
নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজকে (এমজিআই) ঘিরে নতুন করে উঠেছে গুরুতর কিছু অভিযোগ। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির মালিকানাধীন একাত্তর টিভিতে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের সুবিধাভোগী ও আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকজন সাংবাদিককে পুনর্বহাল, গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রাখা এবং আটক ব্যক্তিদের বেতন-ভাতা পুনরায় চালুর নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগপন্থী পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে একাত্তর টিভির নিউজরুম থেকে যেসব সাংবাদিককে সরিয়ে রাখা হয়েছিল, তাদের কয়েকজনকে সম্প্রতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
একই সময়ে জুলাই-পরবর্তী সময়ে আটক হওয়া কয়েকজন সাংবাদিকের বেতনও পুনরায় চালুর নির্দেশ আসে মেঘনা গ্রুপের পক্ষ থেকে।

সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগ হলো—একাত্তর টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রধান সম্পাদক ও শেয়ারহোল্ডার মোজাম্মেল বাবুকে মাসে ১৬ লাখ টাকা বেতন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাঁর স্ত্রী ও কন্যাকে প্রত্যেককে প্রায় ৫ লাখ টাকা করে এবং সাংবাদিক দম্পতি শাকিল আহমেদ ও ফারজানা রূপাকে প্রত্যেককে প্রায় ৪ লাখ টাকা করে মাসিক বেতন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও সূত্রের দাবি।

আরও অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্টদের ব্যাংক হিসাব জব্দ থাকায় তাদের বেতন নগদে পরিশোধ করা হচ্ছে। তবে নগদে বেতন দেওয়ার এই দাবির স্বাধীন প্রমাণ প্রকাশ্যে এসেছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
আটক সাংবাদিকদের বেতন ফেরানোর নির্দেশ ? বিষয়টি সম্পর্কে অবগত অন্তত দুটি সূত্রের দাবি, একাত্তর টিভির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে আটক থাকা তিন সাংবাদিকের বেতন পুনরায় চালু করার নির্দেশ দেওয়া হয়। তাদের বিরুদ্ধে জুলাইয়ের আন্দোলনে কথিত ভূমিকা, হত্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা ও আটকের বিষয়টি সামনে এসেছে।
সূত্রের দাবি অনুযায়ী, মোজাম্মেল বাবুর জন্য মাসিক ১৬ লাখ টাকা, তাঁর স্ত্রী ও কন্যার জন্য প্রত্যেককে প্রায় ৫ লাখ টাকা এবং ফারজানা রূপা ও শাকিল আহমেদের জন্য প্রত্যেককে প্রায় ৪ লাখ টাকা বেতন নির্ধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ শুধু উল্লিখিত পাঁচজনের ক্ষেত্রেই মাসিক বেতন-ভাতার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩৪ লাখ টাকা। এর বাইরে আওয়ামী লীগ আমলে সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত আরও কয়েকজনকে পুনর্বহাল ও বেতন দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

শফিক আহমেদের আকস্মিক বরখাস্ত : এই ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেই একাত্তর টিভির চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) ও হেড অব নিউজ শফিক আহমেদকে বরখাস্ত করার ঘটনা নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত অন্তত দুটি সূত্র জানিয়েছে, ৫১ বছর বয়সী শফিক আহমেদকে গত সোমবার পদত্যাগ করতে বলা হয়েছিল। তিনি পদত্যাগে অস্বীকৃতি জানালে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, ৫ আগস্টের পর যেসব সাংবাদিককে আওয়ামী লীগপন্থী পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে নিউজরুমের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছিল, তাদের কয়েকজনকে গত সপ্তাহে আবার গুরুত্বপূর্ণ পদে ফিরিয়ে আনার পর একাত্তর টিভির অভ্যন্তরে উত্তেজনা তৈরি হয়। একটি সূত্রের দাবি, আটক সাংবাদিকদের বেতন পুনরায় চালুর নির্দেশ বাস্তবায়নের বিষয়টিও শফিক আহমেদের নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ তৈরি করেছিল।
‘পুনর্বাসন’ নিয়ে প্রশ্ন : অভিযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে—ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বা সুবিধাভোগের অভিযোগ রয়েছে এমন ব্যক্তিদের একাত্তর টিভিতে আবারও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া।
অভ্যুত্থানের পর একাত্তর টিভির নিউজরুমে যে পরিবর্তন : এসেছিল, সাম্প্রতিক পদায়ন ও পুনর্বহালের ঘটনায় সেই পরিবর্তন কতটা টেকসই এবং কার নির্দেশে তা উল্টে যাচ্ছে—এ নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে।
সমালোচকদের কেউ কেউ বলছেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিকপক্ষ কর্মীদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতেই পারে। কিন্তু যখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গুরুতর মামলা ও আটকের বিষয় রয়েছে, তখন তাদের বেতন পুনরায় চালুর সিদ্ধান্তের পেছনে কী নীতিগত বা আইনি ভিত্তি রয়েছে, সেটি পরিষ্কার করা জরুরি।

আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠদের প্রকাশ্য তৎপরতা : অন্যদিকে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত বলে অভিযোগ থাকা কয়েকজন বুদ্ধিজীবী ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বের নিয়মিত টকশো উপস্থিতি নিয়েও সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে।
মনজুর পান্না, মহসিন রশীদ, আবু হেনা রাজ্জাকী, মাহবুব আজিজ ও মাহবুব কামালদের বিভিন্ন টকশোতে নিয়মিত উপস্থিত হয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের কর্মকাণ্ডের পক্ষে বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি প্রথম আলো, ‘দিল্লি স্টার’ ও আজাদের সমকালসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন সমালোচকেরা।
হাসিনা পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ : মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামালকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ ও অনুগত ব্যবসায়ী হিসেবে বিভিন্ন মহলে বর্ণনা করা হয়ে থাকে। তাঁর মালিকানাধীন ইয়ট এবং শেখ হাসিনার পরিবারের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে অবকাশযাপনে যাওয়ার বিষয়েও নানা আলোচনা রয়েছে। তবে অভিযোগের মূল প্রশ্নটি ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়ে বড়—একটি বেসরকারি শিল্পগোষ্ঠী যদি কোনো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের সম্পাদকীয় ও মানবসম্পদ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে সরাসরি নির্দেশনা দিয়ে থাকে, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া, উদ্দেশ্য ও জবাবদিহি কী ছিল?

‘রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ’ করার মতো পরিস্থিতি ? সমালোচকদের মতে, কোনো ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব রাষ্ট্রীয় সংস্থার সিদ্ধান্তে জব্দ থাকার পরও যদি কোনো করপোরেট প্রতিষ্ঠান তাকে নিয়মিত বেতন দেওয়ার ব্যবস্থা করে এবং একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পুনর্বহাল করে, তাহলে বিষয়টি নিছক নিয়োগ বা বেতন-ভাতার প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠতে পারে—ব্যাংক হিসাব জব্দের আইনগত অবস্থার সঙ্গে নগদে বেতন পরিশোধের কোনো সাংঘর্ষিকতা রয়েছে কি না, অর্থের হিসাব কীভাবে সংরক্ষিত হচ্ছে, আয়কর ও হিসাবরক্ষণ বিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না এবং কোম্পানির বোর্ড বা শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদন নেওয়া হয়েছে কি না।
বিশেষ করে বিপুল অঙ্কের মাসিক পারিশ্রমিক নগদে পরিশোধের অভিযোগ সত্য হলে সেটির হিসাব-নিকাশ, উৎস, কর কর্তন এবং আর্থিক নথিপত্র তদন্তের আওতায় আসা স্বাভাবিক। কার নির্দেশে, কেন ? পুরো ঘটনাপ্রবাহে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—মেঘনা গ্রুপের পক্ষ থেকে সত্যিই কি এসব বেতন পুনরায় চালু ও পুনর্বহালের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল ?
যদি দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে— কোন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে এই নির্দেশ দেওয়া হয় ? পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছিল কি না ? সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে থাকা মামলার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল কি না ? ব্যাংক হিসাব জব্দ থাকার পর বেতন নগদে দেওয়ার সিদ্ধান্তের আইনগত ভিত্তি কী ? নগদ অর্থের উৎস ও হিসাব কীভাবে দেখানো হয়েছে ? একাত্তর টিভির সম্পাদকীয় ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় মালিকপক্ষের হস্তক্ষেপের সীমা কোথায় ? শফিক আহমেদকে কেন পদত্যাগে চাপ দেওয়া হয়েছিল এবং অস্বীকৃতির পরই বা কেন বরখাস্ত করা হলো ? এসব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত ঘটনাটি নিয়ে তৈরি হওয়া সন্দেহ দূর হওয়ার সুযোগ কম।

তদন্তের দাবি : মেঘনা গ্রুপ ও একাত্তর টিভিকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো সত্য হলে বিষয়টি শুধু একটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে কর, কোম্পানি আইন, ব্যাংকিং বিধি, আর্থিক লেনদেন এবং গণমাধ্যমের মালিকানা ও সম্পাদকীয় স্বাধীনতার মতো একাধিক বিষয় জড়িত থাকতে পারে।
এ কারণে সংশ্লিষ্ট নথি, ব্যাংক হিসাব, বেতন শিট, নগদ পরিশোধের রেকর্ড, বোর্ডের সিদ্ধান্ত এবং নিয়োগ-বহিষ্কার সংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাই করে অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরূপণের দাবি উঠেছে।
একই সঙ্গে মেঘনা গ্রুপ ও একাত্তর টিভি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাদের বক্তব্য প্রকাশ্যে এলে পুরো ঘটনাপ্রবাহের একটি ভারসাম্যপূর্ণ চিত্র পাওয়া সম্ভব হবে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—ক্ষমতাচ্যুত একটি রাজনৈতিক আমলের বিতর্কিত ব্যক্তিদের পুনর্বাসন কি কেবল একটি শিল্পগোষ্ঠীর ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও বিস্তৃত কোনো প্রভাববলয়? উত্তর মিলতে পারে নথিপত্র, আর্থিক হিসাব ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যে।
