অফিস নেই, এলাকা নেই, বেতন নেই—’ভূতুড়ে পোস্টিং’-এ গণপূর্তের শতাধিক কর্মকর্তা  ! 

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি জাতীয় ঢাকা প্রশাসনিক সংবাদ বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক  :  পদোন্নতি হয়েছে, বদলিও হয়েছে। সরকারি প্রজ্ঞাপনে নতুন পদও সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু নেই অফিস, নেই দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার মতো এলাকা, নেই স্টাফ, নেই গাড়ি—এমনকি মাসের পর মাস নেই বেতন-ভাতাও। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকৌশল সংস্থা গণপূর্ত অধিদপ্তরে (পিডব্লিউডি) যেন তৈরি হয়েছে এক অভিনব প্রশাসনিক বাস্তবতা—’ভূতুড়ে পোস্টিং’।


বিজ্ঞাপন

কাগজে-কলমে নতুন বিভাগ, নতুন সার্কেল, নতুন পদ—সবই আছে। বাস্তবে নেই অফিসের অস্তিত্ব। ফলে পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তারা দিনের পর দিন কার্যত কর্মহীন অবস্থায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। অনেকেই বলছেন, এটি শুধু প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলাই নয়, সরকারি অর্থ, জনবল ও উন্নয়ন কার্যক্রমকে অচল করে দেওয়া এক নজিরবিহীন অব্যবস্থাপনা।

সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি ঢাকা ডিভিশন-২-এর সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সানাউল্লাহ। নবসৃষ্ট পদে তাকে বদলি করা হয় শেরেবাংলানগর গণপূর্ত বিভাগ-৪-এ। গত বছরের আগস্টে পোস্টিং পেলেও প্রায় ১০ মাস পরও তিনি নিজের অফিস খুঁজে পাননি। কোন এলাকা তার অধীনে, সেটিও জানেন না। নেই উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী, নেই স্টাফ অফিসার, নেই কোনো সহায়ক জনবল। অফিস কোড না থাকায় তার বিভাগের টেন্ডার ও উন্নয়ন কাজ পরিচালিত হচ্ছে শেরেবাংলানগর-১ বিভাগ থেকে। আর তিনি নিজে বেতন-ভাতা ছাড়াই দিন কাটাচ্ছেন।


বিজ্ঞাপন

একই চিত্র জাতীয় সংসদ ভবন এলাকার সাবেক দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেনের ক্ষেত্রেও। সংসদের সাউন্ড সিস্টেম বিপর্যয়ের সময় যিনি আলোচনায় ছিলেন, তাকে গত মার্চে বদলি করা হয় ইএম ডিভিশন-১২-এ। কিন্তু সেই ডিভিশনের অফিস কোথায়, কোন এলাকা এর অধীনে—আজও তার কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাননি তিনি। মাঝেমধ্যে পূর্ত ভবনের সংস্থাপন বিভাগে হাজিরা দেওয়া ছাড়া কার্যত তার আর কোনো কাজ নেই। বেতন, স্টাফ, অফিস কিংবা সরকারি গাড়ি—কোনোটিই পাননি তিনি।
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, নবসৃষ্ট সার্কেল-৫-এর অধীনে দেখানো হয়েছে মহাখালী গণপূর্ত বিভাগ, নতুন ঢাকা ডিভিশন-৫ ও জরিপ বিভাগকে। অথচ সংশ্লিষ্টদের দাবি, ঢাকা ডিভিশন-৫-এর বাস্তব অস্তিত্বই নেই।


বিজ্ঞাপন

সূত্র বলছে, রাজধানীসহ সারাদেশে সরকারি স্থাপনা বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যমান জনবল দিয়ে কাজ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। সেই বাস্তবতায় ২০২৫ সালে নতুন সেটআপ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে গত বছরের ৭ আগস্ট জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ৩১১টি নতুন পদ সৃজনে সম্মতি দেয়। এর মধ্যে বিভিন্ন জেলা সদরে নতুন ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল বিভাগও অনুমোদন পায়। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, পদ সৃষ্টি করেই যেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব শেষ হয়ে গেছে।

কারণ, নতুন অফিসগুলোর জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এখনো অফিস কোড অনুমোদন করা হয়নি। তৈরি হয়নি আইবাস (iBAS++) কোডও। ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যোগদান করেও বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। একই সঙ্গে টেন্ডার আহ্বান, উন্নয়ন ও সংস্কার কার্যক্রমও কার্যত স্থবির হয়ে আছে।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) খালেকুজ্জামান চৌধুরী বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, গণপূর্তের পক্ষ থেকে বিষয়টি সমাধানে সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। তার ভাষায়, “শিগগিরই অফিস কোড ও আইবাস কোড সৃজন সম্পর্কিত সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।”

নবসৃষ্ট ৩১১টি পদের মধ্যে বিসিএস (গণপূর্ত) ক্যাডারের রয়েছে ১০৭টি পদ। এর মধ্যে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সিভিল) ১টি, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ইএম) ১টি, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সিভিল) ২টি, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ইএম) ১টি, নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) ১৪টি, নির্বাহী প্রকৌশলী (ইএম) ১১টি, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (সিভিল) ১৭টি, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (ইএম) ৩টি, সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) ৪০টি এবং সহকারী প্রকৌশলী (ইএম) ১৮টি রয়েছে। বাকি পদগুলো নন-ক্যাডার থেকে অফিস সহায়ক পর্যন্ত বিভিন্ন শ্রেণির।

গত বছরের ৭ আগস্ট গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের পর এসব পদে পদোন্নতি ও পদায়ন সম্পন্ন হলেও অফিস কোড ও আইবাস কোড না থাকায় পুরো প্রক্রিয়াই এখন কার্যত অচল।
এ অবস্থার অবসানে চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব শেখ নাজমুস সাকিব অর্থ মন্ত্রণালয়ে ১৯টি নতুন অফিসের জন্য আইবাস কোড সৃষ্টির অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠান। কিন্তু পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও কার্যকর কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।

এদিকে অভিযোগ উঠেছে, নতুন পদে পদোন্নতি ও বদলিতে যতটা তৎপরতা ছিল, সংশ্লিষ্ট অফিসের কর্মপরিধি নির্ধারণ, এলাকা বুঝিয়ে দেওয়া, জনবল, লজিস্টিক ও অবকাঠামো নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ছিল চরম উদাসীনতা।

এর জ্বলন্ত উদাহরণ বিসিএস (গণপূর্ত) ১৫ ব্যাচের কর্মকর্তা মো. কায়কোবাদ। নতুন সেটআপে পদোন্নতি পেয়ে তিনি অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (চট্টগ্রাম) হলেও নেই তার কোনো অফিস, নেই প্রশাসনিক কাঠামো, এমনকি গত ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে পাননি বেতন। আগামী ডিসেম্বরে অবসরে যাওয়ার আগে এমন পরিস্থিতিতে পড়ে তিনি কার্যত অসহায়।

একইভাবে ২১ ব্যাচের কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল নবসৃষ্ট সার্কেল-৫-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে ঢাকায় পোস্টিং পেয়ে শুরুতে আনন্দিত হলেও পরে দেখেন তার জন্য নেই কোনো অফিস কিংবা স্টাফ। বাধ্য হয়ে তিনি মহাখালী বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর কক্ষে বসছেন। ফলে প্রকৃত নির্বাহী প্রকৌশলী রাজিবুল ইসলাম নিজ অফিসেই অনেকটা উদ্বাস্তুর মতো অবস্থায় পড়েছেন। অথচ অফিস কোড না থাকায় মোস্তফা কামালও কোনো প্রশাসনিক বা কারিগরি কাজ করতে পারছেন না। আট মাস ধরে তিনিও বেতন-ভাতা থেকে বঞ্চিত।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, “এই পোস্টিং আমাদের মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছে। অফিস নেই, কাজ নেই, গাড়ি নেই, বেতন নেই। পরিবার-পরিজনের কাছেও আমরা বিব্রত। আমাদের আসলেই চাকরি আছে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তরও দিতে পারি না।”

আরেক প্রকৌশলীর ভাষ্য, “আগে অফিস কোড, আইবাস কোড, কর্মপরিধি, জনবল ও লজিস্টিক নিশ্চিত করা উচিত ছিল। তারপর পদায়ন ও পদোন্নতি দিলে আজ এই উদ্ভট পরিস্থিতি তৈরি হতো না।”

প্রশ্ন উঠছে, কাগজে-কলমে পদ সৃষ্টি করে কর্মকর্তাদের কার্যত ‘অস্তিত্বহীন অফিসে’ পোস্টিং দেওয়া কি শুধু প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা, নাকি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চরম ব্যর্থতা? কারণ, সরকারি কর্মকর্তা আছেন, কিন্তু অফিস নেই; পদ আছে, কিন্তু দায়িত্ব নেই; যোগদান আছে, কিন্তু বেতন নেই—এমন নজির দেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে বিরল বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রয়োজনে এটিকে আরও অনুসন্ধানী, জাতীয় দৈনিকের প্রথম পাতার উপযোগী বা আরও তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গাত্মক ভাষায়ও সম্পাদনা করে দিতে পারি।

👁️ 53 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *