!! সিনিয়র স্কেল ছাড়াই পদোন্নতির নীলনকশা !! গণপূর্তে ‘বিপ্লব সিন্ডিকেট’-এর ছত্রছায়ায় অযোগ্য ও বিতর্কিত কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বানানোর তোড়জোড়, প্রশ্নের মুখে মন্ত্রণালয়ের নীরবতা !

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সারাদেশ

গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) মোহাম্মদ সারওয়ার জাহান বিপ্লব।


বিজ্ঞাপন

নিজস্ব প্রতিবেদক :  বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত সংস্থা গণপূর্ত অধিদপ্তরে আবারও সামনে এসেছে পদোন্নতি বাণিজ্য, বিধি লঙ্ঘন, আদালতের চলমান মামলা গোপন এবং প্রশাসনিক অপতৎপরতার বিস্ফোরক অভিযোগ। বিসিএস (গণপূর্ত) ক্যাডারের ই/এম অংশের কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতা তালিকা ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি ঘিরে এখন পুরো গণপূর্ত প্রশাসনজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে।

অভিযোগ উঠেছে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) মোহাম্মদ সারওয়ার জাহান ওরফে “বিপ্লব” সরকারি চাকরি বিধি, উচ্চ আদালতের বিচারাধীন বিষয় এবং সিনিয়র স্কেল পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা উপেক্ষা করে বিতর্কিত ও অযোগ্য কয়েকজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে ৫ম গ্রেডের ঊর্ধ্বতন পদে পদোন্নতির পথ করে দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন।


বিজ্ঞাপন

আর এর পেছনে কাজ করছে কোটি টাকার ঘুষ ও আওয়ামী আমলের শক্তিশালী প্রশাসনিক সিন্ডিকেট—এমন অভিযোগও উঠেছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে।


বিজ্ঞাপন

মন্ত্রণালয়ের স্মারকেই প্রকাশ পেল বিভক্ত প্রশাসন : গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন শাখা-৭ থেকে জারি করা স্মারক নং-২৫.০০.০০০০.০০০.১৩০.১৯.০০১৭.১৮(অংশ-১)-৩৮৯, তারিখ: ১০ মে ২০২৬-এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিসিএস (গণপূর্ত) ক্যাডারের ই/এম অংশের ২৭, ২৮ ও ৩০তম ব্যাচের কর্মকর্তারা তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে যোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতির দাবিতে আবেদন করেন।

পরে গণপূর্ত অধিদপ্তরের মতামতের বিপক্ষে ও পক্ষে পৃথক আবেদন জমা পড়ে। অর্থাৎ, একই জ্যেষ্ঠতা তালিকা নিয়ে গণপূর্তের ভেতরেই তৈরি হয়েছে দ্বন্দ্ব, বিভক্তি ও অনাস্থা।

মন্ত্রণালয়ের ওই স্মারকে প্রধান প্রকৌশলী বরাবর “সুস্পষ্ট মতামত” চাওয়া হলেও অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তীতে প্রেরিত মতামতে প্রকৃত তথ্য আড়াল করে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতির পথ প্রশস্ত করার চেষ্টা করা হয়।

আদালতের মামলা ‘খারিজ’ না চলমান ? বিপরীত তথ্য দিয়ে বিভ্রান্তির অভিযোগ : গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংস্থাপন শাখা-১ থেকে ০৩ মার্চ ২০২৬ তারিখে জারি করা স্মারক নং-২৫.৩৬.০০০০.২১৫.১২.১০৭.১৮-৩৫২-এ দাবি করা হয়, ১৭টি পদ সংরক্ষণ সংক্রান্ত মামলাটি ০২/০২/২০১৫ তারিখে সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক খারিজ করা হয়েছে এবং পরবর্তীতে সেটি পুনরুজ্জীবনের আবেদনও ১৭/১২/২০২৪ তারিখে খারিজ হয়। কিন্তু এর বিপরীতে ২৭, ২৮ ও ৩০তম বিসিএস কর্মকর্তারা সচিব বরাবর দেওয়া আবেদনে দাবি করেন, মহামান্য আপিল বিভাগে Civil Petition No. 4340/2024 এখনও চলমান রয়েছে। তারা আরও উল্লেখ করেন, “Rejected for not press” মানে মামলা খারিজ নয়; বরং আবেদনকারী নতুনভাবে আবেদন করার সুযোগ রেখে আবেদন প্রত্যাহার করেছেন।

অভিযোগ উঠেছে, চলমান মামলাকে “খারিজ” দেখিয়ে মন্ত্রণালয়কে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে, যাতে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পদোন্নি‌তি সহজ হয়।

সিনিয়র স্কেল ছাড়া ৫ম গ্রেডের ওপরে পদোন্নতি—কোন আইনে ? বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (পদোন্নতির জন্য পরীক্ষা) বিধিমালা, ২০১৭।

ক্ষুব্ধ কর্মকর্তাদের দাবি, ওই বিধিমালার ৮ ধারা অনুযায়ী সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হয়ে ৫ম গ্রেডের ঊর্ধ্বতন পদে পদোন্নতি পাওয়ার সুযোগ নেই। অথচ গণপূর্ত অধিদপ্তরের একটি প্রভাবশালী চক্র উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (ই/এম) হিসেবে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত কিছু কর্মকর্তাকে বিশেষ সুবিধায় পদোন্নতির ব্যবস্থা করছে।

আবেদনকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, যেহেতু ওই কর্মকর্তাদের একই নিয়োগ বিধিমালার আওতায় ৬ষ্ঠ গ্রেড থেকে ৫ম গ্রেডে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, সেহেতু একই বিধিমালার পদোন্নতি সংক্রান্ত শর্তও তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।

কিন্তু গণপূর্ত অধিদপ্তরের মতামতে এই গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থগিতাদেশ চলাকালে নিয়োগ—তবু বৈধতা পেল কীভাবে ?
আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ চলাকালীন নিয়োগপ্রাপ্ত কিছু কর্মকর্তাকে নিয়ে।

আবেদনকারীরা প্রশ্ন তুলেছেন—যখন আদালতের আদেশে পদ সংরক্ষিত ছিল, তখন কীভাবে নিয়োগ ও যোগদানের তারিখ ০৪/০৯/২০১২, ১৮/০৯/২০১২ ও ১৯/০৯/২০১২ দেখিয়ে জ্যেষ্ঠতা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হলো?

এ বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের পাঠানো মতামতে কোনো ব্যাখ্যা না থাকায় রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে। বেতন তুলেছেন, দায়িত্ব পালন করেননি ! বিতর্কিত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ—সরকারি দায়িত্ব পালন না করেও বকেয়া বেতন উত্তোলন।

আবেদনকারীদের দাবি, যাদের নিয়োগ ও পদোন্নতির বৈধতা এখনও উচ্চ আদালতে বিচারাধীন, তাদের আরও উচ্চতর পদে পদোন্নতির প্রস্তাব প্রশাসনিক নৈতিকতার চরম লঙ্ঘন।

ঘুষের বিনিময়ে মতামত’—অভিযোগের কেন্দ্রে সারওয়ার জাহান বিপ্লব : গণপূর্তের ভেতরে এখন সবচেয়ে আলোচিত নাম মোহাম্মদ সারওয়ার জাহান ওরফে বিপ্লব।

অভিযোগ রয়েছে, বিপুল অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে তিনি বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পক্ষে মতামত দিয়ে মন্ত্রণালয়ে পত্র পাঠাচ্ছেন এবং অবৈধ পদোন্নতির নেপথ্য কারিগর হিসেবে কাজ করছেন।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, মন্ত্রণালয়ের কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তা—মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্মসচিব ও প্রশাসন শাখার কিছু সদস্য—এসব অনিয়মের বিষয়ে নীরব থেকে কার্যত বিতর্কিত পদোন্নতি প্রক্রিয়াকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন।

অতীতেও দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন বিপ্লব  :  মোহাম্মদ সারওয়ার জাহানের বিরুদ্ধে এটি প্রথম অভিযোগ নয়। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অফিস আদেশ নং-২৫.০০.০০০০.০৩৭.০১৮.২৭.০০০৩.২৫-২৩৯, তারিখ: ২৯ জুন ২০২৫ অনুযায়ী, গাজীপুর গণপূর্ত বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালে কাশিমপুর কারাগার-২ প্রকল্পের HT Cable Fault Locator মেশিন সরবরাহ সংক্রান্ত ১০ লাখ টাকার পে-অর্ডার অবৈধভাবে ক্যাশ করার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে তদন্তে প্রমাণিত হয়।

তদন্ত কমিটি অভিযোগের সত্যতা পেলেও “চাকরি জীবনের প্রথম অপরাধ” বিবেচনায় তাকে বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

এখন প্রশ্ন উঠেছে—যে কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে, তিনিই কীভাবে আবার জ্যেষ্ঠতা তালিকা ও পদোন্নতির মতো স্পর্শকাতর প্রশাসনিক বিষয়ে মূল ভূমিকা পালন করছেন ?

আওয়ামী আমলের ‘ফ্যাসিবাদী প্রশাসনিক নেটওয়ার্ক’ এখনও সক্রিয় ?  গণপূর্তের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক সিন্ডিকেট এখনও সক্রিয় রয়েছে।

সেই সিন্ডিকেটই এখনো পদোন্নতি, টেন্ডার, পোস্টিং ও জ্যেষ্ঠতা তালিকা নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের দাবি, সরকার পরিবর্তন হলেও প্রশাসনের ভেতরে থাকা সুবিধাভোগী গোষ্ঠী এখনো বহাল তবিয়তে থেকে পুরনো কায়দায় প্রভাব বিস্তার করছে।

এখন সবার চোখ মন্ত্রণালয়ের দিকে : পুরো ঘটনায় এখন বড় প্রশ্ন—গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় কি সত্যিই নিরপেক্ষ তদন্ত করবে, নাকি বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিয়ে পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হবে?

চলমান মামলা, সরকারি চাকরি বিধি, আদালতের আদেশ এবং দুর্নীতির অভিযোগ উপেক্ষা করে যদি পদোন্নতি দেওয়া হয়, তাহলে তা শুধু প্রশাসনিক বৈষম্যই নয়; বরং রাষ্ট্রীয় চাকরি ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ কর্মকর্তাদের আস্থা ধ্বংস করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গণপূর্তের অভ্যন্তরে এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—
“সিনিয়র স্কেল ছাড়া, মামলা চলমান থাকা অবস্থায়, দুর্নীতির অভিযোগ মাথায় নিয়েও কার স্বার্থে এত তড়িঘড়ি পদোন্নতির আয়োজন?”

👁️ 86 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *