# ৩ লাখ ৭৫ হাজার লিটার ডিজেলের হিসাবের গরমিল # তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই শেখ জাহিদের পদোন্নতির তোড়জোড় # ফতুল্লা ডিপোর Tank-22 ও Tank-23-এর Calibration নিয়ে প্রশ্ন, সংশোধিত চার্টে মিলেছে অতিরিক্ত তেলের হিসাব # তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি স্থগিতের দাবি #
বিশেষ প্রতিনিধি : যমুনা অয়েল পিএলসির ফতুল্লা ডিপোতে Tank-22 ও Tank-23-এর Calibration/Capacity Measurement নিয়ে অসঙ্গতি এবং বিপুল পরিমাণ ডিজেলের Quantity Discrepancy-এর বিষয়টি এখনো তদন্ত ও দায়িত্ব নির্ধারণের পর্যায়ে থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা শেখ জাহিদ আহমেদের পদোন্নতি কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়ে প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার মতে, ৩ লাখ ৭৫ হাজার ৪১৮ লিটার ডিজেলের হিসাবের গরমিলের প্রকৃত কারণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের Job Responsibility এবং Supervisory Responsibility নির্ধারণের আগে পদোন্নতি কার্যকর করা হলে প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
প্রাপ্ত নথি ও তদন্তসংক্রান্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ফতুল্লা ডিপোতে দুই ধাপে যথাক্রমে ২ লাখ ৬২ হাজার ৮০৪ লিটার এবং ১ লাখ ১২ হাজার ৬১৪ লিটার, সর্বমোট ৩ লাখ ৭৫ হাজার ৪১৮ লিটার ডিজেলের Quantity Discrepancy-এর তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

শুধু এখানেই শেষ নয়। তদন্তসংক্রান্ত প্রতিবেদনে Tank-22-এর পূর্ববর্তী ও পরবর্তী Calibration Certificate-এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্যের বিষয়ও উঠে এসেছে। পরবর্তীতে সংশোধিত Calibration Chart অনুযায়ী পূর্ববর্তী হিসাবের তুলনায় প্রথম দুই চালানে ৭২ হাজার ৮৩৮ লিটার এবং তৃতীয় চালানে ৪৪ হাজার ৭৯ লিটার অতিরিক্ত তেলের পরিমাণ পাওয়া যাওয়ার তথ্য উল্লেখ রয়েছে।

Calibration নিয়ে বড় প্রশ্ন : তদন্তসংক্রান্ত প্রতিবেদনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পর্যবেক্ষণ হিসেবে এসেছে। Calibration কার্যক্রম পরিচালনার সময় BSTI কিংবা ডিপোর কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তীতে Calibration Chart সংশোধনের বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে—Calibration কার্যক্রম কীভাবে সম্পন্ন হয়েছিল, কে তা যাচাই করেছিলেন, সংশোধিত Chart-এর ভিত্তি কী ছিল এবং সংশ্লিষ্ট সময়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তদারকি ও অনুমোদনের ভূমিকা কী ছিল ? এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও কারিগরি তথ্য পর্যালোচনা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা।
দায়িত্বে ছিলেন শেখ জাহিদ, তবে দায়ী কে ? তদন্তসংক্রান্ত প্রতিবেদনে শেখ জাহিদ আহমেদ সংশ্লিষ্ট সময়ে ডিপো অপারেশন/সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে ছিলেন এবং তদন্ত কমিটির কাছে বক্তব্য দিয়েছেন বলে উল্লেখ রয়েছে।
তবে কেবল কোনো কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট সময়ে দায়িত্বে ছিলেন কিংবা তদন্ত কমিটির কাছে বক্তব্য দিয়েছেন—এমন তথ্যের ভিত্তিতে তাঁকে কোনো অনিয়মের জন্য দায়ী করা সমীচীন নয়। তাঁর বিরুদ্ধে কোনো দায়, অবহেলা কিংবা দায়িত্বগত ত্রুটি চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে—এমন দাবিও তদন্তের চূড়ান্ত ফল ছাড়া করা যায় না।
বরং তাঁর Job Responsibility, Supervisory Responsibility, Approval/Verification এবং Monitoring Role নথিপত্রের ভিত্তিতে পৃথকভাবে মূল্যায়ন করাই হবে প্রশাসনিকভাবে অধিকতর গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি।
তদন্তের আগেই পদোন্নতি—কেন প্রশ্ন ? বিতর্কের মূল জায়গাটি এখানেই। ফতুল্লা ডিপোর তেলের হিসাবের গরমিল এবং Calibration সংক্রান্ত অসঙ্গতির তদন্ত ও দায়িত্ব নির্ধারণ এখনো চূড়ান্ত না হলে সংশ্লিষ্ট সময়ে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার পদোন্নতি কার্যকর করার সিদ্ধান্ত কতটা যুক্তিসংগত—এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
যমুনা অয়েলের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা মনে করছেন, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি কার্যকর না রাখার বিষয়টি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে নয়, বরং সাময়িক প্রশাসনিক সতর্কতা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। তাদের যুক্তি, এতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে আগাম দোষী সাব্যস্ত করা হবে না; একই সঙ্গে তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগে কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত থেকে সম্ভাব্য জটিলতাও এড়ানো সম্ভব হবে।
যে নথিগুলো খতিয়ে দেখা জরুরি : সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও প্রকৃত Quantity Discrepancy নির্ধারণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নথি পর্যালোচনার দাবি উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে— Tank-22 ও Tank-23-এর পূর্ববর্তী ও সংশোধিত Calibration Certificate/Chart. BSTI Certification; সংশ্লিষ্ট Work Order; Measurement Sheet; Tank Dip Record; Technical/Inspection Report; Receipt ও Dispatch Records; Stock Statement;
Inventory Reconciliation; Loss Statement।.
এসব নথি পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলেই তেলের পরিমাণগত গরমিলের প্রকৃত কারণ এবং এর সঙ্গে কোনো প্রশাসনিক বা কারিগরি ত্রুটি জড়িত ছিল কি না, তা স্পষ্ট হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
Promotion Withholding: শাস্তি নয়, প্রশাসনিক সতর্কতা
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত Promotion Withholding-এর বিষয়টি কোনোভাবেই শেখ জাহিদ আহমেদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত শাস্তি হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। বরং এটি হতে পারে তদন্তের নিরপেক্ষতা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষার একটি সাময়িক ব্যবস্থা।
কারণ, এখনো নির্ধারণযোগ্য রয়েছে— ৩ লাখ ৭৫ হাজার ৪১৮ লিটার Quantity Discrepancy-এর প্রকৃত কারণ কী; Calibration-সংক্রান্ত অসঙ্গতির জন্য কার কী দায়িত্ব ছিল; সংশোধিত Calibration Chart কীভাবে তৈরি হলো; এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তদারকি, যাচাই, অনুমোদন ও Monitoring Role-এর সীমা কতটুকু ছিল।
দায় প্রমাণিত না হলে পদোন্নতি পুনর্বিবেচনার সুযোগ
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, তদন্তের ফলাফল কারও বিরুদ্ধে পূর্বধারণা তৈরির ভিত্তি হওয়া উচিত নয়। একইভাবে তদন্ত চলমান থাকা অবস্থায় পদোন্নতি কার্যকর করার ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ ও জবাবদিহিতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
তাদের প্রস্তাব হলো—প্রথমে তদন্ত সম্পন্ন করে দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা নির্ধারণ করা হোক। তদন্তে শেখ জাহিদ আহমেদের বিরুদ্ধে কোনো দায়, অবহেলা বা দায়িত্বগত ত্রুটি প্রতীয়মান না হলে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী তাঁর পদোন্নতির বিষয়টি পুনরায় বিবেচনা করা যেতে পারে।
কিন্তু তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই পদোন্নতি কার্যকর করা হলে ভবিষ্যতে তদন্তের ফলাফল ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
প্রশ্ন এখন যমুনা অয়েল কর্তৃপক্ষের কাছে : ফতুল্লা ডিপোর Tank-22 ও Tank-23-এর Calibration নিয়ে অসঙ্গতি, সংশোধিত Calibration Chart এবং ৩ লাখ ৭৫ হাজার ৪১৮ লিটার ডিজেলের Quantity Discrepancy—সব মিলিয়ে বিষয়টি নিছক হিসাবের গরমিল, নাকি এর পেছনে ব্যবস্থাপনাগত বা কারিগরি ব্যর্থতা ছিল—তা তদন্তেই নির্ধারিত হওয়ার কথা। সেই তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট সময়ে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার পদোন্নতি কার্যকর করা হবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
যমুনা অয়েলের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের একাংশের আহ্বান—কাউকে আগাম দোষী না করে, আবার কাউকে দায়মুক্তিও না দিয়ে; নথি, হিসাব, Calibration এবং দায়িত্বের চেইন অনুসরণ করে নিরপেক্ষ তদন্ত শেষ করা হোক।
তদন্তে দায় প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা এবং দায় প্রমাণিত না হলে পদোন্নতির বিষয়টি পুনর্বিবেচনা—এই নীতিই প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পথ বলে মনে করছেন তারা।
