দিন যত গড়িয়েছে, রাইসার শ্বাসকষ্ট তত বেড়েছে

Uncategorized অপরাধ আইন ও আদালত গ্রাম বাংলার খবর জন দুর্ভোগ বিশেষ প্রতিবেদন মানবিক খবর রাজশাহী সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিনিধি, (রাজশাহী) :  দিন যত গড়িয়েছে, রাইসার শ্বাসকষ্ট তত বেড়েছে। ভর্তি হওয়ার দু’দিন পর চিকিৎসক তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু শহরের একটি রেস্টুরেন্টে মাত্র ১০ হাজার টাকা বেতনের চাকরি করা বাবা তখনই মেয়েকে নিয়ে যেতে পারেননি। অর্থ ছিল না, ছিল শুধু বুকভরা আতঙ্ক আর অসহায়ত্ব।


বিজ্ঞাপন

অবশেষে ১২ দিন পর বেতনের টাকা আর ধারদেনা জোগাড় করে রাজশাহী মেডিকেলে নিয়ে যান আদরের সন্তানকে। আইসিইউতে তিন দিন থাকার পর একটু সুস্থ হয়েছিল রাইসা। পরিবারের বুকেও তখন জেগেছিল আশার আলো। ১২ এপ্রিল তাকে সাধারণ ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু সুখটা স্থায়ী হয়নি। পরদিন থেকেই আবার অবনতি শুরু হয় তার অবস্থার। প্রয়োজন হলেও আর মেলেনি আইসিইউ।

শেষ পর্যন্ত ২৪ এপ্রিল নিভে যায় ছোট্ট রাইসার জীবনপ্রদীপ।
হাসপাতালের বারান্দায় বসে তখন বারবার কাঁদছিলেন মা ফাতেমা বেগম। বুকফাটা আর্তনাদে বলছিলেন, “আমার বুকের ধনটাকে একটু দেখেন… ও তো আমার সঙ্গে কথা বলছে না…”
কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। চিকিৎসক জানিয়ে দেন, রাইসা আর নেই।


বিজ্ঞাপন

সন্তান হারানোর শোক তখনও শেষ হয়নি, শুরু হয় আরেক নির্মম বাস্তবতা। মৃত শিশুটিকে বাড়িতে নিতে লাশবাহী গাড়ির সিন্ডিকেটের কাছে অসহায় হয়ে পড়েন তারা। শেষ পর্যন্ত ১২ হাজার টাকায় গাড়ি ভাড়া করে মেয়ের নিথর দেহ নিয়ে বাড়ি ফেরেন বাবা-মা।


বিজ্ঞাপন

এরপর থেকেই যেন থেমে গেছে সেই পরিবারের হাসি।
মা ফাতেমা বেগম এখন বড় মেয়েটি স্কুলে চলে গেলে হারানো সন্তানের ছবি বুকে নিয়ে বসে থাকেন। অজান্তেই ভিজে ওঠে চোখ। অন্যদিকে ছোট্ট হুমাইরা আফিয়া এখনও বিশ্বাস করে, তার বোন আকাশের তারা হয়ে গেছে। সে বলে, “তিন বছর পর একটা বোন পেয়েছিলাম। এখন আমার আর কোনো খেলার সাথি নেই।”

সন্ধ্যায় কাজ শেষে বাড়ি ফেরেন বাবা মাসুদ রানা। মেয়ের কথা উঠতেই জমে থাকা ক্ষোভ আর কষ্ট বেরিয়ে আসে তার কণ্ঠে।
“হাসপাতালে বেড নেই, নার্স নেই। ছুটির দিনে কাউকে পাওয়া যায় না। যারা থাকে, তারাও খারাপ ব্যবহার করে। এসব নিয়ে লিখতে পারবেন? আপনার লেখায় তো আমার মেয়ে ফিরে আসবে না। তবে যদি চিকিৎসাব্যবস্থা ভালো হয়, অ্যাম্বুলেন্স আর লাশবাহী গাড়ির সিন্ডিকেট ভাঙে—তবেই আমি শান্তি পাব।”

কিছুক্ষণ নীরব থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি শুধু বলেন—
“আমার মেয়ের মতো যেন আর কারও পরিণতি না হয়… কোনো বাবা-মায়ের কোল যেন এভাবে খালি না হয়।”

প্রতিবেশী ইসাহাক আলি জানান, পৈতৃক সূত্রে পাওয়া দেড় কাঠা জমিতে ছোট্ট ঘর তুলে কোনোমতে সংসার চালাতেন মাসুদ রানা। অল্প আয়ে সংসার সামলাতে গিয়ে প্রথম সন্তানের আট বছর পর দ্বিতীয় সন্তান নিয়েছিলেন তারা। সেই বহু প্রতীক্ষিত সন্তানকে বাঁচাতে শেষ সম্বলটুকুও উজাড় করে দিয়েছিলেন বাবা।
কিন্তু এক হামের আঘাতে মুহূর্তেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল একটি স্বপ্নময় পরিবার।

উল্লেখ্য, গত তিন মাসে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালে হামের উপসর্গে সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যাওয়া শিশুদের বেশিরভাগই চাঁপাইনবাবগঞ্জের বলে জানা গেছে।

👁️ 17 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *