অসুরের মুখে ড. ইউনূসের মুখ অবয়ব এটাকে অপ-শিল্প বলাা যায় ? না ভারতীয় বিদ্বেষ  ?

Uncategorized অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী রাজনীতি

# মুর্শিদাবাদের পূজামণ্ডপে অসুরের মুখে মুহাম্মদ ইউনূস—শিল্প নাকি বিদ্বেষ  ? দুর্গাপূজার শুভ-অশুভ লড়াই কি কূটনৈতিক সংকটকে উসকে দিচ্ছে ? তাহলে কি ভারত ড. ইউনুস কে অসুরের মতো শক্তিশালী মনে করে তাদের  দেবী শেখ হাসিনা কে দি কল্পিত বধ দেখাতে চাইছে?  


বিজ্ঞাপন
ভারতের মুর্শিদাবাদের পূজামণ্ডপে তৈরি অসুরমূর্তি—যার মুখাবয়ব মিলে গেছে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে ।

 

 

কুটনৈতিক প্রতিবেদক  : গত বছরের ৫ আগস্টে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র জনতার আন্দোলন সংগ্রামের ফলে সাবেক আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকার পতনের ফলে শেখ হাসিনা পালিয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতে আশ্রয় নেন। তারপরই শুরু করেন ভারতে আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে বাংলাদেশের ভেতরে অস্থিরতা তৈরির নীল নকশা, সাথে যোগ দের পশ্চিম বাংলা সহ ভারতের বিভিন্ন প্রচার মাধ্যম।

একদিকে শেখ হাসিনা এবং অপরদিকে ভারতীয় প্রচার মাধ্যম গুলো শুরু করে প্রচারের নামে বিভিন্ন মিথ্যা প্রপাগাণ্ডা। একবছর যেতে না যেতেই হঠাৎ এবারের দুর্গা পুজার প্রতিমার মধ্যে ই ঢুকিয়ে দিলো ড.ইউনুস কে। এতে এটাই প্রমান করে ড. ইউনুস ভারতের কুশীলবের কাছে অসুরের মতো শক্তিশালী, সেটা কি ইউনুসের কূটনৈতিক পারদর্শিতার কারনে, কারন ড.ইউনুস ইতোমধ্যে ই ভারত তথা মোদি সরকারকে।


বিজ্ঞাপন

জানা গেছে, হঠাত করে এবছরের দুর্গা পুজায় মুর্শিদাবাদের পূজামণ্ডপে তৈরি অসুরমূর্তি—যার মুখাবয়ব মিলে গেছে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে । এর ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে বাংলাদেশে তো বটেই, পশ্চিমবঙ্গেও চলছে নিন্দা ও সমালোচনার ঝড়।


বিজ্ঞাপন

কাজটা সন্দেহাতীতভাবে শিষ্টাচারবহির্ভূত হয়েছে। শুভ ও অশুভের প্রতীকী লড়াইয়ের মঞ্চ যে দুর্গাপূজা, সেখানে ভিনদেশের একজন সরকারপ্রধানকে অসুর রূপে প্রতীকায়িত করা মেনে নেওয়া যায় না। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের বহরমপুরের একটি পূজামণ্ডপে তাই করা হয়েছে। সেখানে অসুররূপে হাজির করা হয়েছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও শান্তিতে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসকে। স্থানীয় শিল্পীদের এই সিদ্ধান্ত শুধু শিল্পরুচির প্রশ্নেই বিতর্কিত নয়—এটি সীমান্তপারের সম্পর্ক, কূটনৈতিক শিষ্টাচার এবং সামাজিক সম্প্রীতির ওপর সরাসরি আঘাত হানার সামিল।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুর খাগড়া সাধক নরেন্দ্র স্মৃতি সংঘের দুর্গাপূজামণ্ডপ ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্ক কেবল স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি এখন আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গের পত্রপত্রিকা বলছে, শুধু ড. ইউনূসকেই নয়, তাদের অন্য দুটি পূজামণ্ডপের একটিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প, অন্যটিতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফকে অসুররূপে নির্মাণ করা হয়েছে। পূজামণ্ডপে সরকারপ্রধানদের মুখাবয়ব ব্যবহার করে অসুরের প্রতিকৃতি নির্মাণ—একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিকভাবে বিতর্কিত কাজ হয়েছে। পুরাণপ্রতীককে এমন মাটির পৃথিবীতে নামিয়ে আনাটা কতখানি শিল্পীর স্বাধীনতা বলে বিবেচিত হবে, সেই প্রশ্ন থেকে যায়।

ডনাল্ড ট্রাম্প ও শাহবাজ শরিফের মুখাবয়ব ব্যবহার করে অসুর নির্মাণ এমন আলোচনার জন্ম দেয়নি, যতটা মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে হচ্ছে। কারণটা সহজ, ভারত তো আমাদের দূরের দেশ নয়, আর পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে তো রয়েছে নিবিড় নৈকট্য।

সম্প্রতি “Soumavo’s Creations” নামের একটি ফেইসবুক পাতায় নরেন্দ্র স্মৃতি সংঘের দুর্গাপূজামণ্ডপের প্রতিমার ভিডিও প্রকাশ পাওয়ার পর তা দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়। বাংলাদেশ ও ভারতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজুড়ে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা। ভারতীয় সমাজের একটি অংশ এটিকে হালকা রসিকতা বা শিল্পীসুলভ স্বাধীনতা হিসেবে দেখলেও, অনেকে এটিকে সরাসরি অসম্মানজনক, কটাক্ষপূর্ণ এবং অগ্রহণযোগ্য বলে নিন্দা করেছেন। বাংলাদেশেও বিষয়টি ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে, কেউ কেউ যে খুশি হয়েছেন, তা প্রবাসী বাংলাদেশীদের ফেইসবুক পাতায় বোঝা যাচ্ছে।

দুর্গাপূজায় অসুরকে অন্যায়ের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা একটি প্রাচীন রীতি। মন্দের বিরুদ্ধে শুভের জয় প্রকাশের জন্যই দুর্গার পায়ের নিচে অসুরের প্রতিচ্ছবি নির্মিত হয়। কিন্তু এই প্রতীকায়ন যখন কোনো বাস্তব ও সমসাময়িক ব্যক্তিত্বের মুখাবয়ব গ্রহণ করে, তখন তা প্রতীক থেকে সরে গিয়ে সরাসরি বিদ্বেষমূলক হয়ে ওঠে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে কেন মুর্শিদাবাদের ওই পূজামণ্ডপে এমনটা ঘটল? পশ্চিমবঙ্গে শিল্প-সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত আমার দুজন বন্ধুর সঙ্গে কথা বললাম এ নিয়ে। তাদের মতে, মুর্শিদাবাদের ওই দুর্গাপূজামণ্ডপে মুহাম্মদ ইউনূসকে অসুরের মুখে রূপায়ণ করার ঘটনাটি নিছক শিল্পরুচির বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং এর ভেতরে রয়েছে দীর্ঘ সামাজিক-রাজনৈতিক ইতিহাস ও অভিবাসন জনিত মানসিকতার প্রতিফলন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষমতার পালাবদল এবং সাম্প্রতিক সময়ে ড. ইউনূসকে ঘিরে বিতর্ক মুর্শিদাবাদের মানুষের কল্পনাশক্তিতে প্রতিফলিত হয়েছে। যারা বাংলাদেশে রাজনৈতিক আলোচনাকে প্রতিদিনের খবরে, আত্মীয়-স্বজনের গল্পে, কিংবা স্মৃতিতে বহন করেন, তাদের কাছে বাংলাদেশ শুধুই একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়—বরং আত্মপরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত একটি মানসিক ভূগোল। ফলে পূজামণ্ডপের শিল্পীরা যখন ‘অসুর’ চরিত্র নির্মাণ করতে গিয়েছেন, তারা স্থানীয় মানুষের রাজনৈতিক আবেগকেও শিল্পে প্রতিফলিত করেছেন।

খাগড়ার মণ্ডপে যে মূর্তি তৈরি হয়েছে, সেখানে অসুরের মুখাবয়ব যে ড. ইউনূসের আদলে বানানো হয়েছে, তা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। পূজা উদ্যোক্তারা যদিও দাবি করেছেন, তাদের এ বছরের থিম ‘দহন’—যা প্রতীকীভাবে দেশের শত্রুদের বিনাশের ধারণা বহন করছে, কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়: ‘দেশের শত্রু’ বলতে তারা কাকে বোঝাচ্ছেন? যখন প্রতীকের রূপ বাস্তব কোনো ব্যক্তির সঙ্গে মিলে যায়, তখন সেটি কেবল একটি সাংস্কৃতিক থিম থাকে না, বরং রাজনৈতিক বিদ্বেষ বা সামাজিক বিদ্রূপে রূপ নেয়। এভাবে প্রতীকের শক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়, এবং তা বিভেদের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর নেটিজেনদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই একে কেবল শিল্পকর্মের সীমায় আবদ্ধ না রেখে প্রতিবেশী দেশের প্রতি প্রকাশ্য অসম্মানের বলে মন্তব্য করেছেন। যেহেতু মুহাম্মদ ইউনূস কেবল বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নন, তিনি একজন নোবেলজয়ী এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব—তাকে অসুররূপে উপস্থাপন বাংলাদেশের জনমনে অপমানের অনুভূতি জাগিয়েছে।

এ থেকে বোঝা যায়, এ বিষয়টি শুধু সীমান্তের এপারে ক্ষোভ সৃষ্টি করেনি, বরং ভারতের মধ্যেও তা শালীনতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন তুলেছে।

যদিও বাংলাদেশ সরকার বা কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য আসেনি,  তবু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় এটি স্পষ্ট যে, সাধারণ মানুষ এ ঘটনাকে কূটনৈতিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী এবং প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্প্রীতি নষ্টের উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন।

প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখার অন্যতম প্রধান উপাদান হলো কূটনৈতিক শিষ্টাচার। রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক যে কোনো কর্মকাণ্ডে অন্য দেশের নেতৃত্বকে অসম্মান করা কেবল অনভিপ্রেত নয়, বরং বিপজ্জনকও বটে। ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক বহুমাত্রিক—অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও মানবিক বন্ধনে জড়িয়ে আছে দুই দেশ। এই সম্পর্ককে ক্ষুণ্ন করার মতো কোনো পদক্ষেপ তাই গুরুতর পরিণতি ডেকে আনতে পারে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না আসলেও জনমতের চাপ এই ঘটনায় ভবিষ্যতে কূটনৈতিক টানাপোড়েন সৃষ্টি করতে পারে।

এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দুই দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা। বাংলাদেশ ও ভারত— উভয় দেশেই ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা প্রায়শই সামাজিক বৈরিতার শিকার হন। ধর্মীয় উৎসব যখন বিদ্বেষ বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রতীক হয়ে ওঠে, তখন এর নেতিবাচক প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে সংখ্যালঘুদের ওপর। অথচ পূজা-পার্বণের মূল বার্তা হওয়া উচিত সম্প্রীতি, ঐক্য ও মানবিকতার। বিভেদের প্রতীক হিসেবে পূজার ব্যবহার হলে তা কেবল উৎসবের মহিমাই ক্ষুণ্ণ করে না, বরং সমাজে নতুন উত্তেজনা ছড়িয়ে দিতে পারে।

👁️ 116 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *