
নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজধানীর মিরপুরে দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা একটি কথিত ভূমিদস্যু চক্র এখন নতুন রাজনৈতিক খোলসে ফিরে এসেছে—এমন বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে গফুর মোল্লা ও রহমান মোল্লা নামে দুই সহোদরের বিরুদ্ধে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, আওয়ামী সরকারের পতনের পর কিছুদিন আত্মগোপনে থাকলেও বর্তমানে ক্ষমতাসীন ঘরানার স্থানীয় প্রভাবশালীদের নাম ভাঙিয়ে ফের সক্রিয় হয়েছেন তারা।
অভিযোগ রয়েছে—ভূমি দখল, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং প্রভাব খাটিয়ে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করাই এখন তাদের মূল পেশা।

সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি ঘটেছে সাভারের বিরুলিয়ার ছোট ওয়ালিয়া মৌজায়। প্রায় সাড়ে ১১ শতক জমি বিক্রি করতে গিয়ে চরম হয়রানির শিকার হয়েছেন ভুক্তভোগী তাহমিনা আক্তার।

তার অভিযোগ, বৈধ দলিল, খাজনা, খারিজ ও নামজারি থাকার পরও গফুর ও রহমান মোল্লা জোরপূর্বক জমি আটকে দিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায়ের চেষ্টা করছেন।
দলিল-দস্তাবেজে পরিষ্কার মালিকানা, তবুও দখলচেষ্টা :
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৫ সালে আকতার হোসেন মোল্লার কাছ থেকে সাফ কাবলা দলিলের মাধ্যমে জমিটি ক্রয় করেন তাহমিনা আক্তার ও তার স্বামী মো. দুলাল। পরবর্তীতে জমির খাজনা, খারিজ ও নামজারিও সম্পন্ন হয়।
এমনকি এই জমির কাগজপত্র বন্ধক রেখে স্থানীয় কৃষি ব্যাংক থেকে ঋণও নিয়েছিলেন তারা, যা পরবর্তীতে পরিশোধ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীর বড় ভাই জার্মান প্রবাসী সাইদুল ইসলামের প্রশ্ন, “যদি জমির মালিকানা বৈধ না হয়, তাহলে কোনো ব্যাংক কীভাবে সেই জমির বিপরীতে ঋণ দেয় ?”
দলিলপত্র বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, মূল মালিকদের কাছ থেকে জমিটি ক্রয় করেছিলেন আকতার হোসেন মোল্লা, সিদ্দিক মোল্লা ও মোক্তার মোল্লা।
অর্থাৎ এটি পৈত্রিক সম্পত্তি নয়, বরং ক্রয়সূত্রে অর্জিত সম্পত্তি। ফলে গফুর ও রহমান মোল্লার ওয়ারিশ দাবির কোনো আইনগত ভিত্তি নেই বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
‘মধ্যস্থতা’র আড়ালে দখলবাজি ? অভিযোগ রয়েছে, গফুর মোল্লা স্থানীয় রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব ব্যবহার করে জমিটি জোরপূর্বক নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
যদিও গণমাধ্যমের কাছে তিনি স্বীকার করেছেন—“জমিটি আমার নয়, বড় ভাইয়ের।” তবে একই সঙ্গে তিনি “মধ্যস্থতা” করার কথা বলে বিষয়টিকে ভিন্নখাতে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
অন্যদিকে রহমান মোল্লা দাবি করেছেন, জমিটি তার। যদিও তিনি কোনো দলিল বা বৈধ কাগজপত্র প্রকাশ্যে দেখাতে পারেননি। স্থানীয়দের মতে, এ ধরনের দ্বৈত বক্তব্যই প্রমাণ করে—আইনের দুর্বলতা ও রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে জমি দখলের একটি পুরোনো কৌশলই অনুসরণ করছেন তারা।
আওয়ামী আমলে উত্থান, এখন নতুন রাজনৈতিক রঙ :
স্থানীয় সূত্র বলছে, গফুর মোল্লা ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য মাঈনুল হোসেন খান নিখিল-এর ঘনিষ্ঠ সহযোগী। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তার বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ছিল ব্যাপক। এমনকি ২০১৮ সালে মাদকসহ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন তিনি।
আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো—জুলাই গণহত্যা মামলার আসামির তালিকায়ও ছিল গফুর মোল্লার নাম। তবে মিরপুর মডেল থানার তৎকালীন ওসি মোহাম্মদ গোলাম আজমের সময় রহস্যজনকভাবে সেই তালিকা থেকে তার নাম বাদ পড়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরবর্তীতে ওই ওসির বিরুদ্ধেও ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে এবং তাকে ডিএমপি সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। স্থানীয়দের প্রশ্ন—তাহলে কি রাজনৈতিক আশ্রয় আর টাকার জোরেই বারবার আইনের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন গফুর মোল্লারা ?
আওয়ামী ফ্যাসিবাদী বলয় ভেঙে বিএনপির ছত্রছায়া ? সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে, আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ পরিচয়ে পরিচিত এই চক্র এখন বিএনপির স্থানীয় নেতাদের নাম ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, “ক্ষমতা বদলায়, কিন্তু চক্র বদলায় না। শুধু রাজনৈতিক রঙ পাল্টায়।”
ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন, সম্প্রতি স্থানীয় এক প্রভাবশালী বিএনপি নেতার নাম ব্যবহার করে ফের এলাকায় প্রভাব বিস্তার শুরু করেছেন গফুর মোল্লা। ফলে সাধারণ মানুষ আতঙ্কে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি ভয়ংকর বাস্তবতা তুলে ধরছে—যেখানে আদর্শ নয়, ক্ষমতাই হয়ে ওঠে অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়।
আইনের আশ্রয়ে ভুক্তভোগী, নীরব প্রশাসন : ভুক্তভোগী তাহমিনা আক্তার বলেন, “সারা জীবনের কষ্টের টাকা দিয়ে জমি কিনেছি। এখন তারা আমাদের জমি ভোগদখল করতে দিচ্ছে না। বিক্রিও করতে পারছি না।”
এ বিষয়ে মিরপুর মডেল থানার ওসি হাফিজুর রহমান বলেছেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন—অভিযোগ, মামলা, গ্রেপ্তার—সবকিছুর পরও কেন একই চক্র বছরের পর বছর সক্রিয় থাকে?
রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে ‘অপরাধের পুনর্জন্ম’ : এই ঘটনা শুধু একটি জমি বিরোধ নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা ভূমিদস্যু সিন্ডিকেটের নগ্ন চিত্র—যেখানে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয়ও বদলে যায়।
আওয়ামী লীগের ছত্রছায়া থেকে বেরিয়ে এখন বিএনপির নাম ভাঙিয়ে আবারও সক্রিয় হওয়ার অভিযোগ সেই পুরোনো প্রশ্নই সামনে এনেছে—বাংলাদেশে কি সত্যিই রাজনৈতিক পরিবর্তন হয়, নাকি শুধু বদলায় ক্ষমতার ব্যানার?
