উত্তর কাস্টমস বন্ডে মাসুম-হাসনাইন চক্রের ‘ঘুষের হাট’ : কোটি টাকার মাসোহারা, ফাইল আটকে অর্থ আদায় ও সম্পদ গড়ার অভিযোগ; নতুন কমিশনারের কাছে তদন্তের দাবি !

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী

বিশেষ প্রতিনিধি : বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাস্টমস বন্ড ব্যবস্থাপনার অন্যতম কেন্দ্র বন্ড কমিশনারেট ঢাকা (উত্তর)। সেই প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মকর্তাকে ঘিরে ওঠা ঘুষ, ক্ষমতার অপব্যবহার, বন্ড সুবিধার অনিয়ম এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ নিয়ে নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়েছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন রাজস্ব কর্মকর্তা (আরও) বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুম এবং কমিশনারের স্টাফ অফিসার এআরও চৌধুরী গোলাম হাসনাইন ওরফে ‘পিচাস হাসনাইন’।


বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সদ্য বিদায়ী কমিশনার আবু ওবায়দা ও অতিরিক্ত কমিশনার দেলোয়ার হোসেনের ছত্রছায়ায় দীর্ঘদিন ধরে মাসুম-হাসনাইন চক্র উত্তর বন্ড কমিশনারেটকে একটি শক্তিশালী ঘুষের সিন্ডিকেটে পরিণত করেছিল। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সম্প্রতি উত্তর বন্ড কমিশনারেটে নতুন কমিশনার নিয়োগের পর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তাদের প্রত্যাশা, নতুন কমিশনার অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবেন।

প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা আদায়ের অভিযোগ : সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, উত্তর কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটে যোগদানের পর থেকে মাসুম-হাসনাইন চক্র বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে প্রতি মাসে বিপুল অঙ্কের অর্থ আদায় করেছে। কোনো কোনো সূত্র এই অঙ্ক প্রতি মাসে অন্তত ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত বলে দাবি করেছে। অভিযোগ রয়েছে, বন্ড সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর ফাইল আটকে রাখা, অডিট প্রক্রিয়া শিথিল করা, শোকজ নোটিশ প্রত্যাহার, বন্ড লাইসেন্স সংক্রান্ত জটিলতা তৈরি বা নিরসনের নামে অনৈতিক আর্থিক সমঝোতা করা হতো।


বিজ্ঞাপন

বিশেষ করে ডিপ্লোমেটিক বন্ড ওয়্যারহাউসের কার্যক্রম থেকে মাসুমের বিরুদ্ধে প্রতি মাসে ২ থেকে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত অবৈধ মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।


বিজ্ঞাপন

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, সরকারি একজন রাজস্ব কর্মকর্তার বৈধ আয়ের সঙ্গে এ ধরনের বিপুল অর্থের কোনো সামঞ্জস্য থাকার কথা নয়। ফলে তার আয়-ব্যয়, ব্যাংক হিসাব, কর নথি এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানের দাবি উঠেছে।

গুরু ঠাকুর’ ছিলেন অতিরিক্ত কমিশনার—অভিযোগ : সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, উত্তর বন্ড কমিশনারেটে মাসুম-হাসনাইন চক্রের প্রভাব বিস্তারে সদ্য বিদায়ী অতিরিক্ত কমিশনার দেলোয়ার হোসেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ও কমিশনারের স্টাফ অফিসার গোলাম মোহাম্মদ হাসনাইন, কমিশনারের পিএ মজনু মিয়াসহ কয়েকজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ও সিপাহীকে নিয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়।

এ চক্রের সদস্যরা বন্ড সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীদের ওপর বিভিন্নভাবে প্রভাব বিস্তার করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি মাসুম ও হাসনাইন যেখানে কর্মরত ছিলেন, সেখানেই নিজেদের ঘনিষ্ঠদের নিয়ে পৃথক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতেন—এমন অভিযোগও রয়েছে সংশ্লিষ্টদের।

হেডকোয়ার্টার রাজস্ব কর্মকর্তার পদ নিয়ে প্রশ্ন  : অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মাসুমের পদায়ন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, চট্টগ্রাম ভ্যাট কমিশনারেট থেকে বদলি হয়ে উত্তর বন্ড কমিশনারেটে আসার পর জ্যেষ্ঠতা ও প্রশাসনিক নিয়ম উপেক্ষা করে অঘোষিত তদবিরের মাধ্যমে তিনি কমিশনারেটের গুরুত্বপূর্ণ ‘হেডকোয়ার্টার রাজস্ব কর্মকর্তা’ পদটি বাগিয়ে নেন।

এ পদে থেকেই তিনি কমিশনারেটের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এই পদ ব্যবহার করে তিনি বিভিন্ন ফাইল, অডিট, শোকজ এবং বন্ড লাইসেন্স সংক্রান্ত বিষয়ে ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেন এবং আর্থিক সমঝোতার সুযোগ তৈরি করতেন।

স্ত্রীর নামে বিপুল সম্পত্তির অভিযোগ৷ : মাসুমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর অংশ তার পরিবারের নামে সম্পদ অর্জন। অভিযোগ অনুযায়ী, মাসুমের স্ত্রী সানজিদা আফরিন লিপির নামে রাজধানীর ভাটারা মৌজায় বিপুল ভূ-সম্পত্তি রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, গৃহিণী হিসেবে পরিচিত লিপির দৃশ্যমান কোনো স্বতন্ত্র আয়ের উৎস না থাকলেও তার নামে উল্লেখযোগ্য সম্পত্তি নিবন্ধিত হয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, ভাটারা মৌজার জেএল নং ১৫, নামজারি খতিয়ান নং ২৯৭১৬, দাগ নং ২০৭৬৩-এর সম্পত্তি নিয়ে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩৭৫৬(IX-I) নম্বর নামজারি মামলার তথ্য পাওয়া যায়। তবে ওই জমির পরিমাণ নিয়েই সরকারি নথিতে বড় ধরনের অসামঞ্জস্যের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী— মূল নামজারি খতিয়ানে জমির পরিমাণ ০.৪০০০ একর, অর্থাৎ ৪০ শতাংশ বা ২৪ কাঠা, আবার ডিজিটাল ভূমি রেকর্ডে একই সম্পত্তির পরিমাণ ৪.৯৬ একর, অর্থাৎ প্রায় ৩০০ কাঠা দেখানো হয়েছে। এই নথিগত গরমিলের প্রকৃত কারণ কী—তা ভূমি অফিসের রেকর্ড যাচাই করে নির্ধারণ করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। অভিযোগকারীদের দেওয়া বর্তমান বাজারদরের হিসাব অনুযায়ী, ভাটারা এলাকায় প্রতি কাঠা জমির মূল্য ৬০ লাখ থেকে ১.৫ কোটি টাকা ধরলে ৪০ শতাংশ জমির আনুমানিক মূল্য দাঁড়ায় ১৫ থেকে ৩৬ কোটি টাকা। আর ডিজিটাল রেকর্ডে দেখানো ৪.৯৬ একর জমির মূল্য ৩০০ কোটি টাকারও বেশি হতে পারে বলে তাদের দাবি।

‘চোরাচালান সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগাযোগ’—গুরুতর অভিযোগ : মাসুম-হাসনাইন চক্রের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, বন্ড সুবিধায় পণ্য আমদানি করে খোলা বাজারে বিক্রি করে দেওয়া একটি চোরাচালান সিন্ডিকেটের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ রয়েছে।

 

অভিযোগ রয়েছে, সন্ধ্যার পর রাজধানীর উত্তরার বিভিন্ন অভিজাত বারে তাদের নিয়মিত আড্ডা বসত এবং সেখানে বন্ড সুবিধাভোগী ও চোরাচালান সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা হতো।

এমনকি মাসুম ও হাসনাইন পরোক্ষভাবে সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত—এমন অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নথি, আর্থিক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের বক্তব্য যাচাই জরুরি।

ঘুষের টাকায় অঢেল সম্পদ’—তদন্তের দাবি : সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, মাসুম ও হাসনাইন স্বল্প সময়ের চাকরিজীবনেই বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। স্ত্রী ও আত্মীয়দের নামে রাজধানীর বিভিন্ন অভিজাত এলাকা ছাড়াও খুলনার সোনাডাঙ্গাসহ বিভিন্ন স্থানে সম্পদ গড়ার অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের মতে, এসব সম্পদের বৈধ উৎস যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে। এ কারণে মাসুম ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা ব্যাংক হিসাব, আয়কর রিটার্ন, জমি-ফ্ল্যাটসহ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।

রাজস্ব ব্যবস্থায় কী প্রভাব পড়ছে ? কাস্টমস বন্ড ব্যবস্থা মূলত রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও উপকরণ শুল্ক সুবিধায় আমদানির সুযোগ দেয়। ফলে এ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি রপ্তানি খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে থেকে যদি কোনো কর্মকর্তা ফাইল আটকে বা ছাড়ার বিনিময়ে অর্থ আদায় করেন, তাহলে সেটি শুধু ব্যক্তিগত দুর্নীতির বিষয় থাকে না; এর প্রভাব পড়ে ব্যবসার পরিবেশ, রাজস্ব আদায় এবং পুরো বন্ড ব্যবস্থার ওপর।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বন্ড কমিশনারেটের এক সাবেক কর্মকর্তা বলেন, হেডকোয়ার্টার রাজস্ব কর্মকর্তার পদটি কমিশনারেটের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। ফলে এই পদকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ অনিয়ম হলে তার প্রভাব পুরো প্রতিষ্ঠানেই পড়ে।

বদলির গুঞ্জন, নাকি ‘নিজেই বদলির চেষ্টা ’? এদিকে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের পর বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুমকে উত্তর কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট থেকে বদলি করা হতে পারে—এমন গুঞ্জন রয়েছে। অন্যদিকে, অভিযোগ ধামাচাপা দিতে তিনি নিজেই অন্যত্র বদলির চেষ্টা করছেন বলেও সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র দাবি করেছে। তবে বদলি সংক্রান্ত এ দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

দুদকের নজরদারি ও তদন্তের দাবি : মাসুম-হাসনাইন চক্রের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নজরদারি রয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।

ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের দাবি : অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। বিশেষ করে—মাসুম ও তার পরিবারের সদস্যদের সব ব্যাংক হিসাব, আয়কর রিটার্ন এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য যাচাই, ডিপ্লোমেটিক বন্ড ওয়্যারহাউসসহ সংশ্লিষ্ট বন্ড প্রতিষ্ঠানগুলোর ফাইল, লেনদেন ও অডিট কার্যক্রম পরীক্ষা, মাসুমের স্বাক্ষরিত ফাইল নোটিং ও সিদ্ধান্তগুলো পর্যালোচনা, বন্ড সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন ও যোগাযোগের আইনসম্মত নথি পর্যালোচনা—এসব পদক্ষেপ নেওয়া।

নতুন কমিশনারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ : উত্তর বন্ড কমিশনারেটে নতুন কমিশনার নিয়োগের পর কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ব্যবসায়ী মহলের প্রত্যাশা এখন এক জায়গায়—অভিযোগগুলো কতটা সত্য, তা নিরপেক্ষ তদন্তে বেরিয়ে আসবে কি না।

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং নবনিযুক্ত কমিশনারের প্রতি মাসুম-হাসনাইন চক্রের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের ভাষায়, কাস্টমস বন্ডের মতো স্পর্শকাতর রাজস্ব ব্যবস্থায় কোনো ‘ঘুষ সিন্ডিকেট’ যদি সত্যিই সক্রিয় থাকে, তাহলে শুধু কয়েকজন কর্মকর্তার বদলি নয়—পুরো চক্রের আর্থিক লেনদেন, সম্পদ ও প্রশাসনিক যোগসূত্র খুঁজে বের করাই হবে সবচেয়ে জরুরি কাজ।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুম, চৌধুরী গোলাম হাসনাইন, সদ্য বিদায়ী কমিশনার আবু ওবায়দা এবং অতিরিক্ত কমিশনার দেলোয়ার হোসেনের বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যথাযথভাবে সংযুক্ত করা হবে।

👁️ 30 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *