১০ম গ্রেডের কর্মকর্তা থেকে শতকোটি টাকার সাম্রাজ্য ! রাজউকের ইমারত পরিদর্শক মনিরুজ্জামানকে ঘিরে বিস্ফোরক অভিযোগ, দুদকের তদন্ত শুরু !

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক :  মাত্র সাত বছরের সরকারি চাকরি। পদমর্যাদা ১০ম গ্রেডের ইমারত পরিদর্শক। অথচ অভিযোগ উঠেছে, ঘুষ, ক্ষমতার অপব্যবহার, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং অবৈধ আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন রাজউকের ইমারত পরিদর্শক মো. মনিরুজ্জামান। চলমান অনুসন্ধান ও বিভিন্ন অভিযোগের তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এমন বিস্ময়কর সব তথ্য, যা অনেকের কাছে আলাদিনের চেরাগের গল্পকেও হার মানায়।


বিজ্ঞাপন

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় নিজের, স্ত্রীর এবং ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজনের নামে বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

রাজধানীজুড়ে ফ্ল্যাট ও সম্পদের বিস্তৃত তালিকা  : অভিযোগ অনুযায়ী, উত্তরা সেক্টর-১৭ এর রোড নং ৬/সি, ব্লক-জি-১, আরএস দাগ-২০৩৪১ এলাকায় অবস্থিত রয়েল টাওয়ার (Royal Tower)-এ রয়েছে তার ১,৫০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট। একই এলাকার পলিএনথিউচ (Polyanthus) সেতু প্রজেক্টে রয়েছে আরও একটি ১,৫০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট। তুরাগের মধ্যপাড়া, বাদলদি, বাউনিয়া এলাকায় অবস্থিত বাদলদি হাইটস (Badaldi Heights) নামের ভবনে রয়েছে ১,২০০ বর্গফুটের আরেকটি ফ্ল্যাট। মিরপুরের ৬০ ফুট পীরেরবাগের আমতলা টাওয়ারে রয়েছে ১,৬৩০ বর্গফুটের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট।
এছাড়া মহাখালীর স্কুল রোডে গ-৩৬, ফলকন টাওয়ারে রয়েছে প্রায় ১ কোটি ৫ লাখ টাকা মূল্যের ১,২০০ বর্গফুটের আরেকটি ফ্ল্যাট। শুধু ফ্ল্যাটই নয়, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ২১ নম্বর ওয়ার্ডের বাউপাড়া মৌজার আরএস দাগ নং-১১০ এ ওএইচএন এন্টারপ্রাইজের পক্ষে ২৫০ শতাংশ জমির মালিকানা রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে, যার বাজারমূল্য ৩ কোটিরও বেশি।


বিজ্ঞাপন

নিজ গ্রামেও অঢেল সম্পদের অভিযোগ : অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, নিজ গ্রামে নিজের নামে, স্ত্রীর নামে এবং আত্মীয়-স্বজনের নামে বিপুল পরিমাণ জমি ও সম্পদ রয়েছে, যার পূর্ণাঙ্গ তথ্য তদন্তসাপেক্ষ।


বিজ্ঞাপন

এর মধ্যে বাউফল উপজেলার কালিশুরী ইউনিয়নের বড় আড়াইনাও মৌজার এসএ খতিয়ান নং-৮৯ এর আওতায় ৬৬ দশমিক ৭০ শতাংশ জমির মালিকানার তথ্য পাওয়া গেছে।

স্ত্রীর নামে কোটি টাকার সম্পদ  : মনিরুজ্জামানের স্ত্রী কানিজ জাহানের নামে বরিশাল সিটি করপোরেশনের বগুড়া আলেকান্দা মৌজার এসএ ২৪১৬৮ নং খতিয়ানের ৬১৯৩ নং দাগে ৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ জমি রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৬ কোটি টাকা। জানা গেছে, ওই জমিতে ১৩ তলা ভবন নির্মাণের জন্য বরিশাল সিটি করপোরেশন থেকে ছাড়পত্র ও নকশা অনুমোদন গ্রহণ করে নির্মাণকাজ শুরু করা হয়েছে।

বাংলামটরে বিলাসবহুল আবাসন  : রাজধানীর বাংলামটর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র সড়কে সারিনা আশরাফ নিবাসের নবম তলার ৯সি নম্বর ফ্ল্যাটেও বসবাস করেন মনিরুজ্জামান। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা মূল্যের ১,২০০ বর্গফুট আয়তনের এই ফ্ল্যাটে ব্যয়বহুল ইন্টেরিয়র করা হয়েছে।

‘নোটিশ বাণিজ্য’ ছিল প্রধান অস্ত্র  ? রাজউকের একাধিক কর্মকর্তা, নির্মাণসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং ভবন মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিভিন্ন এলাকায় দায়িত্ব পালনকালে নোটিশ জারিকে কেন্দ্র করে একটি অভিযোগিত আর্থিক সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন মনিরুজ্জামান।

অভিযোগ রয়েছে, ভবন মালিকদের নোটিশ দিয়ে পরে তা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আশ্বাসের বিনিময়ে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হতো।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্মাণখাতে একটি সময় ‘২সি মনির’ নামটি ২০ লাখ টাকার প্রতিশব্দে পরিণত হয়েছিল।

অভিযোগকারীদের দাবি, যারা এসব দাবি মেনে নিতেন না, তাদের ভবনে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা এবং বুলডোজার অভিযানের ভয় দেখানো হতো।

ট্রান্সকম গ্রুপের ভবন ঘিরেও অভিযোগ : মনিরুজ্জামান এর আগে রাজউকের জোন-৩/১ এর কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, কাফরুল ও ৬০ ফিট এলাকা এবং পরে জোন-১ এর গাজীপুর এলাকায় দায়িত্ব পালন করেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, গাজীপুরে দায়িত্ব পালনকালে ট্রান্সকম গ্রুপের একটি ভবনকে কেন্দ্র করে এক বন্ধুকে ম্যাজিস্ট্রেট পরিচয় দিয়ে এবং কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে ৬০ লাখ টাকা দাবির অভিযোগ উঠেছিল।

সূত্রগুলো আরও জানায়, বিষয়টি সে সময় রাজউকের তৎকালীন চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান পর্যন্ত গড়ালেও শেষ পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন : ২০১৮ সালে রাজউকে নিয়োগপ্রাপ্ত ইমারত পরিদর্শকদের মধ্যে মনিরুজ্জামান প্রথম স্থান অর্জন করেন। তবে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক সরকারের প্রভাবশালী মহলের আশীর্বাদে তিনি লিখিত পরীক্ষায় অস্বাভাবিক উচ্চ নম্বর পেয়েছিলেন।

রাজউকের তৎকালীন প্রশাসন-১ বিভাগের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের আলোচনার সূত্র ধরে জানা যায়, মৌখিক পরীক্ষায় সন্তোষজনক উত্তর দিতে না পারলেও তিনি চূড়ান্তভাবে প্রথম স্থান অধিকার করেন, যা নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপি—পরিচয় বদলের অভিযোগ :
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, নিয়োগের সময় মনিরুজ্জামান নিজেকে ছাত্রলীগের সাবেক কর্মী হিসেবে পরিচয় দিতেন।
তবে ২০২৫ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি নিজেকে বিএনপির সমর্থক হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচির ছবি সঙ্গে রাখেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

দুদকের তদন্ত শুরু   : রাজউকের দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত ১৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে চলমান অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধেও তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে সহকারী পরিচালক মো. নুর আলম সিদ্দিকীকে তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। সূত্র জানায়, তার বিরুদ্ধে প্রায় ২০০টি ফাইল সংশ্লিষ্ট অনিয়মের লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। একই সঙ্গে রাজউকের প্রশাসন বিভাগ থেকেও অভিযোগগুলো যাচাইয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

কি বলছে রাজউক ? এ বিষয়ে রাজউকের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার রিয়াজুল ইসলাম বলেন, “দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে রাজউকের অবস্থান পরিষ্কার।

দুদক চার্জশিট দিলে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে আমরা এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছাইনি।”

তিনি আরও বলেন, “অভিযোগ যে কারও বিরুদ্ধে থাকতে পারে। অভিযোগ যাচাই করতে হবে। অনেক সময় ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণেও অভিযোগ আসে। তাই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে চূড়ান্ত মন্তব্য করা ঠিক হবে না।”

তদন্তের কেন্দ্রে সম্পদের উৎস  : দুদক সূত্র জানিয়েছে, তদন্ত বর্তমানে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এ পর্যায়ে মনিরুজ্জামানের সম্পদের উৎস, ক্রয়মূল্য, ব্যাংক হিসাব, আর্থিক লেনদেন, ভূমি রেকর্ড এবং সম্পদের প্রকৃত মালিকানা যাচাই করা হচ্ছে।

অন্যদিকে উত্তরা, মিরপুর ও মহাখালী এলাকার একাধিক ভবন মালিক পরিচয় গোপন রাখার শর্তে অভিযোগ করেছেন, “নোটিশ পাওয়া মানেই মনিরুজ্জামানের টেবিলে হাজিরা। এরপর আলোচনা হতো—টাকা দেবেন, নাকি ভবনে বুলডোজার নামবে।”

জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন :  রাজধানীর নির্মাণখাত, ইমারত নিরাপত্তা এবং নগর পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা হিসেবে মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো এখন জনস্বার্থের বিষয় হয়ে উঠেছে।

একজন ১০ম গ্রেডের সরকারি কর্মকর্তা যদি সত্যিই অল্প কয়েক বছরের ব্যবধানে শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়ে থাকেন, তবে তা শুধু ব্যক্তিগত দুর্নীতির নয়, বরং একটি বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের ইঙ্গিত বহন করে। এখন দুদকের তদন্তই নির্ধারণ করবে—এসব অভিযোগ নিছক গুঞ্জন, নাকি বাস্তবতার নির্মম প্রতিচ্ছবি।

সম্পাদকের নোট : প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগসমূহ বিভিন্ন সূত্র, অভিযোগপত্র ও অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে উপস্থাপিত হয়েছে। দুদকের তদন্ত চলমান আছে ।

👁️ 404 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *