সিআইসির সাবেক ডিজি আবদুর রকিবের বিরুদ্ধে ১,৮০০ কোটি টাকা সংগ্রহের অভিযোগ  :  শিল্পগোষ্ঠীর ফাইল আটকে ঘুষ দাবি, ৩২৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ থেকে বিদেশে অর্থ পাচার—মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের চিঠির পরও প্রশ্ন তদন্তে

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী

নিজস্ব প্রতিবেদক : জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল—সিআইসির সাবেক মহাপরিচালক এবং বর্তমানে ঢাকা কর অঞ্চল-৮-এর কর কমিশনার মোহাম্মদ আবদুর রকিবকে ঘিরে উঠেছে একের পর এক গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ। তাঁর বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা ঘুষ গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি রাজস্ব ক্ষতিসাধন, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ করা হয়েছে।


বিজ্ঞাপন

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে—২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ২০২৩ সালে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে ঘুষ হিসেবে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলকে সহযোগিতা করা, বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর কর-সংক্রান্ত ফাইল আটকে বিপুল অঙ্কের অর্থ দাবি এবং ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন।

তবে এসব অভিযোগের কোনোটিই আদালত বা তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে এখনো প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিই জানানো হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের হস্তক্ষেপ, জনপ্রশাসন ও আইআরডিকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ

অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের হস্তক্ষেপ চেয়ে গত ৩০ আগস্ট বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের পক্ষে ব্যারিস্টার রুকন উদ্দিন আহমেদ লিখিত আবেদন করেন।


বিজ্ঞাপন

এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৮ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাধারণ শাখা থেকে উপসচিব তানিয়া আফরোজ স্বাক্ষরিত একটি চিঠি জারি করা হয়। ওই চিঠিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিবকে নির্দেশনার অনুলিপি পাঠানো হয়েছে।


বিজ্ঞাপন

এ অবস্থায় অভিযোগগুলোর বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ এবং এনবিআরের শীর্ষ পর্যায় থেকে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

‘সাম্রাজ্য’ গড়ে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা সংগ্রহের অভিযোগ  :  অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুর রহমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে আবদুর রকিব এনবিআরের উচ্চপর্যায়ে প্রভাব বিস্তার করেন। এই প্রভাব কাজে লাগিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে তিনি প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আবদুর রকিব সরকারের অন্যতম ‘ডোনার’ ও প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ২০২৩ সালে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে ঘুষ হিসেবে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলকে সহযোগিতা করার গুরুতর অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে আনা হয়েছে।

এছাড়া ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নিজেকে আড়াল করতে হঠাৎ পোশাক-আশাক ও চেহারায় পরিবর্তন এনে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের অভিনয় শুরু করেন বলেও অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।

শিল্পগোষ্ঠীর ফাইল আটকে কোটি কোটি টাকা দাবির অভিযোগ  :  আবদুর রকিবের বিরুদ্ধে অভিযোগের আরেকটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে বড় শিল্পগোষ্ঠীর কর-সংক্রান্ত ফাইল আটকে অর্থ দাবির বিষয়টি।

অভিযোগপত্র অনুযায়ী, আকিজ গ্রুপ, স্কয়ার গ্রুপ, সিটি গ্রুপ ও মীর গ্রুপের ফাইল নিষ্পত্তির বিনিময়ে তিনি কোটি কোটি টাকা দাবি করতেন। একইভাবে হা-মীম গ্রুপের কাছে ১০০ কোটি টাকা ঘুষ দাবি করা হয়েছিল এবং ওই অর্থ না দেওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

এছাড়া বিভিন্ন সময়ে ইউনাইটেড গ্রুপ থেকে ১ কোটি টাকা, এস আলম গ্রুপ থেকে ১০০ কোটি টাকা এবং ‘অগ্রিম রাজস্ব’-এর নামে ৩৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, এনবিআরে দায়িত্ব পালনকালে কোনো অফিসিয়াল রেকর্ড না রেখে নগদ অর্থের বিনিময়ে ৩০টি ফাইলে স্বাক্ষর করেন আবদুর রকিব। একই সঙ্গে এক সহকারী কমিশনারের (ডিসি) সঙ্গে যোগসাজশ করে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ৩২৪ কোটি টাকা আত্মসাতের সঙ্গেও তাঁর সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ করা হয়েছে।

পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল সম্পদের অভিযোগ  : 
অভিযোগপত্রে আবদুর রকিব ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে বিপুল স্থাবর-অস্থাবর সম্পদেরও বিবরণ দেওয়া হয়েছে।

নিজ নামে থাকা সম্পদের অভিযোগ  : উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরে ১০ কাঠার প্লট; কলাবাগানে ১০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা মূল্যের ৫ হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাট; গুলশান-২-এ ফ্ল্যাট; সাভারে ২০ কাঠার প্লট; ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে গ্রামের বাড়িতে শত শত বিঘা জমি। স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিনের নামে সম্পদের অভিযোগ:
ডাচ-বাংলা ব্যাংকের মতিঝিল শাখায় ১০ কোটি টাকা; মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে ২০ কোটি টাকার এফডিআর; শ্যামলীতে ৩ হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাট; বনানীতে ৩ হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাট; ইস্টার্ন হাউজিং প্রকল্পে ১০ কাঠার প্লট।

সন্তানদের নামে ও বিদেশে সম্পদের অভিযোগ  :
অভিযোগে বলা হয়েছে, কানাডায় অধ্যয়নরত বড় ছেলে আফজালের নামে হুন্ডির মাধ্যমে ১০ কোটি টাকা পাচার করে টরন্টোতে বাড়ি কেনা হয়েছে।

ছোট ছেলে সোহেল রানার নামে যমুনা ব্যাংকে ৫ কোটি টাকার এফডিআর এবং অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে গাড়ি, ফ্ল্যাট ও পেট্রোল পাম্প থাকার অভিযোগ রয়েছে।

ছোট মেয়ে লুবনা খাতুনের নামে গুলশান-২-এ ৩ হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাট এবং অপর মেয়ে আয়েশা আক্তার ঝুমুরের নামে প্রিমিয়ার ব্যাংকে ২ কোটি টাকার এফডিআর থাকার অভিযোগ করা হয়েছে।
এছাড়া ঝুমুরের বিয়েতে এক রাতেই প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছিল বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

সিআইসি থেকে ঢাকা কর অঞ্চল-৮  :  অভিযোগের মধ্যেই গত ২০ আগস্ট এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবীব এক আদেশে মোহাম্মদ আবদুর রকিবকে সিআইসির মহাপরিচালকের পদ থেকে সরিয়ে ঢাকা কর অঞ্চল-৮-এর কর কমিশনার হিসেবে বদলি করেন।

ফলে তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে শুধু প্রশাসনিক বদলি নয়, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের দাবি  :  একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যখন একসঙ্গে ঘুষ, ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি রাজস্ব ক্ষতিসাধন, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, অর্থ আত্মসাৎ এবং বিদেশে অর্থ পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠে এবং বিষয়টি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নজরেও আসে, তখন অভিযোগগুলো যথাযথভাবে যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষ করে বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর ফাইল আটকে অর্থ দাবির অভিযোগ, ৩০টি ফাইলে অফিসিয়াল রেকর্ড ছাড়া স্বাক্ষর, ৩২৪ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এবং ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা সংগ্রহের মতো দাবিগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে নথিপত্র, ব্যাংক হিসাব, সম্পদ বিবরণী, কর নথি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে প্রশ্ন—মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের চিঠির পর এসব অভিযোগের বিষয়ে কী তদন্ত হয়েছে? অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে কোনো কমিটি বা অনুসন্ধান শুরু হয়েছে কি না? সরকারি রাজস্বের সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ কত? এবং অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে?

অভিযোগের বিষয়ে মোহাম্মদ আবদুর রকিবের বক্তব্য নেওয়ার জন্য চেষ্টা করেও তাঁর টেলিফোনে সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।

👁️ 183 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *