
প্রফেসর ড. আসিফ মিজান. : জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে জর্জরিত সমকালীন বিশ্বে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা কেবল কোনো সাময়িক বা আবেগতাড়িত কর্মসূচি নয়, বরং এটি মানবসভ্যতার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক অনিবার্য রাজনৈতিক ও সামাজিক লড়াই। বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণের লাগামহীন বৃদ্ধি, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং এর ফলে সৃষ্ট প্রাকৃতিক বিপর্যয় আমাদের বাধ্য করছে নতুন করে ভাবার।

বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও ভৌগোলিক ঝুঁকির মুখে থাকা দেশের জন্য পরিবেশের সুরক্ষাই ভবিষ্যৎ টেকসই উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। এই প্রেক্ষাপটে, তরুণ সমাজের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা তৈরি এবং সরাসরি তাদের সম্পৃক্তকরণের মাধ্যমে যে কোনো সবুজ উদ্যোগ রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাঠামোর জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।
সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুর বন্ধুসভার উদ্যোগে আয়োজিত ‘বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি’ এবং শিক্ষার্থীদের মাঝে ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা বিতরণের প্রথম ধাপের প্রয়াসটি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। গত ২৫ জুন মিরপুরের ন্যাশনাল বাংলা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত এই কর্মসূচি কেবল কিছু চারা বিতরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক গুরুত্ব সুদূরপ্রসারী।

উক্ত অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম বর্তমান বৈশ্বিক সংকটের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন,
“একটি সবুজ ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তুলতে বৃক্ষরোপণের কোনো বিকল্প নেই।

বর্তমান সময়ে পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বব্যাপী যে সংকট সৃষ্টি হয়েছে, তা মোকাবিলায় ব্যাপক হারে বৃক্ষরোপণ প্রয়োজন। তবে শুধু গাছ লাগালেই হবে না, প্রতিটি গাছের পরিচর্যা ও সংরক্ষণের দায়িত্বও নিতে হবে।”
শিক্ষকের এই বক্তব্যটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, পরিবেশ রক্ষায় কেবল সাময়িক আবেগ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ববোধ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
রাজনীতি ও সমাজ বিশ্লেষকের দৃষ্টিকোণ থেকে আমি মনে করি, জলবায়ু কূটনীতি ও পরিবেশের রাজনীতিতে (Green Politics) তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এখন সময়ের দাবি। কারণ, আজকের তরুণরাই আগামী দিনের নীতিনির্ধারক।
এই দর্শনের প্রতিধ্বনি পেয়েছি মিরপুর বন্ধুসভার উপদেষ্টা অপূর্ব বড়ুয়ার বক্তব্যে। শিক্ষার্থীদের হাতে চারা তুলে দেওয়ার সময় তিনি এক গভীর আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের নেতৃত্ব দেবে। তাদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারলে ভবিষ্যতে একটি সবুজ ও সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। প্রত্যেক শিক্ষার্থী একটি করে গাছ লাগাবে এবং তার যত্ন নেবে—এই প্রত্যাশা থেকেই আমাদের এ উদ্যোগ।”
প্রকৃতি ও মানবজীবনের আন্তঃসম্পর্ককে তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক জায়গা থেকে ব্যাখ্যা করেছেন এই কর্মসূচির সমন্বয়ক তানিয়া হক। পরিবেশের সামগ্রিক ভারসাম্যের প্রশ্নে তাঁর বক্তব্যটি অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, “বৃক্ষ শুধু পরিবেশের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে না, বরং অক্সিজেন সরবরাহ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই প্রত্যেক নাগরিককে বৃক্ষরোপণে এগিয়ে আসতে হবে।” তাঁর এই আহ্বান প্রতিটি সচেতন নাগরিকের অন্তরে নাড়া দেওয়ার মতো।
এই সবুজ অভিযাত্রার ধারাবাহিকতা রক্ষায় মিরপুর বন্ধুসভার সদস্যরা যে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তারা জানান, এই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও এলাকায় পরিচালিত হবে। প্রথম ধাপে শিক্ষার্থীদের মাঝে চারা বিতরণের মাধ্যমে কর্মসূচি শুরু হলেও পরবর্তী সময়ে ব্যাপক পরিসরে বৃক্ষরোপণ এবং পরিচর্যা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। এই প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতাই যেকোনো সামাজিক আন্দোলনকে সফল করে তোলে।
সবচেয়ে আশার কথা হলো, শিক্ষার্থীরাও এই মহতী উদ্যোগকে সানন্দে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের প্রত্যয়দীপ্ত কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে যে, গাছ লাগানোর পাশাপাশি তারা নিয়মিত এর পরিচর্যা করবে এবং অন্যদেরও বৃক্ষরোপণে উৎসাহিত করবে।
একটি দেশের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ আবাসভূমি বিনির্মাণে এই ধরনের তৃনমূল পর্যায়ের উদ্যোগগুলোই চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। মিরপুর বন্ধুসভার এই সবুজ অভিযাত্রাকে আমি সাধুবাদ জানাই।
স্থানীয় গণ্ডি পেরিয়ে এই চেতনা সারা দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়ুক। প্রতিটি শিক্ষার্থীর হাতের চারাটি হয়ে উঠুক আগামী দিনের সমৃদ্ধ, সুশীতল ও সবুজ বাংলাদেশের প্রতীক। রাষ্ট্র, সমাজ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ—সবার সমন্বিত প্রয়াসেই গড়ে উঠুক আমাদের স্বপ্নের বাসযোগ্য পৃথিবী। আমরাই গড়বো “সবার আগে বাংলাদেশ”।
লেখক: প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, ভাইসচ্যান্সেলর, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া এবং বিশিষ্ট রাজনীতি ও সমাজ বিশ্লেষক।
