
নিজস্ব প্রতিবেদক : সম্প্রতি দেশজুড়ে চুরি, ডাকাতি, হত্যা ও চাঁদাবাজীসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধের সংখ্যা লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। শহর থেকে গ্রাম—সর্বত্র মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার বোধ তীব্র হচ্ছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞ, সমাজবিজ্ঞানী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্টদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এই পরিস্থিতির পেছনের একাধিক কারণ।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা : ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেকটাই ভেঙে পড়ে। এরপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং পরবর্তীতে নির্বাচিত সরকার পুলিশ বাহিনীতে সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও বাস্তবে তার সুফল মিলছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে। বাধ্যতামূলক অবসর, পদোন্নতি-জটিলতা এবং উচ্চপর্যায়ে অনাকাঙ্ক্ষিত তদবিরের কারণে পুলিশ কর্মকর্তারা নিজেদের ক্ষমতা পুরোপুরি প্রয়োগ করতে পারছেন না।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে অপরাধের হার বাড়ছে। ক্রিমিনোলজি বিশেষজ্ঞদের একাংশের পর্যবেক্ষণ, নির্বাচন-পরবর্তী সময়েও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।

অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও বেকারত্ব : বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা বর্তমান অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। সমাজে বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্য মানুষকে টিকে থাকার উপায় হিসেবে অপরাধের পথে ঠেলে দিচ্ছে। বৈধ কর্মসংস্থানের সংকটে পড়ে অনেকে পরিবার চালাতে অবৈধ পথ বেছে নিচ্ছেন।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, অর্থনৈতিক হতাশা থেকেই জন্ম নিচ্ছে কিশোর অপরাধ, নারী ও শিশু নির্যাতনের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা এবং মাদকাসক্তি-সংশ্লিষ্ট অপরাধ।
মাদকের ভয়াবহ বিস্তার : অপরাধ বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ছিনতাইকারীদের একটি বড় অংশ মাদকাসক্ত অথবা মাদক-চক্রের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। নেশার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা চুরি, ছিনতাই, মারামারি থেকে শুরু করে হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত ঘটাতে দ্বিধা করছে না। মাদককে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র, যারা বেকার তরুণদের মাদক পরিবহন ও বিক্রির কাজে ব্যবহার করছে।
পারিবারিক ও সামাজিক ভাঙন : পরিবার থেকে দূরত্ব, প্রযুক্তির অপব্যবহার, সামাজিক অবক্ষয় এবং নৈতিক শিক্ষার ঘাটতিকে অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন সমাজবিজ্ঞানীরা। বিশেষত কিশোর অপরাধের পেছনে ভাঙা পরিবার, দারিদ্র্য, শিশুশ্রম, খারাপ সঙ্গীর প্রভাব এবং পারিবারিক অস্থিরতা বড় ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
বিচারহীনতা ও আইনের দুর্বল প্রয়োগ : ধর্ষণসহ সহিংস অপরাধ বৃদ্ধির প্রসঙ্গে বিশ্লেষকরা বারবার একটি বিষয়ে একমত হয়েছেন—বিচারহীনতা। আইন কাগজে-কলমে থাকলেও তার বাস্তব প্রয়োগে দুর্বলতা, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব অপরাধীদের সাহস জোগাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নৈতিক অবক্ষয় ও মূল্যবোধের অবনতি।
সরকারি পদক্ষেপ৷ : পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে: সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব ও পুলিশের সমন্বয়ে পরিচালিত হয়েছে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ অভিযান।
পুলিশ প্রশাসনে স্বচ্ছতা আনতে পাস করা হয়েছে ‘পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’।
আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে কর্মকৌশল প্রণয়নে পুলিশ সদর দপ্তরে গঠিত হয়েছে একাধিক বিশেষ কমিটি। পুলিশ প্রশাসনে বড় পরিসরে রদবদল আনা হয়েছে প্রশাসনিক গতিশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির সম্ভাবনা থাকলেও তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটবে না—প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে অপরাধ বৃদ্ধি কোনো একক কারণে ঘটছে না। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পুলিশি সংস্কারের ব্যর্থতা, অর্থনৈতিক সংকট ও বেকারত্ব, মাদকের ভয়াবহ বিস্তার, পারিবারিক-সামাজিক ভাঙন এবং বিচারহীনতা—এই পাঁচটি কারণ পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে একটি জটিল সংকট তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, এই সংকট মোকাবিলায় শুধু পুলিশি অভিযান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন অর্থনৈতিক সংস্কার, বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা বৃদ্ধি, মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন এবং পারিবারিক মূল্যবোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠার সম্মিলিত প্রচেষ্টা।
