বদলী হলেই রাজনৈতিক তদবীর: একই কর্মস্থলে এক যুগেরও বেশি অবস্থান  : খুলনা গণপূর্তে আওয়ামী ঠিকাদার শওকত ও প্রকৌশলী সাইফুলের সিন্ডিকেট লুটপাট চলছে  !

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত খুলনা গ্রাম বাংলার খবর জাতীয় বিশেষ প্রতিবেদন সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক (খুলনা)  :  এক যুগেরও অধিক সময় খুলনা গণপূর্ত বিভাগে দুর্নীতির রাজত্ব চালাচ্ছেন ডিপ্লোমা প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম। তার গডফাদার হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন শেখ পরিবারের অতিঘণিষ্ঠ এক প্রভাবশালী ঠিকাদার। খুলনা গণপূর্ত বিভাগ-১ এ ২০১৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ১২ বছরের অধিককাল একই কর্মস্থলে আছেন তিনি। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলে দুর্নীতির মাধ্যমে নামে-বেনামে কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক বনে গেছেন এই ডিপোøমা প্রকৌশলী।


বিজ্ঞাপন

তিনি ২০১৪ সালে গণপূর্ত অধিদপ্তরে চাকরিতে যোগদান করেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই শেখ সোহেল ও খুলনা মহানগরী যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শেখ শাহজালাল সুজনের গণপূর্ত বিভাগ-১-এর বাগিয়ে নেওয়া কাজগুলো মাঠপর্যায়ে সাহায্যকারী হিসেবে সরাসরি তত্ত্বাবধান করতেন এবং তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তথা খুলনা গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, গণপূর্ত বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী ও উপবিভাগীয় প্রকৌশলীদের ফ্যাসিবাদী রাজনীতির ছত্রছায়ায় ভয়ভীতি প্রদর্শন করে নিজের আয়ত্তে রাখতেন।

দক্ষিণবঙ্গ তথা খুলনা বিভাগের মানুষের চিকিৎসার জন্য একমাত্র আস্থা ও ভরসার জায়গা খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। এখানে চারটি ব্লকে অবস্থিত ভবনগুলোর ভেতরে প্রবেশ করে দেখা যায়, ভবনগুলোর ভেতরের অবকাঠামো ও ওয়াশরুমের জরাজীর্ণ ও বেহলা দশা। বাইরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার যে দুর্দশা তার জন্য ফ্যাসিস্টের দোসর ডিপ্লোমা প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম অনেকাংশে দায়ী। অথচ খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভবনগুলো মেরামত বাবদ প্রতি বছর গণপূর্তের বার্ষিক পরিকল্পনা খাত, সরকারের স্বাস্থ্য খাতের বিশেষ বরাদ্দ ও বিশ্বব্যাংকের বিশেষ অনুদান থেকে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ থাকে।


বিজ্ঞাপন

বিগত কয়েক বছরের টেন্ডার শিডিউল পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিভিন্ন কাজের নামে একই কাজ ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বার বার বাস্তবায়ন দেখানো হয়েছে। গণúূর্তের এ ডিপ্লোমা প্রকৌশলী কিছু কিছু মেরামত কাজ বাস্তবায়ন না হলেও ভুয়া বিল সাবমিট করে বিশাল অঙ্কের টাকা আত্মাসাৎ করেছেন। তিনি ফ্যাসিস্টদের সহযোগিতা করে এবং সম্মিলিতভাবে ঠিকাদারি ব্যবসা করেন বলে জানা যায়। এ ডিপ্লোমা প্রকৌশলী ২০১৪ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত মেরামত ও প্রকল্প কাজের অস্বাভাবিক ব্যয় ও ব্যাপক অনিয়ম ও লুটপাটের আশ্রয় নিয়েছেন। প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম একই কর্মস্থলে এক যুগেরও বেশি সময় চাকরি করে নামে-বেনামে অঢেল সহায়-সম্পত্তির মালিক হয়েছেন। এর মধ্যে নিজ জেলা পটুয়াখালীর বাউফলে, বাসা/হোল্ডিং নং-২৬৪, গ্রাম/রাস্তা: মরহুম রমিজ উদ্দিন সড়কে দৃষ্টিনন্দন ভবন নির্মাণ করেছেন।


বিজ্ঞাপন

এছাড়া গ্রামে প্রায় ১৫ বিঘা জমি ক্রয় করেছেন, বরিশাল শহরে দৃষ্টি নন্দন বহুতল ভবন নির্মাণ করেছেন। খুলনা শহরের প্রাণকেন্দ্র ‘নিরালা আবাসিক এলাকা’ ও ঢাকা শহরে তার রয়েছে একাধিক বিলাস বহুল ফ্ল্যাট। যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকেন, ভোল পাল্টে সুকৌশল ব্যবহার করে গণপূর্ত ডিপ্লোমা ও ডিগ্রি প্রকৌশলীর মহলে ব্যাপক প্রভাব বিস্তারর অভিযোগের প্রমাণ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তিনি গণপূর্তের বদলি নিয়ে বিভিন্ন সময়ের সাবেক মন্ত্রী, বর্তমান উপদেষ্টা, সচিব ও আমলাদের নাম বিক্রি করে সব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে ভীতির সুষ্টি করতেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামকে গত নভেম্বর ২০২০ সালে বাগেরহাট গণপূর্ত বিভাগে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয়ের ২৫.৩৬.০০০০.২১১.১৯.২.০১.১৩/১০০ পত্র স্মারকের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বদলি করা হয়। কিন্তু তিনি শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই শেখ সোহেল ও যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শেখ শাহ্জালাল হোসেন সুজনের সরাসরি হস্তক্ষেপে অবৈধ অর্থ ও ক্ষমতা প্রভাব বিস্তার করে একজন আনডিউ ডিপ্লোমা প্রকৌশলীকে সরিয়ে ৬ জানুয়ারি ২০২১ সালে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয়ের ২৫.৩৬.০০০০.২১১.১৯.২.০১.১৩/০৪ পত্র স্মারকের মাধ্যমে মাত্র ২ মাসের ব্যবধানে বদলি হয়ে পূর্বের কর্মস্থল খুলনা গণপূর্ত বিভাগ-১-এ ফেরত আসেন।

সম্প্রতি ২০২৫ সালে ১০ জুলাই গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয়ের ২৫.৩৬.০০০০.২১১.১৯.২.০১.১৩/১০৬ পত্র স্মারকের সাধারণ বদলি প্রজ্ঞাপন করে খুলনা গণপূর্ত বিভাগ-১ খুলনা থেকে তাকে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১-এ বদলি করা হয়।

কিন্তু তিনি সন্তুষ্ট না হওয়ায় অবৈধ অর্থের মাধ্যমে বর্তমান সরকারের উচ্চমহলের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে চাপ প্রয়োগ করলে প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে থেকে পুনরায় ২০২৫ সালে ২২ অক্টোবর ২৫.৩৬.০০০০.২১১.১৯.২.০১.১৩/১৯৪ পত্র স্মারকের মাধ্যমে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১ থেকে রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগ ঢাকায় বদলি করা হয়।

এবারও তিনি অসন্তুষ্ট হয়ে উচ্চমহলে পুনরায় তদবিরের মাধ্যমে প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তর থেকে ২০২৫ সালের ৯ নভেম্বর একজন আনডিউ ডিপ্লোমা প্রকৌশলীকে প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয়ের ২৫. ৩৬.০০০০.২১৯.১৯.২.০১.১৩/২০৮ পত্র স্মারকের মাধ্যমে ঢাকার রক্ষণাবেক্ষণ গণপূর্ত বিভাগ হতে পূর্বের কর্মস্থল খুলনায় বদলি হয়েছেন। এই চার মাসের মধ্যে ২টি বদলি হতে তদবিরের কাজে এ ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামের ৩০ লাখ টাকার অধিক বিভিন্ন পর্যায়ে খরচ হয়েছে বলে তিনি বন্ধু মহলে জানিয়েছেন।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প অডিট অধিদপ্তরের (এফএপিএডি) একটি অডিট টিম ‘কোভিড-১৯’ জরুরি প্রতিক্রিয়া এবং মহামারি প্রস্তুতি প্রকল্প (গণপূর্ত অংশ) মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ২০ শয্যা ওয়ানস্টপ জরুরি সেবা কেন্দ্র স্থাপন (ইজিপি-৯১৭৩৪০) এবং খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫ শয্যা প্যাডিয়াট্রিক আইসিইউ স্থাপনের (ইজিপি-৯২৪৯২৪) বিশ্বব্যাংক কর্তৃক প্রদত্ত বিশেষ বরাদ্দের মাঠপর্যায়ের কাজ পরিদর্শনে যেয়ে টেন্ডার সিডিউলের কয়েকটি আইটেমের কাজ পর্যবেক্ষণ করে ব্যাপক অনিয়ম পেয়েছেন। কৈলেশ চন্দ্র দাস, অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্ট অফিসার (এফএপিডিএ) তার স্বাক্ষরিত গত ১৮/০৯/২০২৫ তারিখে তিনটি আপত্তির পত্রের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ বাবদ ৪৪ লাখ ১০ হাজার ৫১ টাকা দেখিয়েছেন।

ডিপ্লোমা প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম মারফত এ কাজের বিল কোভিড পরবর্তী সময়ে মেজারমেন্ট বুকে অ্যান্ট্রি না করে বিশেষ ফরমেটের মাধ্যমে কাজের পূর্বেই তড়িঘড়ি করে প্রদান করা হয়েছে মর্মে জানা যায়। এ ব্যাপারে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এস এন বিল্ডার্সের স্বত্বাধিকারীকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, কাজের শুরুতে নকশাবহির্ভূত, গোঁজামিল দেওয়া ও অস্বাভাবিক এস্টিমেট হাতে পাওয়ার পরই প্রাক্কলন প্রণয়নকারী ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামকে অবহিত করি। তিনি এস্টিমেটের বিষয়টি নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি না করার নির্দেশ দেন এবং আমাদের নকশা অনুযায়ী যতটুকু কাজ তিনি দেখিয়েছেন ততটুকু কাজ সম্পন্ন করেছি। নকশা অনুযায়ী বাকি কাজ করানোর ক্ষেত্র নেই বলে তিনি জানান। এভাবে বেশিরভাগ বরাদ্দ এ ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে লোপাট করা হয়েছে।

এছাড়া খুলনা গণপূর্ত বিভাগ-১-এর আওতাধীন ৮টি বিভাগীয় শহরের সরকারি মেডিকেল হাসপাতালে ১০০ শয্যা পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় এমবিপিএল,আই এসএনবিপিএল(জেভি) এর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে ১৭তলা ভিত বিশিষ্ট দুটি বেজমেন্টসহ ১৭ তলা ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে এবং একইসঙ্গে প্রকল্পের ২২টি প্যাকেজের প্রায় ১৩৫ কোটি টাকার কাজ চলমান রয়েছে।

যার সরাসরি মাঠপর্যায়ের সুপারভিশনের দায়িত্বে আছেন এ ডিপ্লোমা প্রকৌশলী। গত ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে মূল ভবনসহ প্যাকেজসহ অন্যান্য কাজে অগ্রিম বিল ঠিকাদারকে প্রদান করা হয়েছে, যার অনেকাংশ কাজ এখন পর্যন্ত শেষ করা হয়নি, যা সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত। এছাড়া নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ও দরজার কাষ্টে বার্মাটিক ধরা থাকলেও চিটাগাংটিক লাগানো হয়েছে। তার হাতে এ প্রকল্পের সুপারভিশন নিরাপদ নয় বলে গণপূর্তের খুলনায় কাজ করা এক ঠিকাদার জানিয়েছেন।

একাধিক সুত্রে জানা গেছে, ফ্যাসিষ্ট শেখ হাসিনার ভাতিজা এবং খুলনার এক সময়ের নিয়ন্ত্রক শেখ সুজনের ম্যানেজার শওকতকে হাত করে ডিপ্লোমা প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম খুলনায় হাঁটু গেড়ে বসেছেন। এই শওকতের দ্বারা তদবীর করে বারবার বদলী আদেশ বাতিল ও খুলনায় পোষ্টিং বাগিয়ে নিচ্ছেন। ঠিকাদার শওকত এখন বিএনপি নেতা লাভু বিশ্বাসের উপর ভর করে খুলনা গণপূর্তে দুর্নীতির রাজত্ব চালিয়ে যাচ্ছেন।

খুলনাবাসীর প্রশ্ন,অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমলেও ফ্যাসিস্টের দোসর ডিপ্লোমা প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম কিভাবে একযুগেরও বেশি সময় খুলনা গণপূর্ত বিভাগে অবস্থান করছেন? এ ক্ষেত্রে তারা গণপূর্ত উপদেষ্টা,সচিব ও প্রধান প্রকৌশলীর পদক্ষেপ কামনা করেছেন।

👁️ 216 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *