
ঝিনাইদহ প্রতিনিধি : সম্প্রতি ঝিনাইদহ জেলা কারাগারে ধারণক্ষমতার তুলনায় প্রায় চারগুণ বন্দি থাকায় বেড়েছে অতিরিক্ত চাপ।

কারাগারটিতে ধারণক্ষমতার চেয়ে বন্দি থাকার কারণে কারাগারের মালামাল রাখার স্থানসহ কারাগারের ঘরগুলোর বাইরের বারান্দায়ও বন্দিদের রাখা হচ্ছে। এতেও সমস্যার সমাধান মিলছে না। অতিরিক্ত বন্দির চাপে কারাগারের সার্বিক পরিবেশ, আইনশৃঙ্খলা ও বন্দীদের স্বাস্থ্য ঝুঁকির বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
জানা গেছে, ঝিনাইদহ জেলা কারাগারে ৩৮২ জন বন্দি রাখার সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে সেখানে প্রায় সাড়ে ১২ শত বন্দি অবস্থান করছেন। ফলে নির্ধারিত ধারণ ক্ষমতার থেকে অতিরিক্ত ৮ কারাবন্দী রয়েছে।
এদিকে জেলার ৬টি উপজেলার মাদ’ক মামলায় ভ্রাম্যমান আদালতে ছামারি পাওয়ারে ৩, ৬ ও ১২ মাস কারাদ’ন্ড দেওয়ার আপিল ও জামিন না হওয়ার কারনেও বাড়ছে অতিরিক্ত বন্দিদের চাপ।

এছাড়া রাজনৈতিক ভাবে কথিত নাশকতার বিশেষ অভিযানে জেলার ৬টি উপজেলায় কার্যক্রম নিষি’দ্ধ আ:লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা কর্মীদের গ্রেপ্তারের কারণেও কারাগারে ব্যাপক হারে বন্দিদের ভিড় বাড়ছে মর্মে খবর মিলেছে। জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিনই কোন মামলা ছাড়াই আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার দেখাচ্ছে পুলিশ।

বিজ্ঞাপন
এ সমস্ত রাজনৈতিক মামলায় জামিনের জন্য আদালতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে বন্দিদের। ফলে কারাগারে প্রতিনিয়তই চাপ বাড়ছে। এছাড়া অতিরিক্ত বন্দির কারণে আবাসন, খাবার, চিকিৎসা, স্যানিটেশন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হয়েছে ব্যাপক ভাবে।
একই সঙ্গে বাড়তি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন কারারক্ষীরাও। জায়গার সংক’টের কারণে বন্দিদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায়ও নানা ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে বলে জানান, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সম্প্রীতি রাজনৈতিক মামলায় জামিনে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া এক বন্দি।
তিনি আরো বলেন বর্তমান কারাগারে বন্দীদের ঘুমানো থাকা খাওয়ার খুব কষ্ট হচ্ছে। সেই সাথে কারা ক্যান্টিনে অতিরিক্ত খাবারের দাম। সরকার এসব খেয়াল না করে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করছে পাইকারি হারে। বর্তমান পুরো জেলখানা জনসমুদ্র পরিণত হয়েছে।
এছাড়া আবাসিক কক্ষগুলোতে অতিরিক্ত বন্দি থাকায় পর্যাপ্ত জায়গা, ঘুমানোর ব্যবস্থা ও ব্যক্তিগত পরিসর সংকুচিত হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি টয়লেট, গোসল, পানি সরবরাহ ও অন্যান্য স্যানিটেশন ব্যবস্থার ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
বন্দিদের পাশাপাশি কারা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও বাড়তি চাপের মুখে রয়েছেন। নির্ধারিত জনবলের তুলনায় বন্দির সংখ্যা বেশি হওয়ায় নিরাপত্তা ও দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পরিচালনা করতে তাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
কারাগারে বন্দির চাপ বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা এবং বিচারাধীন বন্দির সংখ্যা বেশি থাকাকে সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করছেন। বিশেষ করে বিচারাধীন বন্দিদের মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি হলে কারাগারের ওপর চাপ কিছুটা কমতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
এদিকে অতিরিক্ত বন্দির কারণে কারাগারের চিকিৎসা ব্যবস্থাতেও বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিপুলসংখ্যক বন্দির স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, অসুস্থদের চিকিৎসা দেওয়া এবং সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে কারা কর্তৃপক্ষকে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে ঝিনাইদহ জেলা কারাগারের জেল সুপার মোঃ হাবিবুর রহমান ও জেলার স্বপন কুমার ঘোষ বলেন, “কারাগারের ধারণক্ষমতা ৩৮২ জন। বর্তমানে বন্দির সংখ্যা প্রায় সাড়ে ১২ শত। ধারণক্ষমতার তুলনায় বন্দি বেশি থাকায় ব্যবস্থাপনায় চাপ রয়েছে।
তবে কারা কর্তৃপক্ষ নিয়ম অনুযায়ী বন্দিদের খাবার, চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে।” তিনি আরও বলেন, “বন্দির সংখ্যা বেশি হলেও কারাগারের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারাগারে অতিরিক্ত বন্দির চাপ কমাতে অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রয়োজনীয় জনবল বাড়ানো এবং বিচারাধীন মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির দিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে বন্দিদের মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে কারা ব্যবস্থাপনার সার্বিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও জোর দিচ্ছেন তারা।
কারাগারে অতিরিক্ত বন্দির বিষয়ে জজ কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এডভোকেট আব্দুল খালেক সাগর জানান, জেলা কারাগারে অধিকাংশ রাজনৈতিক মামলায় বন্দি। তাদেরকে মাসের পর মাস আটকে রাখছে। আমরা আশা করব এ সমস্ত বন্দিদের নিয়মিত জামিন দিবে আদালত। মামলা হলেই কোন আসামি অপরাধ প্রমাণিত না হলে অপরাধী হয় না
এ বিষয়ে মানবাধিকার কর্মী ও সাংবাদিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাহিদুল এনাম পল্লব বলেন,বিনা বিচারে কাউকে দীর্ঘদিন বন্দী রাখা ঠিক না।
বিশেষ কিছু চাঞ্চল্যকর মামলা বাদে প্রতিটা আসামির জামিন পাওয়ার অধিকার রয়েছে। দীর্ঘদিন কারাগার আটকে রাখলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়না। আশা করবো সরকার এ ব্যাপারে সঠিক সিন্ধান্ত গ্রহণ করবে।
