নিজস্ব প্রতিনিধি, (গাইবান্ধা) : সরকারি বদলির আদেশ জারি হয়েছে। নতুন কর্মস্থলে যোগ দিয়েছেন বদলিকৃত কর্মকর্তা। কিন্তু এরপরও পুরোনো কর্মস্থলের চেয়ার ছাড়তে নারাজ—এমন অভিযোগ উঠেছে গাইবান্ধা জেলা পরিষদের উপসহকারী প্রকৌশলী মোঃ হারুনুর রশিদ-এর বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন ও পরবর্তী অফিস আদেশ উপেক্ষা করে তিনি গাইবান্ধা জেলা পরিষদে বহাল থাকার চেষ্টা করছেন এবং নতুন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিচ্ছেন না।

এ নিয়ে জেলা পরিষদের প্রশাসনিক কার্যক্রমে জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি আদেশের পরও একজন কর্মকর্তা কীভাবে পুরোনো কর্মস্থলে দায়িত্ব আঁকড়ে থাকতে পারেন—এ প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে।
মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বদলি : স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের জেলা পরিষদ শাখা থেকে ২৩ জুলাই ২০২৬ তারিখে জারি করা প্রজ্ঞাপনে দুই উপসহকারী প্রকৌশলীকে বদলি করা হয়।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, গাইবান্ধা জেলা পরিষদের উপসহকারী প্রকৌশলী মোঃ হারুনুর রশিদকে জয়পুরহাট জেলা পরিষদে এবং জয়পুরহাট জেলা পরিষদের উপসহকারী প্রকৌশলী মোঃ আমিনুল ইসলামকে গাইবান্ধা জেলা পরিষদে বদলি করা হয়।
প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে জনস্বার্থে জারিকৃত এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।” অর্থাৎ আদেশটি কার্যকর হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট দুই কর্মকর্তার নিজ নিজ নতুন কর্মস্থলে দায়িত্ব গ্রহণের কথা।
নতুন কর্মকর্তা যোগ দিলেন, পুরোনো কর্মকর্তা কেন ছাড়ছেন না ? মন্ত্রণালয়ের বদলি প্রজ্ঞাপনের পর জয়পুরহাট জেলা পরিষদ থেকে বদলিকৃত উপসহকারী প্রকৌশলী মোঃ আমিনুল ইসলামকে ২৬ জুলাই ২০২৬ তারিখের অফিস আদেশের মাধ্যমে পূর্বাহ্নে অবমুক্ত করা হয়।
এরপর তিনি ২৭ জুলাই ২০২৬ তারিখে গাইবান্ধা জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর যোগদানপত্র দাখিল করেন।
যোগদানপত্রে তিনি উল্লেখ করেন, মন্ত্রণালয়ের ২৩ জুলাইয়ের বদলি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী তাকে জয়পুরহাট জেলা পরিষদ থেকে গাইবান্ধা জেলা পরিষদে বদলি করা হয়েছে। পরবর্তীতে জয়পুরহাট জেলা পরিষদের অফিস আদেশের মাধ্যমে তাকে অবমুক্ত করা হয় এবং সে অনুযায়ী তিনি ২৭ জুলাই পূর্বাহ্নে গাইবান্ধা জেলা পরিষদে যোগদান করেন।
অর্থাৎ নতুন কর্মস্থলে যোগদানের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করেছেন আমিনুল ইসলাম। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, বিপরীত চিত্র গাইবান্ধায়।
দায়িত্ব বুঝিয়ে না দেওয়ার অভিযোগ : সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, গাইবান্ধা জেলা পরিষদ থেকে জয়পুরহাটে বদলি হওয়া হারুনুর রশিদ এখনো গাইবান্ধা ছাড়ছেন না। শুধু তাই নয়, তিনি নতুন কর্মকর্তার কাছে দায়িত্ব বুঝিয়ে না দিয়ে নানা তদবিরে ব্যস্ত সময় পার করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, সরকারি প্রজ্ঞাপন এবং নিজ দপ্তরের অফিস আদেশ কার্যকর হওয়ার পরও এভাবে পুরোনো কর্মস্থলে থাকার চেষ্টা প্রশাসনিক শৃঙ্খলার জন্য গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করছে।
সূত্রের আরও অভিযোগ, হারুনুর রশিদ নিজেকে প্রভাবশালী মনে করে বদলির আদেশকে উপেক্ষা করছেন। যদিও তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
‘বদলি’ কি শুধু কাগজেই ? এ ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে—মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপন এবং সংশ্লিষ্ট অফিস আদেশ যদি বাস্তবায়নই না হয়, তাহলে সরকারি প্রশাসনিক আদেশের কার্যকারিতা কোথায়?
২৩ জুলাইয়ের প্রজ্ঞাপনে একদিকে হারুনুর রশিদকে জয়পুরহাটে পাঠানো হয়েছে, অন্যদিকে আমিনুল ইসলামকে গাইবান্ধায় পদায়ন করা হয়েছে। আমিনুল ইসলাম নতুন কর্মস্থলে যোগদানও করেছেন। তাহলে তার দায়িত্ব গ্রহণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলে এর দায় কার?
সংশ্লিষ্টদের মতে, একজন কর্মকর্তার বদলির পর তাকে অবমুক্ত করা এবং নতুন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক দায়িত্বের অংশ। এ ক্ষেত্রে কোনো কর্মকর্তা ব্যক্তিগত প্রভাব বা তদবিরের মাধ্যমে সরকারি আদেশ বাস্তবায়ন বিলম্বিত করলে তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ দাবি : গাইবান্ধা জেলা পরিষদের স্বাভাবিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে যোগদানকারী উপসহকারী প্রকৌশলী মোঃ আমিনুল ইসলামকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
একই সঙ্গে সরকারি বদলি প্রজ্ঞাপন বাস্তবায়নে কোনো কর্মকর্তা ইচ্ছাকৃতভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছেন কি না, সেটিও তদন্তের দাবি উঠেছে।
কারণ প্রশ্নটি শুধু একজন প্রকৌশলীর বদলি নিয়ে নয়—প্রশ্নটি সরকারি আদেশের কর্তৃত্ব, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা এবং দায়িত্ব হস্তান্তরের স্বচ্ছতা নিয়ে।
সরকারি প্রজ্ঞাপন কার্যকর হওয়ার পরও যদি কোনো কর্মকর্তা পুরোনো কর্মস্থলের দায়িত্ব আঁকড়ে থাকেন, তাহলে সেটি নিছক বদলি-সংক্রান্ত জটিলতা নয়; বরং প্রশাসনিক কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার অভিযোগ হিসেবেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।
এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ২৩ জুলাইয়ের প্রজ্ঞাপন এবং পরবর্তী অফিস আদেশ বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেয় কি না, নাকি সরকারি আদেশের ওপর ব্যক্তিগত প্রভাব ও তদবিরই শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়।
👁️ 18 News Views
