
লায়ন মোঃ আরিফুল ইসলাম মুরাদ : বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ এক উজ্জ্বল ও অনন্য নাম।

দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সততা, নিষ্ঠা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে বিচারিক দায়িত্ব পালন করে তিনি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আপিল বিভাগে আসীন হন। তাঁর এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের ইতিহাস নয়; এটি বাংলাদেশের নারীসমাজের অগ্রযাত্রা এবং বিচারব্যবস্থায় সংখ্যালঘু নারীর প্রতিনিধিত্বের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
তিনি বাংলাদেশের প্রথম হিন্দু নারী বিচারপতি হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেন। একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের প্রথম হিন্দু নারী বিচারপতি হিসেবে তাঁর অভিষেক দেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।

১৯৫৫ সালের ১০ অক্টোবর বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব ও পারিবারিক জীবনের সঙ্গে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের স্মৃতি জড়িয়ে থাকলেও তাঁর পূর্বপুরুষের শিকড় প্রোথিত কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার পুড্ডা গ্রামে।

পুড্ডা গ্রামের ঐতিহ্যবাহী দেবনাথ পরিবার ছিল শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক মর্যাদায় সমৃদ্ধ। তাঁর পিতা দীনেশ চন্দ্র দেবনাথ ছিলেন একজন স্বনামধন্য বিচারক। পরবর্তী সময়ে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপনা করেন। বাবার বিচারিক জীবন ও আইনশাস্ত্রের সঙ্গে গভীর সম্পৃক্ততা কৃষ্ণা দেবনাথের পারিবারিক পরিবেশে ন্যায়বোধ, শৃঙ্খলা ও শিক্ষার প্রতি অনুরাগ সৃষ্টি করে।
বাবার বদলির চাকরির কারণে শৈশবে তাঁকে দেশের বিভিন্ন স্থানে বসবাস করতে হয়। কিন্তু কিশোরগঞ্জের পুড্ডা গ্রামের পৈতৃক ভিটা ছিল তাঁদের পারিবারিক বন্ধনের অন্যতম কেন্দ্র। গ্রামীণ পরিবেশে পারিবারিক ঐতিহ্যের সঙ্গে বেড়ে ওঠা এবং বাবার কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা তাঁর চিন্তাজগতে গভীর প্রভাব ফেলে।
শৈশব থেকেই কৃষ্ণা দেবনাথের মনে বিচারক হওয়ার স্বপ্ন জাগে। বাবার এজলাসে বসে বিচারিক কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করা এবং মানুষের অধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া তাঁকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে।
১৯৭০ সালে তিনি সিলেট গার্লস স্কুল থেকে বিজ্ঞান বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন (এসএসসি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর রংপুরের বেগম রোকেয়া কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন।
পরবর্তীতে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। সেখান থেকে এলএলবি ও এলএলএম ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে তাঁর বিচারিক পেশায় প্রবেশের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়। বাবার আইনজীবন ও অধ্যাপনার ঐতিহ্য অনুসরণ করে আইনশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ তাঁর জীবনের একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়।
শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৮১ সালে মাত্র ২৬ বছর বয়সে কৃষ্ণা দেবনাথ বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসে মুন্সেফ বা সহকারী জজ হিসেবে যোগদান করেন। এই যোগদানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ ও গৌরবময় বিচারিক কর্মজীবন।
প্রাথমিক পর্যায় থেকেই তিনি বিচারিক দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠা, সততা ও নিরপেক্ষতার পরিচয় দেন। দেশের বিভিন্ন আদালতে দায়িত্ব পালন করে তিনি ধীরে ধীরে বিচার বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ পদে উন্নীত হন।
১৯৯৬ সালের ১ নভেম্বর তিনি জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। এই পদে তাঁর দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে বিচারিক অভিজ্ঞতা আরও সমৃদ্ধ হয় এবং উচ্চতর বিচারিক দায়িত্বের জন্য তাঁর যোগ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়।
দীর্ঘ বিচারিক অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১০ সালের ১৮ এপ্রিল কৃষ্ণা দেবনাথ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হন।
পরবর্তীতে ২০১২ সালে তিনি হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। হাইকোর্টে দায়িত্ব পালনকালে তিনি সংবিধান, আইন ও বিচারিক নীতির আলোকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মামলার বিচারকার্যে অংশগ্রহণ করেন।
তাঁর বিচারিক জীবন ছিল সংযম, যুক্তিবোধ ও ন্যায়বিচারের প্রতি অবিচল অঙ্গীকারে সমৃদ্ধ। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এবং আইনশাস্ত্রে গভীর জ্ঞান তাঁকে দেশের উচ্চতর বিচারব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের জন্য প্রস্তুত করে।
২০২২ সালের ৯ জানুয়ারি বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। এই নিয়োগের মধ্য দিয়ে তিনি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আপিল বিভাগে প্রথম হিন্দু নারী বিচারপতি হিসেবে ইতিহাস সৃষ্টি করেন।
তাঁর এই অভিষেক বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। তিনি আপিল বিভাগের তৃতীয় নারী বিচারপতি হিসেবেও দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আপিল বিভাগে নারী বিচারপতিদের পথচলা শুরু হলেও কৃষ্ণা দেবনাথের নিয়োগ সংখ্যালঘু নারীর প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথের এই অর্জন প্রমাণ করে যে যোগ্যতা, মেধা, সততা ও কর্মনিষ্ঠার মাধ্যমে একজন নারী সমাজের প্রচলিত সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে দেশের সর্বোচ্চ বিচারিক প্রতিষ্ঠানে নিজের স্থান করে নিতে পারেন।
দীর্ঘ ৪১ বছরের বিচারিক কর্মজীবন শেষে ২০২২ সালের ৯ অক্টোবর বয়সসীমা অনুযায়ী বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ অবসর গ্রহণ করেন।
মুন্সেফ হিসেবে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা থেকে শুরু করে জেলা ও দায়রা জজ, হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি এবং সর্বশেষ আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন—প্রতিটি পর্যায়েই তিনি বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।
তাঁর জীবনগাথা কেবল একজন বিচারপতির কর্মজীবনের বিবরণ নয়; এটি একটি পরিবারের শিক্ষাগত ঐতিহ্য, একজন নারীর দৃঢ় প্রত্যয় এবং ন্যায়বিচারের প্রতি আজীবন অঙ্গীকারের ইতিহাস।
কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার পুড্ডা গ্রামের ঐতিহ্যবাহী পরিবার থেকে উঠে এসে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আপিল বিভাগে আসীন হওয়া বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ বাংলাদেশের নারীসমাজের জন্য এক অনন্য অনুপ্রেরণা।
তাঁর জীবন প্রমাণ করে, মেধা, শিক্ষা ও সততার শক্তিতে একজন নারী শুধু নিজের ভাগ্যই পরিবর্তন করতে পারেন না, বরং দেশের ইতিহাসেও স্থায়ী স্বাক্ষর রেখে যেতে পারেন। বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথের নাম তাই চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
