দেবীগঞ্জে ১০ মাসেও পাঠ্যবই পায়নি অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী 

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত গ্রাম বাংলার খবর জাতীয় বিশেষ প্রতিবেদন শিক্ষাঙ্গন সারাদেশ

পঞ্চগড় প্রতিনিধি  :  পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে শিক্ষাবর্ষ শুরুর প্রায় ১০ মাস হতে চললেও নৃপেন্দ্র নারায়ণ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী এখনো বিভিন্ন বিষয়ের পাঠ্যবই পায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। বই না পাওয়ায় অনেক শিক্ষার্থীকে গাইড বই কিংবা সহপাঠীদের বইয়ের ওপর নির্ভর করে পড়াশোনা করতে হচ্ছে।


বিজ্ঞাপন

বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বিদ্যালয়ে সরেজমিনে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে বিভিন্ন বিষয়ের বই না পাওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। তবে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে কতজন বই পায়নি, তা এদিন নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণিতে মোট শিক্ষার্থী ১১৯ জন। তাদের মধ্যে বিজ্ঞান বিষয়ের বই পায়নি একজন, গণিত তিনজন, ধর্ম দুইজন এবং বাংলা দ্বিতীয় পত্রের বই পায়নি একজন শিক্ষার্থী। এছাড়া দুই-একজন ছাড়া অধিকাংশ শিক্ষার্থী চারু ও কারুকলা, শারীরিক শিক্ষা এবং কর্ম ও জীবনমুখী শিক্ষা বিষয়ের বই পায়নি বলে জানিয়েছে।

ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী মুন্না ও হামিম জানায়, তারা এখনো ধর্ম বিষয়ের বই পায়নি। বিষয়টি শিক্ষককে জানানো হলেও এখনো বই দেওয়া হয়নি।


বিজ্ঞাপন

সপ্তম শ্রেণির সাতজন শিক্ষার্থীও এখনো হিন্দুধর্ম বিষয়ের বই পায়নি বলে জানা গেছে। অষ্টম শ্রেণির দুইজন শিক্ষার্থী চারু ও কারুকলা বিষয়ের বই পায়নি।


বিজ্ঞাপন

নবম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগে মোট শিক্ষার্থী ৭১ জন। তাদের মধ্যে তিনজন কৃষি শিক্ষা এবং একজন উচ্চতর গণিত বিষয়ের বই পায়নি বলে জানা গেছে।

বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আদিব বলে, ‘আমি এখনো কৃষি শিক্ষা বই পাইনি। স্যারকে বলেছি যে বই পাইনি। স্যার বলেছেন বই শেষ হয়ে গেছে।’

সবচেয়ে বেশি বই না পাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে নবম শ্রেণির মানবিক বিভাগে। এ বিভাগে মোট শিক্ষার্থী ৪৩ জন। তাদের মধ্যে কৃষি শিক্ষা বিষয়ের বই পায়নি ২১ জন, গণিত ১০ জন, আইসিটি ৮ জন, বিজ্ঞান ৬ জন, ধর্ম পাঁচ জন, ভূগোল পাঁচ জন, বাংলা প্রথমপত্র পাঁচ জন, বাংলা দ্বিতীয়পত্র পাঁচ জন, ইংরেজি প্রথমপত্র পাঁচ জন, ইতিহাস তিন জন, পৌরনীতি তিন জন এবং ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের বই পায়নি তিন জন শিক্ষার্থী। ধর্ম বিষয়ের বই না পাওয়া পাঁচ শিক্ষার্থীর মধ্যে একজন হিন্দু শিক্ষার্থী রয়েছে।

মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী বিপ্লব রায় বলে, ‘আমি শুরু থেকেই মানবিক বিভাগে পড়ছি। আমি এখনো ধর্ম বই পাইনি। স্যারকে বলেছি, স্যার বলেছেন রাসেল ভাইয়ের কাছ থেকে নিতে। সেও বলেছে বই নেই। অর্ধবার্ষিক পরীক্ষায় গাইড বই পড়ে পরীক্ষা দিতে হয়েছে।’

একই বিভাগের শিক্ষার্থী মাহমুদুল ইসলাম মুরাদ বলে, ‘আমি এখন পর্যন্ত পাঁচটি বই পেয়েছি। স্যারকে যখন বলেছি বাকি বই পাইনি, তখন স্যার রাসেল ভাইয়ের কাছে নিতে বলেছেন। কিন্তু রাসেল ভাই বলেছেন তার কাছে বই নেই। পরে আমাদের তালিকা করে হেড স্যারকে দিয়েছে। কিন্তু এখনো বই পাইনি।’

এদিকে বিদ্যালয়ে সরকারি অফিস সহায়ক থাকা সত্ত্বেও বই সংগ্রহ ও বিতরণের দায়িত্ব খণ্ডকালীন নৈশপ্রহরী রাসেল ইসলামকে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

রাসেল ইসলাম বলেন, ‘স্যারেরা আমাকে বই দিতে বলেছিলেন। আমার কাছে যেসব বই ছিল সেগুলো আমি দিয়ে দিয়েছি।’
বই বিতরণের সময় কোন শিক্ষার্থী কোন বিষয়ের বই পেয়েছে এবং কোন বিষয়ের বই পায়নি—এমন কোনো তালিকা রাখা হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাকে তো এরকম কোনো তালিকা করতে বলা হয়নি।’

ষষ্ঠ শ্রেণির শ্রেণি শিক্ষক তনবিরুজ্জামান রুবেল বলেন, ‘আমার ক্লাসে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ জন শিক্ষার্থী মিউচুয়াল ট্রান্সফার ও টিসি নিয়ে ভর্তি হয়েছে। বছরের শুরুর তিন মাসেই মোটামুটি সব সাবজেক্টের বই দেওয়া হয়েছে। আমার ক্লাসের সব ছাত্র বই পেয়েছে। তবে এমন হতে পারে, দুই-একজন যারা অন্য স্কুল থেকে মিউচুয়াল ট্রান্সফারের মাধ্যমে এসেছে তারা হয়তো ওই স্কুলে এক-দুইটা বই পায়নি। সেটাই ঘাটতি থাকতে পারে।’

নবম শ্রেণির মানবিক বিভাগের শ্রেণি শিক্ষক নয়ন চন্দ্র রায় বলেন, ‘আমাকে যখন ক্লাস টিচারের দায়িত্ব দেওয়া হয় তখন শিক্ষার্থী ছিল ১৮ জন, আর এখন ৪৩ জন। মানবিকের বইয়ের চাহিদা দেওয়া ছিল ২৫ জনের। অনেক শিক্ষার্থী প্রথমে বিজ্ঞান বিভাগ নেয়, পরে আবার মানবিক বিভাগে এসেছে। এছাড়া গত বছরের কিছু শিক্ষার্থী এসে পরে ভর্তি হয়েছে। এজন্য এমনটা হয়েছে।’

নবম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের শ্রেণি শিক্ষক স্বপন চন্দ্র প্রামানিক বলেন, বছরের শুরুতে বিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষার্থী বেশি ছিল। পরবর্তীতে অনেকেই মানবিক বিভাগে চলে যাওয়ায় বই পায়নি। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে মানবিক বিভাগে সাতজন শিক্ষার্থী গেছে বলেও জানান তিনি।

তবে বর্তমানে বিজ্ঞান বিভাগে তিনজন এবং মানবিক বিভাগে ২১ জন শিক্ষার্থী শুধু কৃষি শিক্ষা বিষয়ের বই পায়নি বলে জানা গেছে।
শিক্ষার্থীদের বই না পাওয়ার অভিযোগের বিষয়ে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জি.এম রুহুল আমিন বলেন, ‘আমরা সকল শিক্ষার্থীকে বই দিয়েছি। মাঝখানে কিছু শিক্ষার্থী বিভাগ পরিবর্তন করেছে, তাদের বইয়ের সমস্যা ছিল। সেগুলো তালিকা করে মাধ্যমিক অফিস থেকে আমরা বই এনে দিয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘হয়তো যেসব শিক্ষার্থী এ ধরনের অভিযোগ করছে, তাদের বই হারিয়ে গেছে অথবা নষ্ট করে ফেলেছে। এজন্য তারা বলতেছে আমরা বই পাইনি।’

এ বিষয়ে দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইন্দ্রজীৎ সাহা বলেন, ‘খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

শিক্ষাবর্ষের শেষদিকে এসেও বিভিন্ন বিষয়ের পাঠ্যবই না পাওয়ার অভিযোগে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। দ্রুত বই সরবরাহ করে সংকটের সমাধান করার দাবি জানিয়েছে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা।

👁️ 16 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *