ইউনিফর্মে রাজনৈতিক মঞ্চে অতিরিক্ত ডিআইজি  : ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে বাধ্যতামূলক অবসর

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা প্রশাসনিক সংবাদ বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সারাদেশ

ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. মনিরুজ্জামান।


বিজ্ঞাপন

নিজস্ব প্রতিবেদক   :  রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রতীক পুলিশের ইউনিফর্ম পরে একটি রাজনৈতিক দলের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার অভিযোগে ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. মনিরুজ্জামানকে বাধ্যতামূল অবসর দিয়েছে সরকার। ঘটনাটি পুলিশ বাহিনীর পেশাদার নিরপেক্ষতা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং জনআস্থার প্রশ্নে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

গত সোমবার এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। প্রজ্ঞাপনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীর সই রয়েছে।


বিজ্ঞাপন

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৯ এপ্রিল ঝিনাইদহ-১ আসনের উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী তাঁর ছোট ভাই মো. ওয়াহিদুজ্জামান ঢাকার ধানমন্ডিতে দলটির রাজনৈতিক কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিতে গেলে অতিরিক্ত ডিআইজি মো. মনিরুজ্জামান পুলিশের সরকারি ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন এবং পুরো কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।


বিজ্ঞাপন

পরদিন ৩০ এপ্রিল জাতীয় দৈনিক ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমে ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় তাঁর উপস্থিতির ছবি ও সংবাদ প্রকাশিত হলে বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় আসে। অভিযোগ ওঠে, একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে তিনি রাষ্ট্রীয় পদ ও ইউনিফর্মের মর্যাদা ব্যবহার করে একটি রাজনৈতিক কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন, যা পুলিশের নিরপেক্ষতা ও পেশাগত আচরণবিধির পরিপন্থী।

ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ  :  সংশ্লিষ্টদের মতে, রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যখন সরকারি ইউনিফর্ম পরে কোনো রাজনৈতিক দলের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন, তখন তা কেবল শিষ্টাচারবহির্ভূত আচরণ নয়; বরং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের কৌশল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। একই সঙ্গে এটি পুলিশের নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয় এবং কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, মো. মনিরুজ্জামান লিখিত জবাব দিলেও ব্যক্তিগত শুনানিতে অংশ নিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। পরে অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় তিন সদস্যের একটি তদন্ত বোর্ড গঠন করা হয়। তদন্ত শেষে বোর্ড অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয়েছে বলে মত দেয়।

এরপর তাঁর বিরুদ্ধে দ্বিতীয় দফা কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হলেও তিনি কোনো জবাব দাখিল করেননি। অভিযোগ, লিখিত জবাব, তদন্ত প্রতিবেদন এবং অন্যান্য নথি পর্যালোচনা করে তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মতামতও চাওয়া হয়।

প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, পিএসসি বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত পোষণ করে। পরে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালার সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’ প্রমাণিত হওয়ায় মো. মনিরুজ্জামানকে ‘বাধ্যতামূলক অবসর’ গুরুদণ্ড দেওয়া হয়।

গোলাকার বৃত্তের মধ্যে টুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত  ডিআইজি মো : মনিরুজ্জামান কে দেখা যাচ্ছে। ছবি – সংগ্রহীত।

অবসরের আবেদনে বিস্ফোরক বক্তব্য  :  উল্লেখযোগ্যভাবে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট মো. মনিরুজ্জামান স্বেচ্ছায় অবসরের আবেদন করেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগে জমা দেওয়া ওই আবেদনপত্রে তিনি উল্লেখ করেন, আল-কোরআনের জ্ঞান ও ন্যায়-অন্যায় সম্পর্কে উপলব্ধির ভিত্তিতে তাঁর কাছে বাংলাদেশ পুলিশে চাকরি করা আর সমীচীন মনে হচ্ছে না।

আবেদনপত্রে তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে পুলিশকে দেওয়া মন্ত্রীদের আদেশকে অবৈধ বলে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে ছাত্র-জনতার সঙ্গে তৎকালীন সরকারের আচরণকে নিষ্ঠুরতম বলে বর্ণনা করেন।

তিনি আরও লেখেন, গত ১০ বছরে বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রীদের অবৈধ আদেশ এবং পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নির্দেশে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা শিশু-কিশোরসহ বহু মানুষকে হত্যা করেছেন। এর ফলে বাংলাদেশ পুলিশ জনগণের কাছে গণশত্রুতে পরিণত হয়েছে। এ অবস্থায় মানুষের ঘৃণার পাত্র হিসেবে তিনি পুলিশ বাহিনীতে চাকরি করতে ইচ্ছুক নন এবং তাই স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

রাষ্ট্রীয় নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন  :  একজন অতিরিক্ত ডিআইজির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সরকারি ইউনিফর্ম পরে অংশ নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া এবং সেই অভিযোগে বাধ্যতামূলক অবসরের সিদ্ধান্ত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাগত নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় ইউনিফর্ম ও পদমর্যাদা কখনোই রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত হতে পারে না। এমন অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া কেবল ব্যক্তিগত অসদাচরণের বিষয় নয়; বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহারের সীমারেখা, নির্বাচনী পরিবেশ এবং জনগণের আস্থার সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।

👁️ 273 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *