
বিশেষ প্রতিবেদক : চট্টগ্রামভিত্তিক Albion Laboratories Limited এখন দেশের উদীয়মান রপ্তানিমুখী ওষুধ শিল্পের অন্যতম আলোচিত নাম। আন্তর্জাতিক মানের উৎপাদন সক্ষমতা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী জিএমপি সনদ অর্জন এবং একের পর এক বিদেশি বাজারে প্রবেশের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি যখন বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলছে, ঠিক তখনই একটি সুবিধাবাদী চক্রের বিরুদ্ধে ভয়ংকর অপপ্রচার, হুমকি ও সাইবার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ সামনে এসেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আফগানিস্তান, ইয়েমেন, কম্বোডিয়া, মিয়ানমার ও ভুটানসহ একাধিক দেশে ওষুধ রপ্তানির প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন করেছে Albion Laboratories Limited। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের এই সাফল্যকে কেন্দ্র করেই নানামুখী ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
আফগানিস্তানে প্রথম চালান, ইয়েমেনে দ্বিতীয় ধাপ : সূত্র জানায়, আফগানিস্তানের কাবুলে প্রায় ৬৬ হাজার ৬৯০ ডলারের ওষুধ রপ্তানির প্রথম চালান প্রস্তুত করেছে এলবিয়ন। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে শিগগিরই এই চালান জাহাজীকরণ করা হবে। এরইমধ্যে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান অগ্রিম অর্থও পরিশোধ করেছে। অন্যদিকে ইয়েমেনের এডেন সমুদ্রবন্দরের উদ্দেশ্যে ৫৩ হাজার ৬৫০ ডলারের ১০ ধরনের ওষুধ পণ্য পাঠানোর প্রক্রিয়াও শেষ পর্যায়ে। খুব দ্রুত ঋণপত্র খোলা হলে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক চালানও পাঠানো হবে। এছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে প্রবেশের লক্ষ্যে কম্বোডিয়া, মিয়ানমার ও ভুটানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রক্রিয়া চলছে। পরবর্তী ধাপে শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া এবং আফ্রিকার কয়েকটি দেশের বাজার বিশ্লেষণ করছে এলবিয়নের গবেষণা দল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প বর্তমানে তৈরি পোশাক খাতের পর দ্বিতীয় বৃহৎ সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত হিসেবে উঠে আসছে। সেই বাস্তবতায় চট্টগ্রাম থেকে আন্তর্জাতিক রপ্তানিকারক হিসেবে এলবিয়নের আত্মপ্রকাশ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

১০০ কর্মী থেকে ৩ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান : ১৯৯১ সালে মাত্র ১০০ কর্মী নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল Albion Laboratories Limited। প্রতিষ্ঠাতা Mohammad Nezam Uddin–এর হাত ধরে চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার একটি ভাড়া ভবনে সীমিত আকারে শুরু হয়েছিল উৎপাদন কার্যক্রম।
বর্তমানে সীতাকুণ্ডের বাড়বকুণ্ড এলাকায় প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার বর্গফুট জায়গাজুড়ে গড়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক মানের অত্যাধুনিক কারখানা।
নতুন প্রকল্প Albion Specialized Pharma Limited পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে গেলে সরাসরি প্রায় তিন হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

বর্তমান চেয়ারম্যান Raisul Uddin Soikot অস্ট্রেলিয়ায় কম্পিউটার সায়েন্সে পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরে প্রতিষ্ঠানের আধুনিকায়নে নেতৃত্ব দেন।
ব্যবস্থাপনা পরিচালক Muntahar Uddin Sakib মালয়েশিয়ায় চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি সম্পন্ন করে ব্যবসায় যোগ দেন। আর পরিচালক Tasnuva Afrin নিজেও একজন ফার্মাসিস্ট।
তাদের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি এখন অ্যান্টিবায়োটিক, ইনজেকশন, সিরিঞ্জ, ক্যাপসুল, ড্রপসহ প্রায় ৪৫০ ধরনের ওষুধ উৎপাদন করছে।
কোটি টাকার চেক, মামলা আর সাইবার অপপ্রচার : এই সাফল্যের বিপরীতে সামনে এসেছে এক বিস্ফোরক অভিযোগ। Albion Laboratories Limited–এর কর্মকর্তাদের দাবি, পাওনা অর্থ পরিশোধ এড়াতে একটি সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিকল্পিত অপপ্রচার চালাচ্ছে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন Kazi Mohammad Shahidul Hasan. : মামলার নথি অনুযায়ী, তার প্রতিষ্ঠান Innovative Pharma এলবিয়নের কাছ থেকে ওষুধ ক্রয় করে প্রায় ৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকার পাঁচটি চেক প্রদান করে। পরে নির্ধারিত সময়ে সেই চেকের অর্থ পরিশোধ না হওয়ায় আদালতে পৃথক মামলা দায়ের করা হয়।
এরপর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ফেইক আইডি ব্যবহার করে এলবিয়নের চেয়ারম্যান ও কোম্পানির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অপপ্রচার, মানহানিকর পোস্ট এবং হুমকির ঘটনা ঘটতে থাকে বলে অভিযোগ করেন এলবিয়নের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক Mohammad Rafiq Ahmad।
মামলায় আরও যাদের অভিযুক্ত করা হয়েছে তারা হলেন—Md. Jahidul Karim Rimon. Md. Shawkat Ali Rifat. Kazi Mohammad Rubaidul Hasan &
Kamal Hossain.
আদালতের হস্তক্ষেপ, তদন্তে কাউন্টার টেররিজম ইউনিট :
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় Chattogram Cyber Tribunal মামলাটি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। আদালতের নির্দেশে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটকে তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের গ্রহণযোগ্যতা যখন বাড়ছে, তখন একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার দেশের সামগ্রিক রপ্তানি ভাবমূর্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
“Made in Bangladesh” ওষুধকে বিশ্বমঞ্চে নিতে চায় এলবিয়ন : চেয়ারম্যান Raisul Uddin Soikot বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা অত্যন্ত কঠিন হলেও বাংলাদেশের ওষুধকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করাই তাদের লক্ষ্য। তিনি জানান, সরকারের ১০ শতাংশ রপ্তানি প্রণোদনা এবং আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণের কারণে বাংলাদেশের ওষুধের প্রতি বিদেশি বাজারে আস্থা বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চট্টগ্রামভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান যখন আন্তর্জাতিক ফার্মাসিউটিক্যাল বাজারে জায়গা করে নিতে শুরু করেছে, তখন সেই সাফল্যকে ঘিরে স্বার্থান্বেষী মহলের সক্রিয় হয়ে ওঠা অস্বাভাবিক নয়।
তবে শিল্প সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সাইবার অপপ্রচার ও ভয়ভীতি নয়—গুণগত মান, স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক সক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের ভবিষ্যৎ।
