বিশেষ প্রতিবেদক : রাজধানীর নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষের কাছে কম দামে বিশুদ্ধ পানি পৌঁছে দেওয়ার মহৎ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে শুরু হয়েছিল ‘ওয়াটার এটিএম’ প্রকল্প। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, জনস্বার্থের সেই প্রকল্পই পরিণত হয়েছে ঢাকা ওয়াসা ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘ড্রিঙ্কওয়েল’ (উইস্ট বাংলাদেশ লিমিটেড)-এর একটি বিতর্কিত বাণিজ্যিক ব্যবস্থায়। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে সরকারি অর্থে অবকাঠামো নির্মাণ, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ ছাড়াই ব্যবসা পরিচালনা, রাজস্ব বণ্টনে অসঙ্গতি এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট (পিপিএ) ও পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) অনুসরণ না করেই চুক্তি সম্পাদনের অভিযোগ।

সবচেয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ হলো—ঢাকা শহরের ২৯৪টি ওয়াটার এটিএম বুথের অবকাঠামো তৈরিতে ঢাকা ওয়াসা নিজস্ব অর্থ ব্যয় করলেও দীর্ঘদিন ধরে এসব বুথ থেকে আয় করা অর্থের সিংহভাগ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটির হাতে গেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ অনুযায়ী, বিভিন্ন খাতে আর্থিক ক্ষতি ও সুবিধা প্রদানের হিসাব মিলিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩০০ কোটি টাকা।
এর মধ্যেই পুরোনো চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রেক্ষাপটে আগামী পাঁচ বছরের জন্য আবারও চুক্তি নবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আর এখানেই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—আগের চুক্তির বৈধতা, আর্থিক হিসাব ও দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ না করেই কি একই ব্যবস্থাকে আরও পাঁচ বছর চালিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে?
দরপত্র কোথায় ? প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই। অভিযোগ রয়েছে, উন্মুক্ত দরপত্র বা প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই ড্রিঙ্কওয়েলকে ওয়াটার এটিএম পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হয়।

সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য পিপিএ ও পিপিআরের বিধান রয়েছে। অথচ অভিযোগ অনুযায়ী, সেই বিধান পাশ কাটিয়ে একটি বিশেষ চুক্তির মাধ্যমে ড্রিঙ্কওয়েলকে প্রকল্পটির পরিচালনায় যুক্ত করা হয়।

অভিযোগের তীর তৎকালীন ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ. খানের দিকেও। সংশ্লিষ্টদের দাবি, তাঁর একক সিদ্ধান্ত ও প্রভাবের মাধ্যমেই বিতর্কিত চুক্তির পথ তৈরি হয়েছিল।
ড্রিঙ্কওয়েলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মিনহাজ চৌধুরী এবং পরিচালক ইমতিয়াজ মোহাম্মদ মোহসিনকে ঘিরেও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও প্রকল্পের মূল চুক্তিপত্রসহ নথিপত্রের স্বাধীন যাচাই জরুরি।
সরকারি টাকায় অবকাঠামো, লাভ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ?
অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিনিয়োগের কাঠামো। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২৯৪টি ওয়াটার এটিএম বুথের সিভিল স্ট্রাকচার ও প্রয়োজনীয় ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে ঢাকা ওয়াসা নিজস্ব তহবিল থেকে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে।
অর্থাৎ অবকাঠামো তৈরির বড় ধরনের আর্থিক দায় বহন করেছে সরকারি প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, এসব বুথ থেকে গত প্রায় নয় বছরে বিক্রি হওয়া পানির রাজস্বের প্রায় ১৪০ কোটি টাকা ড্রিঙ্কওয়েল পেয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে—যদি অবকাঠামোর বড় অংশ সরকারি অর্থে নির্মিত হয়ে থাকে, তাহলে সেই অবকাঠামো ব্যবহার করে অর্জিত আয়ের বণ্টনে ঢাকা ওয়াসার প্রকৃত আর্থিক সুবিধা কতটুকু ছিল? আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও মুনাফার কাঠামোই বা কী ছিল?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর চুক্তির শর্ত, আর্থিক বিবরণী, ব্যাংক হিসাব এবং বুথভিত্তিক বিক্রয় তথ্য পর্যালোচনা করলেই স্পষ্ট হওয়ার কথা।
বিনা ভাড়ায় অফিস, রাজস্ব হারিয়েছে ওয়াসা : অভিযোগের তালিকায় রয়েছে ঢাকা ওয়াসা ভবনে ড্রিঙ্কওয়েলকে বিনা ভাড়ায় অফিস ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও।
সংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, বাজারদর বিবেচনায় মাসিক প্রায় ৫ লাখ টাকা ভাড়া হলে নয় বছরে এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা। অর্থাৎ সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্থাপনা ব্যবহার করেও যদি কোনো ভাড়া আদায় না করা হয়ে থাকে, তাহলে সেটিও ঢাকা ওয়াসার সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির একটি পৃথক খাত।
এক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো—কোন বিধি বা কর্তৃত্ববলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সরকারি ভবনে বিনা ভাড়ায় দীর্ঘদিন অফিস ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল?
৩০০ কোটি টাকার ক্ষতির অভিযোগ—হিসাব যাচাই করবে কে ? অভিযোগকারীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী—
ওয়াটার এটিএমের অবকাঠামো নির্মাণে ঢাকা ওয়াসার বিনিয়োগ: প্রায় ১৫০ কোটি টাকা, গত প্রায় নয় বছরে পানির বিক্রয় থেকে ড্রিঙ্কওয়েলের প্রাপ্ত রাজস্ব: প্রায় ১৪০ কোটি টাকা, ওয়াসা ভবনে অফিস ব্যবহারের সম্ভাব্য ভাড়া বাবদ রাজস্ব ক্ষতি, প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা, সব মিলিয়ে বিভিন্ন খাতে রাষ্ট্রীয় আর্থিক ক্ষতি ও সুবিধার পরিমাণ প্রায় ৩০০ কোটি টাকা বলে দাবি করা হচ্ছে।
তবে এই ৩০০ কোটি টাকার হিসাব চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করতে হলে ঢাকা ওয়াসার নিরীক্ষা প্রতিবেদন, চুক্তির আর্থিক শর্ত, বুথভিত্তিক বিক্রয় রেকর্ড, ব্যাংক লেনদেন, বিনিয়োগের হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের নথি স্বাধীনভাবে নিরীক্ষা করা প্রয়োজন।
পুরোনো বিতর্কের মধ্যেই নতুন পাঁচ বছরের চুক্তি ! সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়, আগের চুক্তি নিয়ে এত প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও ড্রিঙ্কওয়েলের পক্ষ থেকে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর নতুন করে পাঁচ বছরের জন্য চুক্তি নবায়নের আবেদন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রস্তাবিত নতুন মডেলেও ওয়াটার এটিএমের অবকাঠামো নির্মাণ ও সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের বড় অংশ ঢাকা ওয়াসার ওপর রাখার প্রস্তাব রয়েছে। অন্যদিকে পরিচালনা ও ব্যবসা থেকে লাভের সুযোগ পেতে পারে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটি। এমন প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে আগের বিতর্কিত কাঠামোই নতুন মেয়াদে পুনরায় কার্যকর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এখন প্রশ্ন একটাই—নতুন করে উন্মুক্ত দরপত্র ডেকে প্রতিযোগিতামূলকভাবে প্রকল্প পরিচালনার সুযোগ না দিয়ে একই প্রতিষ্ঠানকে কেন আবার পাঁচ বছরের জন্য সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে ?
‘সিন্ডিকেট’ কি এখনও সক্রিয় ? তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ. খান পদত্যাগ করে দায়িত্ব ছাড়ার পরও ঢাকা ওয়াসার ভেতরে তাঁর সময়ের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের একটি অংশ সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তা বিভিন্নভাবে ড্রিঙ্কওয়েলের সঙ্গে পুরোনো সম্পর্ক বজায় রেখে প্রকল্পটি অব্যাহত রাখার চেষ্টা করছেন। এমনকি নিয়মিত সুবিধা গ্রহণের অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রয়োজন স্বাধীন তদন্ত। বিশেষ করে চুক্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা, অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ, আর্থিক লেনদেন এবং চুক্তি নবায়নের নথি খতিয়ে দেখা জরুরি।
পানি শোধনে অনিয়মের অভিযোগ, জনস্বাস্থ্যও প্রশ্নের মুখে : অর্থনৈতিক অনিয়মের পাশাপাশি ওয়াটার এটিএম থেকে সরবরাহ করা পানির মান নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ করা হয়েছে, চুক্তি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় শোধন উপকরণ যথাযথভাবে ব্যবহার করা হয়নি। এ ধরনের অভিযোগ সত্য হলে বিষয়টি শুধু আর্থিক অনিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাবে।
কারণ ওয়াটার এটিএম থেকে পানি কিনে সাধারণ মানুষ সেটিকে নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানি হিসেবেই গ্রহণ করে। ফলে পানির গুণগত মান, শোধন প্রক্রিয়া, নিয়মিত ল্যাবরেটরি পরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট সনদের বৈধতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত অপরিহার্য।
এখনই প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ তদন্ত : ঢাকা ওয়াসার এই প্রকল্প নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিষ্পত্তি কোনো অভ্যন্তরীণ তদন্তে সীমাবদ্ধ না রেখে স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষা ও তদন্তের আওতায় আনা জরুরি।
বিশেষ করে তদন্তে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন— প্রকল্পটি কীভাবে ও কোন আইনি প্রক্রিয়ায় ড্রিঙ্কওয়েলকে দেওয়া হয়েছিল ? পিপিএ ও পিপিআরের কোন বিধান অনুসরণ করা হয়েছিল এবং কোন বিধান প্রযোজ্য না হওয়ার কারণ কী ? ঢাকা ওয়াসার বিনিয়োগের বিপরীতে ড্রিঙ্কওয়েলের বিনিয়োগ কত ছিল ? ২৯৪টি বুথ থেকে গত নয় বছরে মোট কত টাকা বিক্রয় হয়েছে এবং সেই অর্থ কোথায় গেছে ? ঢাকা ওয়াসা প্রকৃতপক্ষে কত টাকা রাজস্ব পেয়েছে ? ওয়াসা ভবনে বিনা ভাড়ায় অফিস ব্যবহারের অনুমোদন কে দিয়েছিলেন ? পানির মান নিয়ন্ত্রণে কী ধরনের শোধন ও পরীক্ষার ব্যবস্থা ছিল? পুরোনো চুক্তির আর্থিক ও প্রশাসনিক দায়-দায়িত্ব নিষ্পত্তির আগেই নতুন পাঁচ বছরের চুক্তি নবায়নের উদ্যোগ কেন নেওয়া হচ্ছে ?
জনস্বার্থের প্রকল্প কি বেসরকারি মুনাফার হাতিয়ার ?
‘ওয়াটার এটিএম’ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ মানুষের কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে নিরাপদ পানি পৌঁছে দেওয়া। সেই প্রকল্প যদি সত্যিই সরকারি অর্থে অবকাঠামো তৈরি করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য দীর্ঘমেয়াদি মুনাফার সুযোগ তৈরির মাধ্যম হয়ে থাকে, তাহলে তা নিছক প্রশাসনিক অনিয়ম নয়—এটি সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও জনস্বার্থের ওপর গুরুতর প্রশ্ন।
আর যদি ৩০০ কোটি টাকার ক্ষতির অভিযোগের সত্যতা থাকে, তাহলে এর দায় নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অভিযোগের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নতুন করে পাঁচ বছরের চুক্তি নবায়ন করা হলে সেটি পুরোনো বিতর্ককে আরও গভীর করবে। তাই জনস্বার্থে দাবি উঠছে, নতুন চুক্তি অনুমোদনের আগে আগের চুক্তির পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক অডিট, বুথভিত্তিক আয়-ব্যয়ের হিসাব, বিনিয়োগ ও সম্পদের মালিকানা নির্ধারণ এবং পিপিএ-পিপিআর অনুসরণের বৈধতা যাচাই করা হোক।
ঢাকা ওয়াসার ২৯৪টি ওয়াটার এটিএম—জনগণের সম্পদ, নাকি একটি বিশেষ প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসার প্ল্যাটফর্ম?
এই প্রশ্নের উত্তর এখন ঢাকা ওয়াসা কর্তৃপক্ষকেই দিতে হবে।
