# বিআইডব্লিউটিএর ড্রেজিং বিভাগ নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদনে একই অভিযোগের পুনরাবৃত্তি # প্রশ্ন উঠছে তথ্যের উৎস ও উদ্দেশ্য নিয়ে #

নিজস্ব প্রতিবেদক৷ : বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ড্রেজিং বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. সাইদুর রহমানকে ঘিরে গত কয়েক দিনে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টাল ও সংবাদমাধ্যমে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। নদী খনন প্রকল্পে শত কোটি টাকা আত্মসাৎ, অবৈধ সম্পদ, জাল সনদ, টেন্ডার সিন্ডিকেট, বদলি-বাণিজ্য, দুদকের অনুসন্ধান প্রভাবিত করার চেষ্টা—এমন নানা অভিযোগ স্থান পেয়েছে এসব প্রতিবেদনে।
তবে চারটি প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু পাশাপাশি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একই অভিযোগ, একই ধরনের সূত্রনির্ভর বক্তব্য এবং একই তথ্য বারবার উপস্থাপন করা হয়েছে। অন্যদিকে, অভিযোগগুলোর বিপরীতে সাইদুর রহমানের বক্তব্যও রয়েছে—তিনি এসব অভিযোগকে সম্পূর্ণ মিথ্যা, কাল্পনিক ও বাস্তবতাবিবর্জিত বলে দাবি করেছেন।

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে—এগুলো কি সত্যিই দুর্নীতির তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান, নাকি বিআইডব্লিউটিএর ড্রেজিং বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদকে ঘিরে চলমান অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা ও পদোন্নতির লড়াইয়ের অংশ?

একই অভিযোগ, ভিন্ন শিরোনাম : সাম্প্রতিক প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে প্রায় অভিন্নভাবে দাবি করা হয়েছে, কংস ও ভোগাই নদ খনন প্রকল্পে ১৩৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে এবং এর সঙ্গে সাইদুর রহমানের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
কোথাও এই অর্থের পরিমাণ ১৩৪ কোটি, কোথাও ১৩৮ কোটি টাকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার কোথাও সাইদুর রহমানকে প্রকল্পের ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—প্রতিবেদনগুলোতে অভিযোগ, অনুসন্ধান ও চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত দুর্নীতির মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য সবসময় রাখা হয়নি।
কোনো বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান চলা মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দুর্নীতির জন্য দায়ী—এমন সিদ্ধান্ত সাংবাদিকতার মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অনুসন্ধান, তদন্ত, মামলা এবং আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়া—প্রতিটি পর্যায় আলাদা।
সাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধানের কথা প্রতিবেদনে বলা হলেও সেই অনুসন্ধানের সর্বশেষ আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত, মামলা দায়ের, চার্জশিট কিংবা আদালতের কোনো রায় প্রকাশ্যে উপস্থাপন করা হয়নি।
১৩৪ কোটি টাকার অভিযোগ—সাইদুরের ভূমিকা কোথায় ?
কংস ও ভোগাই নদ খনন প্রকল্প নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নদী খনন না করেই ঠিকাদাররা বিল তুলে নিয়েছেন। প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধানের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু একই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে এবং দুদকের অনুসন্ধানে তাদের জিজ্ঞাসাবাদের কথাও বলা হয়েছে।
তাহলে প্রশ্ন হলো—প্রকল্পের অনুমোদন, দরপত্র, কার্যাদেশ, পরিমাপ, বিল অনুমোদন ও অর্থ ছাড়ের প্রতিটি প্রশাসনিক ধাপে কার কী দায়িত্ব ছিল?
শুধু একটি পদে থাকা একজন কর্মকর্তাকে পুরো প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে চিহ্নিত করতে হলে তার নির্দিষ্ট স্বাক্ষর, নথি, অনুমোদন, আর্থিক লেনদেন কিংবা প্রত্যক্ষ নির্দেশনার প্রমাণ সামনে আসা প্রয়োজন। অভিযোগের গুরুত্ব যত বেশি, প্রমাণের মানদণ্ডও তত বেশি হওয়া উচিত।
‘দুদকের ফাইল আটকে আছে’—দাবিটিরও প্রমাণ প্রয়োজন : প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, সাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান বছরের পর বছর ধরে চলছে এবং কোনো এক ‘অদৃশ্য ইশারায়’ তা আটকে রাখা হয়েছে। এমনকি কিছু দুদক কর্মকর্তা অভিযুক্তদের ‘শেল্টার’ দিচ্ছেন—এমন গুরুতর অভিযোগও করা হয়েছে। কিন্তু এমন অভিযোগ প্রমাণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নাম, নথি, যোগাযোগের প্রমাণ, তদন্তের আদেশ, ফাইলের নোটশিট কিংবা অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য দলিল থাকা জরুরি।
দুদকের অনুসন্ধান দীর্ঘায়িত হওয়া নিজেই দুর্নীতির প্রমাণ নয়। একইভাবে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা বদলি হওয়াও কোনো ব্যক্তিকে দায়মুক্তি দেওয়ার ষড়যন্ত্রের প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না, যদি না তার পক্ষে নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকে।
জাল সনদ ও চাকরিচ্যুতির অভিযোগ : সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন এখানেই : সাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ করা হয়েছে যে, তিনি এলজিইডি থেকে চাকরিচ্যুত হওয়ার তথ্য গোপন করে ২০০৩ সালে বিআইডব্লিউটিএতে চাকরি নেন এবং তার শিক্ষাগত সনদ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এ ধরনের অভিযোগ সত্য হলে তা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুতর। কিন্তু এমন দাবির ক্ষেত্রে চাকরিচ্যুতির আদেশ, নিয়োগের সময় দেওয়া তথ্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রত্যয়ন—এসব নথি প্রকাশ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একজন সরকারি কর্মকর্তার চাকরির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার ক্ষেত্রে ‘শোনা যায়’ বা ‘সূত্রের দাবি’ যথেষ্ট নয়।
সম্পদের অভিযোগেও প্রয়োজন নথিভিত্তিক যাচাই : সাইদুর রহমানের নামে একাধিক ফ্ল্যাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ইটভাটা ও বিপুল সম্পদের অভিযোগও প্রকাশিত হয়েছে। এমনকি আয়কর নথিতে স্বর্ণ বিক্রির রসিদ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
কিন্তু এসব সম্পদ কার নামে নিবন্ধিত, অর্থের উৎস কী, ক্রয়ের সময় কে অর্থ পরিশোধ করেছেন এবং সংশ্লিষ্ট সম্পদের সঙ্গে সাইদুর রহমানের প্রত্যক্ষ মালিকানা বা উপকারভোগী সম্পর্ক রয়েছে কি না—এসব যাচাই না করে শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে সম্পদকে ‘অবৈধ’ হিসেবে চিহ্নিত করা সাংবাদিকতার বিচারে ঝুঁকিপূর্ণ। অবশ্যই এসব অভিযোগের অনুসন্ধান হওয়া উচিত। কিন্তু অনুসন্ধান এবং রায়—দুটি এক বিষয় নয়।
‘জীবিত বাবাকে মৃত দেখানো’র অভিযোগও যাচাইযোগ্য নথির বিষয় : একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সাইদুর রহমান ২০১৭ সালের নথিতে তার জীবিত পিতাকে মৃত দেখিয়ে উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পদের মালিকানা দাবি করেছেন।
অভিযোগটি সত্য হলে তা অত্যন্ত গুরুতর। কিন্তু এই দাবির সত্যতা যাচাই করতে হলে সংশ্লিষ্ট বছরের সরকারি মৃত্যু নিবন্ধন, উত্তরাধিকার সনদ, আয়কর নথি এবং সম্পত্তির দলিল পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
শুধু একটি পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে এমন অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রকাশ করা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ন্যায়সংগত বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ ক্ষুণ্ন হতে পারে।
তাহলে পদোন্নতির বিষয়টি কি গুরুত্বপূর্ণ ? এই পুরো বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নতুন তথ্যটি এসেছে সাইদুর রহমানের পক্ষের বক্তব্যে।
বিআইডব্লিউটিএর ড্রেজিং বিভাগের চিফ ইঞ্জিনিয়ার পদটি বর্তমানে শূন্য হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট পদে পদোন্নতির সম্ভাব্য তালিকায় সাইদুর রহমানের নাম আলোচনায় রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
একই সঙ্গে তাঁর পক্ষের বক্তব্য—পদোন্নতির প্রতিযোগিতায় থাকা প্রতিদ্বন্দ্বী মহলের কেউ কেউ তাঁকে ঠেকাতে ধারাবাহিকভাবে সংবাদমাধ্যমে নেতিবাচক প্রচারণা চালাচ্ছেন। এই দাবি সত্য কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়। তবে ঘটনাপ্রবাহের সময়কাল বিবেচনায় বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কারণ, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে একই ধরনের অভিযোগ প্রকাশিত হওয়ার পর যদি একই সময়ে তার পদোন্নতি নিয়ে প্রশাসনিক আলোচনা চলে, তাহলে সাংবাদিকতার স্বার্থেই খতিয়ে দেখা প্রয়োজন—অভিযোগগুলো প্রথমে কোথা থেকে এসেছে, কে তথ্য সরবরাহ করেছে, অভিযোগের নথি কার কাছে রয়েছে এবং সংবাদ প্রকাশের পেছনে কোনো স্বার্থসংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না।
অভিযোগ থাকলে তদন্ত হোক, কিন্তু তদন্তের আগেই রায় নয় : সাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। কংস-ভোগাই নদ খনন প্রকল্পের অর্থ ব্যয়, কাজের পরিমাণ, ড্রেজিংয়ের গভীরতা, জিপিএস/মেজারমেন্ট রেকর্ড, বিল-ভাউচার, ঠিকাদারদের কার্যাদেশ, মাটি উত্তোলনের হিসাব এবং প্রকল্প-পরবর্তী নদীর বাস্তব অবস্থা—সবকিছুই স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব। একইভাবে তাঁর সম্পদের ক্ষেত্রেও ভূমি রেজিস্ট্রি, আয়কর নথি, ব্যাংক লেনদেন, কোম্পানি মালিকানা এবং সংশ্লিষ্ট সম্পদের প্রকৃত উপকারভোগী যাচাই করা যেতে পারে।
যদি অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আর যদি অভিযোগ প্রমাণিত না হয়, তাহলে একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচারের দায়ও নির্ধারণ করা জরুরি।
সাইদুর রহমানের বক্তব্য : অভিযোগের বিষয়ে মো. সাইদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নন এবং তাঁর কোনো অবৈধ সম্পদও নেই। তাঁকে ঘিরে প্রচারিত অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও বাস্তবতাবিবর্জিত।
তাঁর পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়েছে, ড্রেজিং বিভাগের শীর্ষ পদকে কেন্দ্র করে পদোন্নতির প্রতিযোগিতা থেকেই প্রতিদ্বন্দ্বী একটি পক্ষ তাঁকে বিতর্কিত করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে নেতিবাচক প্রচারণা চালাচ্ছে। এই দাবির স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
শেষ কথা : বিআইডব্লিউটিএর মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তা অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা দরকার। কিন্তু দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার অর্থ কোনো ব্যক্তিকে প্রমাণ ছাড়াই অপরাধী বানানো নয়।
সাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো সত্য হলে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক। আর যদি অভিযোগগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে থাকে, তবে কারা কেন এই প্রচারণা চালাচ্ছে—সেটিও তদন্তের আওতায় আসা উচিত।
কারণ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই যেমন জরুরি, তেমনি মিথ্যা অভিযোগ ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট অপপ্রচার থেকেও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে সুরক্ষা দেওয়া জরুরি।
এখন মূল প্রশ্ন একটাই—সাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা কি নথি ও নিরপেক্ষ তদন্তে প্রমাণিত হবে, নাকি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদোন্নতিকে কেন্দ্র করে চলমান প্রতিযোগিতাই এসব ধারাবাহিক প্রচারণার নেপথ্যে রয়েছে? উত্তরটি সংবাদ শিরোনামে নয়—নথি, তদন্ত ও প্রমাণেই খুঁজে বের করতে হবে।
