
নিজস্ব প্রতিবেদক : গৃহায়ন ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম (ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল) বিভাগে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে চলতি দায়িত্ব ও পদোন্নতি ঘিরে এবার উঠেছে দেড় কোটি টাকার কথিত উৎকোচ বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ।অভিযোগের তীর গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) মুহাম্মদ সারওয়ার জাহান বিপ্লবের দিকে।

সংশ্লিষ্ট দুটি পৃথক সূত্রের দাবি, পদোন্নতির সুপারিশ ও প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার জন্য নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলমের কাছ থেকে কথিত ভাবে ৭৫ লাখ টাকা অগ্রিম নেওয়া হয়েছে। কিন্তু পদোন্নতি-সংক্রান্ত বিষয়টি বিভিন্ন প্রতিবেদন, প্রশাসনিক জটিলতা ও মামলার কারণে বিলম্বিত হওয়ায় ওই টাকা ফেরত চাইলে তা ফেরত দিতে গড়িমসি করা হচ্ছে বলেও সূত্রগুলোর দাবি।
তবে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে এ কারণে যে, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম) পদে পদোন্নতি/চলতি দায়িত্বের আইনগত বৈধতা নিয়ে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল-১ ইতোমধ্যে কারণ দর্শানোর আদেশ দিয়েছেন। ৩১ আগস্ট ২০২৬-এর আদেশে ট্রাইব্যুনাল গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর ৩ মার্চ ২০২৬-এর সেই স্মারককে চ্যালেঞ্জ করা মামলাটি প্রাথমিকভাবে গ্রহণ করে সংশ্লিষ্টদের কারণ দর্শাতে বলেছেন। প্রশ্ন উঠেছে—যে পদোন্নতি ও চলতি দায়িত্বের বৈধতা নিয়েই আদালতে মামলা বিচারাধীন, সেই প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে যদি অর্থ লেনদেনের অভিযোগ সত্য হয়ে থাকে, তাহলে কারা এই প্রক্রিয়ার পেছনে রয়েছেন এবং সরকারি দপ্তরের নথিপত্র কীভাবে এগোচ্ছে ?

১৪ বছরের জটিলতা, এবার ঘুষের অভিযোগ : গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম বিভাগে ক্যাডার ও নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের জটিলতা চলছে প্রায় ১৪ বছর ধরে। ২০১১ সালে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে সরাসরি উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (ই/এম) পদে নিয়োগ পাওয়া ১১ কর্মকর্তাকে ঘিরে এই বিরোধের সূত্রপাত। ২০১২ সালে তারা যোগদান করেন। পরবর্তী সময়ে বিসিএস (গণপূর্ত) ক্যাডারের বিভিন্ন ব্যাচের কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে তাদের নিয়োগের বৈধতা ও ক্যাডার মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।

বিতর্কের মূল জায়গা হলো—২০১১ সালের নিয়োগটি কোন কাঠামোর অধীনে হয়েছিল এবং ওই কর্মকর্তারা পরবর্তী সময়ে বিসিএস (গণপূর্ত) ক্যাডারের উচ্চতর পদে পদোন্নতির জন্য কোন বিধি অনুসরণ করবেন।

বিজ্ঞাপন
২৭তম, ২৮তম ও ৩০তম বিসিএসের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, সরাসরি উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারা নন-ক্যাডার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন এবং তাদের অনেকেই সিনিয়র স্কেল পরীক্ষাসহ প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ না করেই ক্যাডারের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দাবি, পিএসসির মাধ্যমে তাদের নিয়োগ হয়েছে এবং পিএসসি, মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের বিভিন্ন চিঠিতে তাদের নিয়োগকে ক্যাডার পদে নিয়োগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে তারা নিজেদের ক্যাডার কর্মকর্তা হিসেবে দাবি করছেন।
ট্রাইব্যুনালের আদেশে সরাসরি প্রশ্ন তোলা হয়েছে ৩ মার্চের স্মারক নিয়ে এই বিরোধের সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল-১-এর এ.টি. মামলা নং ২৭৯/২০২৬। মামলার বাদী মো. আবদুল হালিমসহ ১০ জন এবং বিবাদী গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্টরা।
৩১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে সদস্য মো. আমিরুল ইসলাম মামলাটি প্রাথমিকভাবে গ্রহণ করে সংশ্লিষ্টদের ওপর নোটিশ জারি করেন। আদেশে বলা হয়, বাদীরা গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর ৩ মার্চ ২০২৬-এর স্মারক নং ২৫.০৩৬.০০০০.২১৫.১২.১০৭.১৮-৩৫২-এর বৈধতা ও যৌক্তিকতা চ্যালেঞ্জ করেছেন। ওই স্মারকে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে মত দেওয়া হয়েছিল যে, সরাসরি গ্রেড-৬ উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (পদোন্নতির জন্য পরীক্ষা) বিধিমালা, ২০১৭ প্রযোজ্য নয় এবং তাদের গ্রেড-৪ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম) পদে পদোন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়েছিল।
ট্রাইব্যুনাল এই সিদ্ধান্তের পরিণতিতে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি বা চলতি দায়িত্ব দেওয়ার পদক্ষেপগুলো কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা ২০ দিনের মধ্যে জানাতে সংশ্লিষ্টদের কারণ দর্শাতে বলেছেন। মামলার পরবর্তী সার্ভিস রিটার্নের তারিখ নির্ধারিত হয়েছে ১৭ নভেম্বর ২০২৬। অর্থাৎ, বিষয়টি এখন নিছক প্রশাসনিক মতপার্থক্য নয়; এর আইনগত বৈধতা নিয়ে বিচারিক কার্যক্রমও চলমান।
সেই অবস্থাতেই তিন প্রকৌশলীকে চলতি দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব : এর মধ্যেই গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংস্থাপন শাখা-১ থেকে ২৬ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে সচিব, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কাছে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম) পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব পাঠানো হয়।
স্মারক নং ২৫.৩৬.০০০০.২১৫.১২.১০৭.১৮-১৩৫৭-এ বলা হয়, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম)-এর মঞ্জুরিকৃত পদ রিজার্ভসহ ১১টি। বর্তমানে সাতজন নিয়মিত কর্মকর্তা কর্মরত এবং বিভিন্ন কারণে চারটি পদ শূন্য হয়েছে। এর মধ্যে একটি পদে পদোন্নতির প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানোয় মাঠ পর্যায়ে আরও তিনটি পদ শূন্য রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। সরকারি কাজের স্বার্থে ওই তিনটি পদ জরুরি ভিত্তিতে পূরণের কথা বলে তিনজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে চলতি দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়।
প্রস্তাবিত তিন কর্মকর্তা হলেন— মো. জিয়াউর রহমান—নির্বাহী প্রকৌশলী (ই/এম), গণপূর্ত ই/এম ডিজাইন বিভাগ-১, ঢাকা; প্রস্তাবিত পদায়ন ঢাকা গণপূর্ত ই/এম সার্কেল-২। মো. জাহাঙ্গীর আলম—নির্বাহী প্রকৌশলী (ই/এম), রিজার্ভ, সংযুক্ত গণপূর্ত ই/এম কাঠের কারখানা বিভাগ; প্রস্তাবিত পদায়ন চট্টগ্রাম গণপূর্ত ই/এম সার্কেল।
তাসফিন মুহাইমীন হক—নির্বাহী প্রকৌশলী (ই/এম), গণপূর্ত ই/এম প্ল্যানিং বিভাগ-৩; প্রস্তাবিত পদায়ন রাজশাহী গণপূর্ত ই/এম সার্কেল। চিঠিতে স্বাক্ষর করেন তৎকালীন/সংশ্লিষ্ট তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) মুহাম্মদ সারওয়ার জাহান।

অভিযোগ,‘পদোন্নতি প্যাকেজে’ দেড় কোটি টাকা ! এখন অভিযোগ উঠেছে, এই পদোন্নতি ও চলতি দায়িত্বের প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে দেড় কোটি টাকার একটি ‘পদোন্নতি প্যাকেজ’ তৈরি হয়েছিল। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের দুটি পৃথক সূত্রের দাবি, এই কথিত লেনদেনের অংশ হিসেবে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলমের কাছ থেকে ৭৫ লাখ টাকা অগ্রিম নেওয়া হয়েছিল।
সূত্রগুলোর দাবি, পদোন্নতির বিষয়টি দ্রুত এগিয়ে না যাওয়ায় এবং একের পর এক প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি বিলম্বিত হওয়ায় জাহাঙ্গীর আলম ওই টাকা ফেরত চান। কিন্তু সারওয়ার জাহান বিপ্লব টাকা ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে গড়িমসি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—যদি অভিযোগটি সত্য না হয়, তাহলে ৭৫ লাখ টাকা অগ্রিম দেওয়ার অভিযোগের ভিত্তি কী ? আর যদি অর্থ লেনদেন হয়ে থাকে, তাহলে সেটি কীসের বিনিময়ে এবং কার মাধ্যমে ?
অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সারওয়ার জাহান বিপ্লবের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তার নীরবতা অভিযোগগুলোর সত্যতা প্রমাণ করে না; তবে এত বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ওঠার পরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো স্বচ্ছ ব্যাখ্যা না আসায় প্রশ্ন আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
বিধির ব্যাখ্যা নিয়ে দুই পক্ষ মুখোমুখি : ২৭তম, ২৮তম ও ৩০তম বিসিএসের কর্মকর্তাদের দাবি, একই ক্যাডারের উচ্চতর পদে যেতে হলে সংশ্লিষ্ট বিধিমালার যোগ্যতা সবার ক্ষেত্রেই সমভাবে প্রযোজ্য হতে হবে।
তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সরাসরি উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারা সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (পদোন্নতির জন্য পরীক্ষা) বিধিমালা, ২০১৭-এর বিধি ৮(২) অনুযায়ী গ্রেড-৫-এর ঊর্ধ্বতন পদে যাওয়ার প্রশ্নে আইনগত বাধা রয়েছে।
তাদের আরও দাবি, একই পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে একদল কর্মকর্তার জন্য একটি যোগ্যতার মানদণ্ড এবং অন্য দলের জন্য ভিন্ন মানদণ্ড নির্ধারণের সুযোগ নেই।
অন্যদিকে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দাবি, তাদের নিয়োগ পিএসসির মাধ্যমে হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো তাদের ক্যাডার কর্মকর্তা হিসেবে বিবেচনা করেছে। ফলে তাদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে নন-ক্যাডার কর্মকর্তার বিধি প্রয়োগের প্রশ্নই ওঠে না।
এই দুই অবস্থানের চূড়ান্ত আইনগত নিষ্পত্তি এখন আদালতের বিষয়।
জাহাঙ্গীর আলমকে ঘিরেও আলাদা তদন্ত : নথিপত্রে দেখা যায়, নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে পৃথক অভিযোগের তদন্তও চলমান। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পরিত্যক্ত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা অধিশাখার ২০২৬ সালের একটি চিঠিতে বলা হয়, স্বাধীন বাংলা পত্রিকায় প্রকাশিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে তদন্তের জন্য গঠিত কমিটির সভা ৯ জুলাই ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।
তদন্ত কমিটিতে ছিলেন রাজউকের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদিউল আলম এবং গণপূর্ত ই/এম ডিজাইন বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী অজান্তা শুক্লা তন্মা। অর্থাৎ, একজন কর্মকর্তাকে ঘিরে যখন পৃথক তদন্ত কার্যক্রমের নথি রয়েছে, তখন তাকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে চলতি দায়িত্ব বা পদোন্নতির বিবেচনায় নেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও বেশি স্বচ্ছতা ও সতর্কতা দেখানো প্রয়োজন—এমন প্রশ্নই উঠছে।
পিডব্লিউডির নথিতেই সরোয়ার জাহানের ভূমিকা : এই পুরো প্রক্রিয়ায় সরোয়ার জাহান বিপ্লবের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের কারণ শুধু অভিযোগ নয়; তিন নির্বাহী প্রকৌশলীকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাবের নথিতে তার স্বাক্ষর রয়েছে। অর্থাৎ, যাকে ঘিরে এখন পদোন্নতি প্যাকেজের কথিত অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে, সেই কর্মকর্তাই সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবটি মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন—নথি অন্তত সেটিই দেখাচ্ছে।
প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের শোকজের পরও প্রশ্ন : আরও গুরুতর বিষয় হলো, ৩১ আগস্ট ২০২৬-এর ট্রাইব্যুনালের আদেশে সংশ্লিষ্ট পদোন্নতি/চলতি দায়িত্বের আইনগত বৈধতা নিয়ে সরাসরি কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৮০ অনুযায়ী সরকারি চাকরির শর্ত ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার রয়েছে।
তাই এখন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের সামনে দুটি আলাদা প্রশ্ন— এক. যে নিয়োগ ও পদোন্নতি কাঠামো নিয়ে ১৪ বছর ধরে বিরোধ চলছে, তার আইনগত অবস্থান কী ? দুই. বিষয়টি বিচারাধীন থাকা অবস্থায় সংশ্লিষ্ট পদে চলতি দায়িত্ব বা পদোন্নতির প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সতর্কতা কতটা মানা হয়েছে ?
এর সঙ্গে যদি দেড় কোটি টাকার কথিত উৎকোচ এবং ৭৫ লাখ টাকা অগ্রিম দেওয়ার অভিযোগ সত্যতার ভিত্তি পায়, তাহলে বিষয়টি আর কেবল পদোন্নতি-সংক্রান্ত প্রশাসনিক বিরোধ থাকবে না; তা দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগে পরিণত হতে পারে।
জাহাঙ্গীরের বক্তব্য – ‘পিএসসি নিয়োগ দিয়েছে’ :
২০১১ সালে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদে নিয়োগ পাওয়া এবং বর্তমানে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত মো. জিয়াউর রহমান, মো. জাহাঙ্গীর আলম ও সমীরণ মিস্ত্রী গণমাধ্যমকে বলেছেন, তাদের পিএসসি নিয়োগ দিয়েছে এবং তারা বিসিএস ক্যাডার প্রকৌশলী হিসেবেই নিয়োগ পেয়েছেন।
অন্যদিকে বিসিএস (গণপূর্ত) ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়া নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোর্শেদ ইকবাল বলেছেন, সরাসরি উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারা নন-ক্যাডার এবং সিনিয়র স্কেল পরীক্ষা ছাড়া তারা পদোন্নতির চেষ্টা করছেন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও গণমাধ্যমকে বলেছেন, বিষয়টি জটিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিসিএস (গণপূর্ত) নামে স্বতন্ত্র ক্যাডার থাকা অবস্থায় নিয়মিত বিসিএস প্রক্রিয়ার বাইরে শুধু মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে এক ধাপ ওপরে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদে নিয়োগ দেওয়ার যৌক্তিকতা এবং পরবর্তী পদোন্নতির যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
প্রধান প্রকৌশলীর নীরবতা, সংস্থাপন শাখার ‘কোনো মন্তব্য নেই’ : অভিযোগের বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) মুহাম্মদ সারওয়ার জাহান বিপ্লব এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। ফলে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—দেড় কোটি টাকার কথিত পদোন্নতি বাণিজ্যের অভিযোগ কি কেবল অভ্যন্তরীণ গুঞ্জন, নাকি এর পেছনে বাস্তব কোনো অর্থ লেনদেনের তথ্য রয়েছে ?
মন্ত্রী–প্রতিমন্ত্রী–সচিবের দৃষ্টি আকর্ষণ : গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের প্রতি সংশ্লিষ্টদের দাবি—বিষয়টি আর ফাইল চালাচালির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনা হোক।
বিশেষ করে— ৭৫ লাখ টাকা অগ্রিম নেওয়ার অভিযোগের সত্যতা যাচাই, দেড় কোটি টাকার পদোন্নতি প্যাকেজের অভিযোগের উৎস অনুসন্ধান, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যাংক হিসাব ও বৈধ আয়-ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যতা পরীক্ষা, ৩ মার্চ ২০২৬-এর স্মারকের আইনগত ভিত্তি যাচাই, ২৬ অক্টোবর ২০২৫-এর চলতি দায়িত্ব প্রদানের প্রস্তাবের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া পরীক্ষা, ২৭তম, ২৮তম ও ৩০তম বিসিএস কর্মকর্তাদের যোগ্যতা এবং সরাসরি উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্তদের আইনগত মর্যাদা নিরপেক্ষভাবে নির্ধারণ, মো. জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে চলমান তদন্তের অগ্রগতি পর্যালোচনা, এবং প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের বিচারাধীন বিষয় নিষ্পত্তির আগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পদোন্নতি বা চলতি দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে আইনগত সীমা স্পষ্ট করা— এসব বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। কারণ, একদিকে পদ শূন্য রেখে সরকারি কাজ ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে পদোন্নতির বৈধতা নিয়ে আদালতে মামলা এবং তার মধ্যেই কোটি টাকার কথিত অর্থ লেনদেনের অভিযোগ—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে চলতে পারে না।
১৪ বছর ধরে চলা ক্যাডার-নন-ক্যাডার বিরোধের নিষ্পত্তি না করে যদি পদোন্নতির ফাইলকে কেন্দ্র করে নতুন করে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তৈরি হয়, তাহলে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষেরও।
এখন দেখার বিষয়—গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় অভিযোগটি তদন্ত করে প্রকৃত সত্য বের করবে, নাকি বছরের পর বছর ধরে চলা ফাইল, মামলা ও প্রশাসনিক জটিলতার আড়ালেই থেকে যাবে কথিত ‘পদোন্নতি প্যাকেজ’-এর রহস্য।
আইনগত সতর্কতা: প্রতিবেদনে “দেড় কোটি টাকা”, “৭৫ লাখ টাকা অগ্রিম” এবং টাকা ফেরত না দেওয়ার বিষয়গুলোকে আমি সূত্রের অভিযোগ হিসেবে রেখেছি। এগুলোকে প্রমাণিত দুর্নীতি হিসেবে লেখা হয়নি। একইভাবে “অবৈধ পদোন্নতি”র বদলে যেখানে প্রয়োজন “অভিযোগকৃত/বিতর্কিত পদোন্নতি” বলা নিরাপদ, কারণ ট্রাইব্যুনালের মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনো হয়নি। প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল আইন অনুযায়ী ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার মূলত সরকারি চাকরির শর্ত ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে।
