
গণপূর্ত অধিদপ্তরের বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী মো : খালেকুজ্জামান চৌধুরী।

নিজস্ব প্রতিবেদক : গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী (রুটিন দায়িত্ব) খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে ঘিরে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন এবং পরবর্তী সময়ে দেওয়া প্রতিবাদপত্রকে কেন্দ্র করে অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে নতুন করে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। একদিকে প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে বদলি বাণিজ্য, অর্থ লেনদেন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তুলে প্রকাশিত সংবাদ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা ও প্রকৌশলী। অন্যদিকে অভিযোগকারীদের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, বিষয়গুলো নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য, প্রধান প্রকৌশলীর পদকে ঘিরে দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ প্রভাব বিস্তার ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবেই সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে দেখা হচ্ছে। তাদের দাবি, খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে সরিয়ে একটি নির্দিষ্ট মহল নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিকে ওই পদে বসানোর জন্য পরিকল্পিতভাবে নেতিবাচক প্রচারণা চালাতে পারে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

প্রতিবেদন নিয়ে প্রশ্ন, একপাক্ষিক উপস্থাপনের অভিযোগ :
অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, প্রকাশিত প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক প্রেক্ষাপট, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং নথিভিত্তিক ব্যাখ্যা যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়নি।

তাদের অভিযোগ, শুধুমাত্র অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো সরকারি কর্মকর্তাকে দায়ী হিসেবে উপস্থাপন করলে তা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাদের মতে, গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে নথি, সাক্ষ্য, প্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্যের সমন্বয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা হওয়া প্রয়োজন।
সৈয়দ ইস্কান্দার আলীর বদলি নিয়ে পাল্টা ব্যাখ্যা
প্রকাশিত প্রতিবেদনে নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ ইস্কান্দার আলীর বদলিকে ঘিরে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন প্রকৌশলী।
তাদের দাবি, সাবেক সরকারের সময় তিনি পিএনবিতে দায়িত্ব পালন করলেও পরবর্তীতে তাকে ময়মনসিংহে পদায়ন করা হয়। সেখানে তার বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ ছিল না বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
তাদের ভাষ্য, তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে মতপার্থক্যের কারণে তিনি দীর্ঘ সময় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে দূরে ছিলেন। বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী দায়িত্ব গ্রহণের পরও তাকে কোনো বিশেষ সুবিধাজনক বা লাভজনক পদে নয়, বরং তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ ইএম-৬ বিভাগে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
এ কারণে তাকে ‘বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা’ হিসেবে উপস্থাপন করা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে দাবি করছেন তার ঘনিষ্ঠরা।

প্রধান প্রকৌশলীর পদ ঘিরে নতুন সমীকরণের অভিযোগ : গণপূর্ত অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে আলোচনার আরেকটি বিষয় হলো—প্রধান প্রকৌশলীর পদ ঘিরে সম্ভাব্য নেতৃত্ব পরিবর্তনের চেষ্টা।
একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করছেন, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী শহীদুল ইসলামকে প্রধান প্রকৌশলীর পদে বসানোর লক্ষ্যে একটি প্রভাবশালী মহল সক্রিয় রয়েছে। এ তৎপরতার সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সিভিল) বদরুল আলম খানের নামও বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে।
যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগকারীদের দাবি, বদরুল আলম খান দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ, বদলি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। তাদের ভাষ্য, বর্তমান প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে পূর্বের সমন্বয়ের সম্পর্ক পরিবর্তিত হওয়ার পর থেকেই নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে।
‘বাস্টার্ড’ শব্দ ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক: প্রধান প্রকৌশলীর পক্ষের প্রতিবাদ : এদিকে ‘দৈনিক জনবাণী’ পত্রিকায় ১৪ জুলাই ২০২৬ প্রকাশিত “সাংবাদিককে ‘বাস্টার্ড’ বললেন গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলী” শিরোনামের প্রতিবেদন নিয়ে প্রধান প্রকৌশলীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।
প্রতিবাদপত্রে বলা হয়েছে, প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য সঠিক নয় এবং বাস্তব ঘটনার সঙ্গে এর কোনো সামঞ্জস্য নেই। বিষয়টিকে তারা ‘ভুল বোঝাবুঝি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
প্রধান প্রকৌশলীর পক্ষে গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) মুহাম্মদ সরওয়ার জাহান স্বাক্ষরিত প্রতিবাদে বলা হয়, দৈনিক জনবাণীর বিশেষ প্রতিবেদক বশির হোসেন খানের সঙ্গে প্রধান প্রকৌশলীর কোনো অশালীন, আপত্তিকর বা হুমকিমূলক কথোপকথন হয়নি।
প্রতিবাদে দাবি করা হয়েছে, সংবাদ সংক্রান্ত বিষয়ে ফোনে জানতে চাইলে প্রধান প্রকৌশলী সাংবাদিককে ইংরেজিতে বলেন—
“Please come to the office with evidence and discuss the matter.” অর্থাৎ, “অনুগ্রহ করে প্রমাণসহ অফিসে আসুন এবং বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করুন।”
প্রধান প্রকৌশলীর পক্ষের দাবি, বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে তার ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের সুনাম ক্ষুণ্ণ হয়েছে। তাই সংবাদটি সংশোধনের পাশাপাশি ভবিষ্যতে তথ্য যাচাই করে প্রতিবেদন প্রকাশের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

সামাজিক মাধ্যমে ভিন্ন বক্তব্য : এদিকে “আমার কথা বাংলা” নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে একজন সাংবাদিক ওই ঘটনার বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়ে একটি পোস্ট করেছেন।
পোস্টে দাবি করা হয়— “এটা ঠিক না। উনি বলেছেন ননসেন্স কোশ্চেন কেন করেন। এসব বাজে বিষয় নিয়ে কথা বলবেন না। কিছু জানার থাকলে অফিসে আসেন। PWD।” সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই বক্তব্য নিয়েও নানা আলোচনা চলছে।
স্বচ্ছ তদন্তই হতে পারে সমাধান : গণপূর্ত অধিদপ্তরের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদ নিয়ে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, যদি প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে বদলি বাণিজ্য, অর্থ লেনদেন বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ সত্য হয়ে থাকে, তাহলে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে তা প্রমাণ হওয়া উচিত। একইভাবে যদি কোনো গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচার বা পদ দখলের উদ্দেশ্যে অভিযোগ তৈরি করে থাকে, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যক্তি নয়—প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা রক্ষাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ অনুসন্ধানই পারে প্রকৃত চিত্র সামনে আনতে।
