রাজউকে ফাইল জিম্মি করে ঘুষের অভিযোগ : ৪২১ নম্বর কক্ষে ‘ঘুষের হাট’, স্বামীর প্রতিষ্ঠানে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ—দুই কর্মচারীর সম্পদের বহর নিয়েও প্রশ্ন ?

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী

নিজস্ব প্রতিবেদক  :  রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের পরিকল্পিত নগরায়ণের দায়িত্বে থাকা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ—রাজউকের প্রশাসনিক কার্যক্রম ঘিরে গুরুতর অনিয়ম, দুর্নীতি, ঘুষ লেনদেন ও প্রভাব বিস্তারের একের পর এক অভিযোগ সামনে ।


বিজ্ঞাপন

অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন রাজউকের জোন-৫ ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর প্রকল্প দপ্তরের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর (অতিরিক্ত দায়িত্বে উচ্চমান সহকারী) ফাতেমা বেগম মলি এবং এস্টেট ও ভূমি-২ শাখার অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর জাহিদুল ইসলাম সবুজ।

অভিযোগকারীদের দাবি, তৃতীয় শ্রেণির এই দুই কর্মচারী দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক দায়িত্বে থাকার সুযোগে রাজউকের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও প্রকল্পসংক্রান্ত কাজে প্রভাব বিস্তার করেছেন। ফাইল আটকে রেখে অর্থ আদায়, সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় প্রভাব, নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়া, ঠিকাদারি বিল ছাড়ে কমিশন, গুরুত্বপূর্ণ নথির গতিপথ নিয়ন্ত্রণ এবং সম্পদ অর্জনের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে—একজন অফিস সহকারী কীভাবে রাজউকের গুরুত্বপূর্ণ ফাইল, প্রকল্প ও ঠিকাদারি কার্যক্রমে এমন প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করলেন? আর এস্টেট ও ভূমি শাখার একজন কর্মচারীর টেবিল ঘিরে কীভাবে প্লট, ক্ষতিপূরণ, নামজারি ও মালিকানা পরিবর্তনের মতো স্পর্শকাতর কাজের ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠল?


বিজ্ঞাপন

ফাইল যেন মলির টেবিলেই বন্দি ! অভিযোগের সবচেয়ে আলোচিত অংশ ফাইল আটকে রেখে উৎকোচ আদায়ের কৌশল।
অভিযোগকারীদের দাবি, উন্নয়ন প্রকল্পের প্রাক্কলন বা এস্টিমেট, ঠিকাদারদের চুক্তি সম্পাদন, বোর্ড সভার কার্যপত্র, ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদন এবং ঠিকাদারদের রানিং ও ফাইনাল বিল—এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ নথির কোনো না কোনো পর্যায়ে ফাতেমা বেগম মলির ডেস্কে ফাইল আটকে থাকার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, কাঙ্ক্ষিত অর্থের অঙ্ক মিলে গেলে ফাইলের গতি বাড়ে। আর অর্থের সমঝোতা না হলে ফাইলে একের পর এক আপত্তি বা অসঙ্গতি তুলে সেটি আটকে রাখা হয়। দিনের পর দিন, এমনকি মাসের পর মাস ফাইল পড়ে থাকার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষায়, রাজউকের কিছু ফাইলে যেন অদৃশ্য তালা ঝুলে থাকে—আর সেই তালার চাবি থাকে নির্দিষ্ট টেবিলে।অভিযোগগুলো সত্য হলে তা শুধু ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ নয়; বরং রাজউকের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নাগরিক সেবা ব্যবস্থার ওপর সরাসরি প্রশ্ন তৈরি করে।


বিজ্ঞাপন

স্বামীর প্রতিষ্ঠানে সরকারি কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ : ফাতেমা বেগম মলিকে ঘিরে অভিযোগের আরও স্পর্শকাতর অংশ তাঁর স্বামী আবুল ফজল রাজু-এর মালিকানাধীন ‘রাজু ইন্টারন্যাশনাল’ ও ‘রাজু প্রপার্টিজ অ্যান্ড ডেভেলপারস’ নামের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রাজউকের কাজের সম্পর্ক। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিকভাবে পারিবারিক প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে দাপ্তরিক অবস্থান ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।

এমনকি কোনো কোনো প্রকল্পে দরপত্র আহ্বানের আগেই অভ্যন্তরীণ তথ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। দরপত্রের শর্ত এমনভাবে প্রভাবিত করার অভিযোগ উঠেছে, যাতে কাঙ্ক্ষিত প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতায় বাড়তি সুবিধা পায়। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের দরপত্র নথি, প্রাক্কলন, টেন্ডার শিডিউল, মূল্যায়ন কমিটির প্রতিবেদন, কার্যাদেশ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রাজউকের চুক্তিপত্র পরীক্ষা করা জরুরি।

৪২১ নম্বর কক্ষে ‘ঘুষের হাট’—অভিযোগ সবুজকে ঘিরে :
অন্যদিকে রাজউকের এস্টেট ও ভূমি-২ শাখার অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর জাহিদুল ইসলাম সবুজকে ঘিরেও উঠেছে গুরুতর অভিযোগ।

অভিযোগকারীদের দাবি, রাজউক ভবনের ৪২১ নম্বর কক্ষকে কেন্দ্র করে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ক্ষতিপূরণের ফাইল, প্লট বরাদ্দপত্র, নামজারি ও মালিকানা পরিবর্তনের মতো স্পর্শকাতর নথির ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ছিল।

একই প্লট একাধিক ব্যক্তির নামে বরাদ্দ দেওয়া, মূল নথি থেকে মালিকের ছবি পরিবর্তন এবং গুরুত্বপূর্ণ নথি গায়েব করে দেওয়ার মতো অভিযোগও রয়েছে।

এসব অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে বিষয়টি কেবল ঘুষ লেনদেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; রাজউকের ভূমি ব্যবস্থাপনা, নথি সংরক্ষণ এবং সম্পত্তির মালিকানা নির্ধারণের স্বচ্ছতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠবে।

রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ : অভিযোগে ফাতেমা বেগম মলিকে রাজউকের সাবেক এক সদস্যের সাবেক পিএ এবং শ্রমিক কর্মচারী লীগের স্বঘোষিত মহিলা বিষয়ক নেত্রী হিসেবে পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ করা হয়েছে।

অন্যদিকে তাঁর স্বামী আবুল ফজল রাজুকে আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক পল্লী উন্নয়ন সম্পাদক হিসেবে উল্লেখ করে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, দাপ্তরিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি রাজউকের ঠিকাদারি অঙ্গনে প্রভাব বিস্তার করতেন।

জাহিদুল ইসলাম সবুজ ১৯৯৮ সালে রাজউকে যোগ দেন এবং শ্রমিক কর্মচারী লীগের কার্যকরী সভাপতি ছিলেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। ৪২১ নম্বর কক্ষকে কেন্দ্র করে এস্টেটসংক্রান্ত কাজে তাঁর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব রাজনৈতিক পরিচয় ও সাংগঠনিক পদসংক্রান্ত দাবির স্বতন্ত্র যাচাই প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে দুদক—অভিযোগের পাহাড়, নিষ্পত্তি কোথায় ?   ঠিকাদার মেহেদী হাসান নিজেকে ভুক্তভোগী দাবি করে ফাতেমা বেগম মলিকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ ও তথ্য-প্রমাণ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দাখিল করেছেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২০ সালের ১১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দেওয়া লিখিত অভিযোগে মলির ঝিগাতলার ফ্ল্যাট, পূর্বাচলের প্লট এবং কথিত ঘুষ বাণিজ্যের বিষয় তুলে ধরা হয়।

পরে ২০২২ সালের ২৮ অক্টোবর এবং ২০২৩ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি জাহিদুল ইসলাম সবুজের বিরুদ্ধে দাপ্তরিক নিপীড়ন, ৪২১ নম্বর কক্ষের কথিত অর্থ লেনদেন এবং রিসোর্টে বিনিয়োগের বিষয়ে দুদকে তথ্য-প্রমাণ দাখিলের দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব অভিযোগের কার্যকর নিষ্পত্তি হয়নি কিংবা দীর্ঘসূত্রতায় বিষয়গুলো আটকে রয়েছে।

সীমিত সরকারি বেতন, ৫০ কোটি টাকার বেশি সম্পদের অভিযোগ ! ফাতেমা বেগম মলি ও জাহিদুল ইসলাম সবুজের কথিত সম্পদের বহর নিয়েও বড় প্রশ্ন উঠেছে অভিযোগকারীদের হিসাবে ফাতেমা বেগম মলির নামে বা পরিবারের সংশ্লিষ্টতায় ধানমন্ডি ও ঝিগাতলার ১৫/এ সড়কের এমসিটি ডার্লিং পয়েন্টের লেভেল ই-৫-এ তিনটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের ১৭, ২২ ও ২৭ নম্বর সেক্টরে ৫ কাঠা আয়তনের তিনটি প্লট, নারায়ণগঞ্জ সদর, রূপগঞ্জ ও চাঁদপুরের গ্রামে জমিজমা এবং ঢাকা মেট্রো-চ-১৫-৪৬১৮ নম্বরের একটি নোয়া মাইক্রোবাস রয়েছে। অভিযোগকারীদের হিসাবে এসব সম্পদের মূল্য ৫০ কোটি টাকার বেশি।

অন্যদিকে জাহিদুল ইসলাম সবুজের বিরুদ্ধে রাজধানীর সবুজবাগে প্রায় ২ হাজার বর্গফুটের অ্যাপার্টমেন্ট, দক্ষিণ মাদারটেক কবরস্থান সংলগ্ন এলাকায় ১০ কাঠা জমির ওপর নির্মাণাধীন ১০ তলা ভবনে যৌথ অংশীদারিত্ব, গাজীপুরের ভবানীপুরে ‘রাজেন্দ্র ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ভিলেজ’-এ বিনিয়োগ, সিরাজগঞ্জের কাজীপুর ও বগুড়ার শেরপুরে একাধিক পাকা বাড়ি এবং ঢাকা মেট্রো-৫১৮৯৩৭ নম্বরের নোয়া মাইক্রোবাস থাকার অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব সম্পদের মালিকানা, ক্রয়মূল্য, অর্থের উৎস ও আয়কর নথি যাচাই না করে সম্পদের পরিমাণ বা বৈধতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে সম্পদ বিবরণী, দলিল, ব্যাংক হিসাব, আয়কর নথি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিকানা কাঠামো পরীক্ষা করা জরুরি।

দুদকের অনুসন্ধানও কি ফাইলবন্দি ?  অভিযোগকারীদের দাবি, দুর্নীতি দমন কমিশনের উপপরিচালক প্রবীর কুমার দাস ফাতেমা বেগম মলির কথিত অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধানের দায়িত্বে থাকলেও সেই অনুসন্ধান দীর্ঘদিন অগ্রসর হয়নি। এখানেই প্রশ্ন—অভিযোগের সঙ্গে থাকা নথি ও সম্পদের তথ্য যদি যাচাইযোগ্য হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট সংস্থার অনুসন্ধানের অগ্রগতি কোথায় ? দুদকের অনুসন্ধান নথি, সম্পদ বিবরণী, দলিলপত্র, ব্যাংক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আয়-ব্যয়ের তথ্য পর্যালোচনা করলেই অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র অনেকটাই স্পষ্ট হতে পারে।

২০২৪ সালের পরও চাকরিতে বহাল—নতুন প্রশ্ন : অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমন-পীড়ন ও অর্থায়নের অভিযোগে ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি শাহআলী থানায় দায়ের করা হত্যা মামলায় (সিআর নং ৯৯/২০২৫) ফাতেমা বেগম মলি ১৫৬ নম্বর এবং তাঁর স্বামী আবুল ফজল রাজু ১৬০ নম্বর এজাহারনামীয় আসামি হিসেবে উল্লেখ রয়েছেন।

অভিযোগকারীদের প্রশ্ন—এমন মামলা থাকার পরও ফাতেমা বেগম মলির বিরুদ্ধে রাজউকের পক্ষ থেকে সাময়িক বরখাস্তসহ কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না। তবে মামলায় তাঁদের নাম, মামলার বর্তমান আইনি অবস্থান এবং রাজউকের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত—সবই সংশ্লিষ্ট নথি ও আদালতের রেকর্ড দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।

ফাইল ছাড়াতে কমিশন, কাজের মান নিয়েও প্রশ্ন : ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ ঘিরেও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকল্পের বাস্তব কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা পর্যাপ্তভাবে যাচাই না করেই ঠিকাদারদের রানিং বিল ছাড়ের ক্ষেত্রে কমিশন নেওয়া হতো। এর ফলে মানহীন কাজও কাগজে-কলমে সন্তোষজনক দেখানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ সত্য হলে এর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ের প্রশ্নও জড়িত। বিশেষ করে ফাতেমা বেগম মলির স্বামীর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারি কাজের সম্পর্ক থাকলে সেটি স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি করেছে কি না, তা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

প্রশ্ন এখন—এই প্রভাববলয়ের পেছনে কারা ?  ফাইল আটকে রাখা, ঠিকাদারি কাজে প্রভাব, সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়া, এস্টেট ও ভূমি নথি, কথিত অর্থ লেনদেন এবং সম্পদ অর্জনের অভিযোগ—সবগুলো অভিযোগ পাশাপাশি রাখলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, তৃতীয় শ্রেণির দুই কর্মচারী কীভাবে রাজউকের এত গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক কার্যক্রমে দীর্ঘদিন প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পেলেন ? তাঁদের পেছনে কোনো কর্মকর্তা, প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা দাপ্তরিক বলয় কাজ করেছে কি না—এটিও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন বলে অভিযোগকারীরা মনে করছেন।

মলির বক্তব্য পাওয়া যায়নি, সবুজের দাবি—‘অভিযোগ মিথ্যা’ : অভিযোগের বিষয়ে ফাতেমা বেগম মলির ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে প্রতিবারই অচেনা এক কণ্ঠ থেকে ফোনটি ‘রং নম্বর’ বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। হোয়াটসঅ্যাপে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাঠানো হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে জাহিদুল ইসলাম সবুজ অভিযোগগুলো সরাসরি অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমি রাজউকে সততার সঙ্গে চাকরি করি। দাপ্তরিক কোনো কাজের বিনিময়ে আমি কারও কাছ থেকে কোনোদিন এক পয়সাও ঘুষ নিইনি।

একটি স্বার্থান্বেষী মহল আমার সম্মানহানি করতে এবং আমাকে চাকরি থেকে সরানোর চক্রান্ত হিসেবে এসব ভিত্তিহীন অভিযোগ বিভিন্ন সংস্থায় ছড়াচ্ছে।’ রাজউকের দায়িত্বশীল মহলের দাবি, তাঁরা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত। কোনো কর্মচারী বা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম কিংবা দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে কর্তৃপক্ষ তা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখে।

তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কোনো একক ব্যক্তির অনৈতিক কর্মকাণ্ডের দায় পুরো প্রতিষ্ঠান নেবে না। উত্থাপিত অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হচ্ছে এবং প্রমাণের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের বিরুদ্ধে চাকরিবিধি ও দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং রাজউক চেয়ারম্যানের দৃষ্টি আকর্ষণ : রাজউকের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে একজন অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর কিংবা কোনো তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীর ডেস্কে যদি প্রকল্প, ঠিকাদারি বিল, ভূমি-সংক্রান্ত নথি বা গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ফাইল দীর্ঘদিন আটকে থাকার অভিযোগ ওঠে, তাহলে বিষয়টি কোনোভাবেই হালকা করে দেখার সুযোগ নেই।

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিব এবং রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের প্রতি জোরালোভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে— ফাতেমা বেগম মলি ও জাহিদুল ইসলাম সবুজকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত যাচাই করা প্রয়োজন।

বিশেষ করে তাঁদের দায়িত্বে থাকা ফাইলের গতিপথ, দরপত্রের প্রতিটি ধাপ, ঠিকাদারি বিল, প্লট বরাদ্দ, নামজারি ও মালিকানা পরিবর্তনের নথি, সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক হিসাব, আয়কর নথি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানা কাঠামো পরীক্ষা করা জরুরি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ও বিভাগীয় ব্যবস্থা এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের নিষ্পত্তি—দুই ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।

রাজউকের ফাইল কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয় ! রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ফাইল জিম্মি করে যদি ঘুষ আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়ে থাকে, তবে সেটি কেবল একজন কর্মচারীর অনিয়ম নয়—এটি নাগরিক সেবা, সরকারি অর্থ এবং নগর ব্যবস্থাপনার ওপর আঘাত।

আর যদি ৪২১ নম্বর কক্ষকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের পেছনে সত্যতা থাকে, তাহলে সেখানে শুধু একজন কর্মচারীর ভূমিকা নয়—কে বা কারা এই প্রভাববলয়কে দীর্ঘদিন টিকিয়ে রেখেছে, সেটিও বের করা জরুরি। রাজউকের ম্যানুয়াল ফাইল ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল ট্র্যাকিং, প্রতিটি ফাইলের গতিপথ দৃশ্যমান করা এবং স্বার্থের সংঘাত প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি।

কারণ একটি নগরীর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা যদি কয়েকটি ডেস্কের ফাইল-নির্ভরতার কাছে আটকে যায়, তাহলে প্রশ্ন শুধু দুর্নীতির নয়—প্রশ্ন ওঠে রাজউকের প্রশাসনিক জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং নাগরিক আস্থার ভবিষ্যৎ নিয়েও।

👁️ 205 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *