয়ংকর তথ্য। বিশেষজ্ঞরা বলছেন—এ ধরনের বড় ও জটিল সাউন্ড সিস্টেম সচল রাখতে প্রয়োজন উচ্চমানের বিশেষায়িত কেবল, যেমন, XLR, TRS, TS কেবল, Speakon ও Speaker Cable, RCA ও S/PDIF কেবল, এসব কেবলে থাকতে হয় অক্সিজেন-ফ্রি কপার বা সিলভার-প্লেটেড কপার এবং কোনো অবস্থাতেই জোড়া (joint) দেওয়া যাবে না।
কিন্তু অভিযোগ উঠেছে—নিম্নমানের কেবল ব্যবহার করা হয়েছে, তারে একাধিক জোড়া দেওয়া হয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ তার ‘গায়েব’ করা হয়েছে । সবচেয়ে গুরুতর বিষয়—কোনো বুয়েট পরীক্ষিত টেস্ট রিপোর্টই নেই! অর্থাৎ, জাতীয় সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ব্যবহৃত কেবল পরীক্ষা ছাড়াই বসানো হয়েছে !
ডিপিএম পদ্ধতিতে কাজ—প্রতিযোগিতা বন্ধ করে ‘নিজেদের লোক’কে সুযোগ ? অনুসন্ধানে জানা গেছে, আমানত এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি ক্রয় (DPM) পদ্ধতিতে কাজ দেওয়া হয়েছে। এতে উন্মুক্ত দরপত্রের সুযোগই রাখা হয়নি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি পরিকল্পিতভাবে ‘নিজেদের ঠিকাদার’কে কাজ পাইয়ে দেওয়ার কৌশল ?

কারা জড়িত ? পিপিআর ২০২৫ অনুযায়ী, এই প্রকল্পে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী: আশরাফুল হক, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী: মাহবুবুর রহমান, নির্বাহী প্রকৌশলী: মোঃ আনোয়ার হোসেন, তদারকির দায়িত্বে: আসিফুর রহমান ও সামসুল ইসলাম।
পুরনো ‘কেলেঙ্কারি সিন্ডিকেট’ আবার সক্রিয় ? নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে এর আগেও গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। ঢাকা ইএম বিভাগ-৫ এ থাকাকালে তিনি— ডিপিপি ভেঙে প্যাকেজ ভাগ করে, নিজের পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দিয়ে, প্রকল্পে অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, তদন্তের মুখে পড়ে একসময় তাকে বদলি করা হলেও—আবারও প্রভাব খাটিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে ফিরে আসেন ! অন্যদিকে, আশরাফুল হকের বিরুদ্ধেও রয়েছে পুরনো অভিযোগ—২০১৮ সালে সংসদে ৪৫ মিনিট বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং শাস্তিমূলক বদলির পরও দ্রুত পুনর্বহাল।

“২ কোটি টাকায় মিডিয়া ম্যানেজ!”—ভিতরে ভেতরে চাপা পড়ছে সত্য ? সবচেয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ— ঈদের আগে প্রায় ২ কোটি টাকা খরচ করে মিডিয়ার মুখ বন্ধ করা হয়েছে ! দেখা গেছে, শতাধিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত এই ঘটনার সংবাদ হঠাৎ করেই অনেক অনলাইন পোর্টাল থেকে গায়েব ! বর্তমানে হাতে গোনা কয়েকটি গণমাধ্যম ছাড়া অধিকাংশই নীরব।
তদন্ত কি সত্যিই নিরপেক্ষ হবে ? সরকার ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে—একই সিন্ডিকেটের প্রভাব থাকলে তদন্ত কতটা নিরপেক্ষ হবে?
আমাদের দাবি : জাতীয় স্বার্থে এই কেলেঙ্কারির নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। আমরা দাবি জানাই—আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি বিশেষজ্ঞ দিয়ে তদন্ত, কেবল, যন্ত্রাংশ ও স্থাপনা—সবকিছুর পূর্ণাঙ্গ অডিট, জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি এবং ভবিষ্যতে ডিপিএম পদ্ধতির অপব্যবহার বন্ধ।
শেষ কথা : সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এমন ‘সাউন্ড বিপর্যয়’ কোনো সাধারণ ত্রুটি নয়—এটি রাষ্ট্রীয় অর্থ লুটের এক সুপরিকল্পিত চিত্র হতে পারে। এখন দেখার বিষয়—তদন্তে সত্য বের হয়, নাকি আবারও চাপা পড়ে যায় কোটি টাকার এই অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনা।
