রাজউকের নিরীক্ষা শাখায় “টুম্পা সিন্ডিকেট” ! ফাইল আটকে ঘুষ, ডেভেলপারদের কাছ থেকে মাসোহারা—কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগ; নীরব কেন রাজউক ?

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) নিরীক্ষা শাখায় অনিয়ম, ঘুষ গ্রহণ, ফাইল আটকে রাখা এবং গ্রাহক হয়রানির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সহকারী পরিচালক নাদিয়া আহমেদ টুম্পার বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের দাবি, তাঁকে ঘিরে রাজউকের নিরীক্ষা শাখায় একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে, যাকে কেউ কেউ ‘টুম্পা সিন্ডিকেট’ হিসেবে উল্লেখ করছেন।


বিজ্ঞাপন

অভিযোগ রয়েছে, ফ্ল্যাট হস্তান্তর, নামজারি, জমির মালিকানা পরিবর্তন, কমিশন, জমি তদন্ত ও হাজিরাসহ বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজকে কেন্দ্র করে অর্থ দাবি করা হয়। ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকেও নিয়মিত ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ‘মাসোহারা’ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে ফাইল আটকে রাখা, নতুন আপত্তি তৈরি করা কিংবা ভুল তথ্যসংবলিত চিঠি দিয়ে হয়রানি করার ঘটনাও ঘটে। অভিযোগ, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা এবং সরকারি নথিকে পৃথকভাবে যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে এত গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে রাজউক কর্তৃপক্ষের কোনো অভ্যন্তরীণ তদন্ত, অডিট বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা হয়েছে কি না—সেটিও এখন বড় প্রশ্ন।

রাজউকের সরকারি কর্মকর্তা তালিকায় নাদিয়া আহমেদ টুম্পাকে সহকারী পরিচালক (নিরীক্ষা) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই তালিকায় তাঁর দাপ্তরিক ই-মেইল ও মোবাইল নম্বরও প্রকাশ করা হয়েছে।


বিজ্ঞাপন

ফাইল আটকে রেখে অর্থ আদায়ের অভিযোগ : সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সূত্রগুলোর কাছ থেকে পাওয়া অভিযোগ অনুযায়ী, নাদিয়া আহমেদ টুম্পাকে ঘিরে মূলত পাঁচ ধরনের অভিযোগ রয়েছে।
প্রথমত, ফ্ল্যাট হস্তান্তর, নামজারি, জমির মালিকানা পরিবর্তন ও কমিশন-সংক্রান্ত ফাইল অনুমোদন বা নিষ্পত্তিতে অর্থ দাবির অভিযোগ। দ্বিতীয়ত, জমি তদন্ত বা কমিশনের কার্যক্রমের নামে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়ার দাবি। তৃতীয়ত, রাজউকে হাজিরা বা সংশ্লিষ্ট কাজের জন্য ৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থ দেওয়ার অভিযোগ। চতুর্থত, ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রতি মাসে ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়মিত ‘মাসোহারা’ নেওয়ার দাবি। পঞ্চমত, অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে ফাইল আটকে রাখা, নতুন আপত্তি তৈরি করা কিংবা ভুল তথ্যসংবলিত চিঠি দিয়ে হয়রানি করার অভিযোগ। প্রশ্ন হলো—একজন সরকারি কর্মকর্তার দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনের সঙ্গে যদি এ ধরনের অর্থ দাবির অভিযোগ যুক্ত হয়, তাহলে রাজউকের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিষয়টি সম্পর্কে কতটা অবহিত ? অভিযোগ পুরোনো, কিন্তু তদন্ত কোথায় ?


বিজ্ঞাপন

২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনেও নাদিয়া আহমেদ টুম্পার বিরুদ্ধে প্রায় একই ধরনের অভিযোগ প্রকাশ করা হয়েছিল। সেখানে ফাইল আটকে রাখা, তদন্ত ও হাজিরার নামে অর্থ নেওয়া এবং ডেভেলপারদের কাছ থেকে মাসিক অর্থ আদায়ের দাবি তোলা হয়। অভিযোগগুলো নতুন নয়। কিন্তু এতদিনেও যদি এসব অভিযোগের বিষয়ে কার্যকর তদন্ত না হয়ে থাকে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—রাজউকের অভ্যন্তরীণ নজরদারি ব্যবস্থা কোথায় ?

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ—কাগজ ঠিক থাকলেও ফাইল পড়ে থাকে  : অভিযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এসেছে সেবা নিতে যাওয়া ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে। তাঁদের দাবি, একটি ফাইলের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও কখনো সেটি দীর্ঘদিন আটকে থাকে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের পর নতুন আপত্তি বা অতিরিক্ত কাগজপত্র চাওয়া হয়।

এরপর অর্থ দেওয়ার মাধ্যমে কাজটি দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার পথ তৈরি হয়—এমন অভিযোগও রয়েছে। কয়েকজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দাবি করেছেন, জমি তদন্ত কিংবা কমিশনের কাজে তাঁদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা চাওয়া হয়েছে। আবার কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, রাজউকে হাজিরা দেওয়ার ক্ষেত্রেও অনানুষ্ঠানিক অর্থ দিতে হয়েছে।

সরকারি নথিতে অন্তত একটি বিষয় নিশ্চিত—নাদিয়া আহমেদ টুম্পা রাজউকের সহকারী পরিচালক (নিরীক্ষা) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ কারণেই এখন প্রয়োজন নথিভিত্তিক অনুসন্ধান। যেসব ফাইল নিয়ে অর্থ দাবির অভিযোগ রয়েছে, সেসব ফাইলের নোটশিটে কী আছে ? একই কর্মকর্তার কাছে যাওয়ার পর কতদিন ফাইল পড়ে ছিল ? কখন আপত্তি দেওয়া হয়েছিল ? কখন তা নিষ্পত্তি হয়েছে?

রাজউকের অভ্যন্তরীণ তদন্ত হয়েছে কি ? এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন রাজউক কর্তৃপক্ষের কাছেই। নাদিয়া আহমেদ টুম্পার বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ আগে কখনো লিখিতভাবে করা হয়েছিল কি না ? হয়ে থাকলে তার ভিত্তিতে কোনো তদন্ত হয়েছে কি না—তার উত্তর দেওয়া জরুরি।

আরও জানতে হবে— তাঁর বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় অভিযোগ রয়েছে কি না ? কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল কি না ?
কোনো অডিট আপত্তি বা প্রশাসনিক পর্যবেক্ষণ আছে কি না ? অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁকে কখনো দায়িত্ব থেকে সরানো বা বদলি করা হয়েছিল কি না ? তাঁর অধীনে নিষ্পত্তি হওয়া ফাইলের কোনো নমুনা অডিট করা হয়েছে কি না।

মাসে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ : অভিযোগের সবচেয়ে বড় ও চাঞ্চল্যকর দাবি—এই কথিত চক্রের মাধ্যমে মাসে কোটি টাকার বেশি অর্থের লেনদেন হয়। ডেভেলপারদের কাছ থেকে মাসে ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা নেওয়ার দাবি সত্য হয়, তাহলে প্রথমে শনাক্ত করতে হবে—কতটি প্রতিষ্ঠান নিয়মিত অর্থ দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এরপর প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ফাইলের সংখ্যা, নিষ্পত্তির সময়, কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং অর্থ প্রদানের ধরন যাচাই করতে হবে। একইভাবে জমি তদন্ত বা কমিশনের নামে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা এবং হাজিরার নামে ৫ থেকে ২০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ থাকলে খুঁজে দেখতে হবে—কোনো রসিদ, ব্যাংক লেনদেন, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের তথ্য, মধ্যস্থতাকারীর যোগাযোগ কিংবা প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য রয়েছে কি না। শুধু ‘কোটি টাকা লেনদেন হয়’—এমন সূত্রের বক্তব্য দিয়ে অর্থের পরিমাণ নিশ্চিত করা যায় না। অর্থের প্রবাহ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন লেনদেনের প্রমাণ, একাধিক স্বাধীন সূত্র এবং সংশ্লিষ্ট নথির সঙ্গে তথ্যের মিল।

নীরব থাকবে রাজউক ? নাকি তদন্ত করবে ? নাদিয়া আহমেদ টুম্পার বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে বলে আমাদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদক জানিয়েছে। ফোনে যোগাযোগ সম্ভব না হওয়ায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

রাজউক কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যও এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পাওয়া যায় নি। ফলে এখন দায়িত্ব রাজউক কর্তৃপক্ষের। অভিযোগ সত্য হলে ব্যবস্থা নিতে হবে, কিন্তু গুরুতর অভিযোগের পরও যদি কোনো অনুসন্ধান না হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—কেন তদন্ত হচ্ছে না ?

পাঁচ প্রশ্নের উত্তর চাই  : নাদিয়া আহমেদ টুম্পার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বাস্তবতা যাচাইয়ে অন্তত পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন— কোন কোন ফাইল অর্থের বিনিময়ে আটকে রাখা বা ছাড়ার অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত ? অভিযোগকারী ভুক্তভোগীরা তাঁদের ফাইল নম্বর ও অর্থ লেনদেনের প্রমাণ দিতে পারবেন কি ?
রাজউকের অভ্যন্তরীণ তদন্ত বা অডিটে কোনো অনিয়ম ধরা পড়েছে কি ? অভিযোগের বিষয়ে রাজউক কর্তৃপক্ষ আগে কী ব্যবস্থা নিয়েছে ? মাসে কোটি টাকা লেনদেনের দাবির পক্ষে আর্থিক বা নথিগত প্রমাণ কোথায় ?

মন্ত্রণালয় ও রাজউক চেয়ারম্যানের দৃষ্টি আকর্ষণ : একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ, ফাইল আটকে রাখা, গ্রাহক হয়রানি এবং ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের মতো অভিযোগ উঠলে বিষয়টি কোনোভাবেই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।

তাই গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিব এবং রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের কাছে প্রশ্ন—অভিযোগগুলো কি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হবে ? প্রয়োজনে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ফাইলের নমুনা, নোটশিট, চিঠিপত্র, নিষ্পত্তির সময়কাল এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন যাচাই করে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক ও আর্থিক অনুসন্ধান করা যেতে পারে।

বর্তমানে সরকারি নথিতে নাদিয়া আহমেদ টুম্পার পদ ও কর্মস্থলের তথ্য নিশ্চিত করা গেলেও তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত ঘুষ ও কথিত ‘সিন্ডিকেট’ পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে। তবে অভিযোগের ধরন, পূর্বে প্রকাশিত একই ধরনের অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যের কারণে বিষয়টি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও নথিভিত্তিক তদন্তের দাবি রাখে। অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্য এবং রাজউক কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক জবাব পাওয়া গেলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।

👁️ 46 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *