স্ট্র্যাপলাইন : নতুন অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও রহস্যজনক ছাড়পত্র # ফোন ধরেননি চেয়ারম্যান # দুদকের ভেতরের ‘অদৃশ্য শক্তি’ নিয়ে তীব্র প্রশ্ন ?


নিজস্ব প্রতিবেদক : দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের প্রধান পাহারাদার দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)—আজ নিজেই কাঠগড়ায়। কারণ, রূপায়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. লিয়াকত আলী খান (মুকুল)–এর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের দীর্ঘদিনের অভিযোগ হঠাৎ করেই পরিসমাপ্ত করেছে কমিশন—তাও এমন সময়ে, যখন নতুন অভিযোগ যুক্ত, মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান অসম্পূর্ণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তারা নীরব।
এই সিদ্ধান্ত কি আইনের স্বাভাবিক প্রয়োগ, নাকি প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠীর কাছে দুদকের নতি স্বীকার—এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে কমিশনের অন্দরমহল থেকে শুরু করে সচেতন নাগরিক মহলে।

৭ বছরের অনুসন্ধান, এক চিঠিতে সব শেষ ! দুদকের নথি অনুযায়ী— ২০১৭ সালে রূপায়ন গ্রুপের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু, ২০২৩ সালে নতুন করে আরও অভিযোগ যুক্ত, একাধিক কমিশনের আমলে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, অথচ বর্তমান কমিশন ১০ ডিসেম্বর তারিখের এক চিঠিতে অভিযোগ পরিসমাপ্ত করে চিঠিতে স্বাক্ষর করেন দুদকের পরিচালক মো. বেনজীর আহম্মদ। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের আইনগত ও অনুসন্ধানগত যুক্তি জনসম্মুখে স্পষ্ট নয়।

নীরব দুদক, প্রশ্নবিদ্ধ স্বচ্ছতা : অব্যাহতির কারণ জানতে—অনুসন্ধান কর্মকর্তা মো. কামিয়াব আফতাহি-উন-নবী মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান, কমিশনার (অনুসন্ধান) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাফিজ আহ্সান ফরিদ–এর ফোন বন্ধ, দুদক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন ফোন ধরেননি, হোয়াটসঅ্যাপেও নীরব, রাষ্ট্রীয় একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের এমন সমন্বিত নীরবতা কি কাকতালীয়? নাকি সিদ্ধান্তের পেছনে এমন কিছু আছে, যা প্রকাশ্যে এলে প্রশ্নবিদ্ধ হবে কমিশনের ভূমিকা?
দুদকের ভেতর থেকেই বিস্ফোরক অভিযোগ : নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের একাধিক সূত্র জানায়— “এটি স্বাভাবিক পরিসমাপ্তি নয়। উপরের দিক থেকে চাপ ছিল। জোর তদবিরের বাস্তবতা উপেক্ষা করা যায় না।”
সূত্রগুলোর দাবি— মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান কর্মকর্তাদের পর্যবেক্ষণ পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি, কমিশনের সিদ্ধান্তে প্রভাবশালী মহলের স্বার্থ রক্ষা পেয়েছে, অনুসন্ধান ও তদারককারী কর্মকর্তারা কেবল নির্দেশ পালনকারী হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছেন।
রূপায়ন গ্রুপের অভিযোগের পাহাড় অক্ষত : অব্যাহতি পেলেও রূপায়ন গ্রুপকে ঘিরে অভিযোগের তালিকা কম নয়, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ, বিপুল সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন, নতুন অভিযোগ যুক্ত থাকা সত্ত্বেও তদন্ত বন্ধ এবং রাজউকের সঙ্গে যোগসাজশে জাল কাগজপত্র ও ক্ষমতার অপব্যবহারে প্ল্যান পাসের অভিযোগ।
অভিযুক্ত রাজউক কর্মকর্তা : অভিযুক্ত রাজউক কর্মকর্তা কামরুল হাসান সোহাগসহ একাধিক কর্মকর্তা, দুদকের তলব ও জিজ্ঞাসাবাদ, রাজউকের ৬ কর্মকর্তা তলব, জিজ্ঞাসাবাদ করেন দুদকের উপপরিচালক আহসানুল কবীর পলাশ ও উপসহকারী পরিচালক আফিয়া খাতুন, প্রশ্ন হলো—যে অভিযোগে সরকারি কর্মকর্তারা তলব হন, সেই মূল সুবিধাভোগী কীভাবে অব্যাহতি পান?
আইন বনাম বাস্তবতা : দুদক আইন স্পষ্টভাবে বলে— নতুন অভিযোগ এলে পরিসমাপ্ত মামলাও পুনরায় খোলা যায়, তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে—নতুন অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তদন্ত বন্ধ, প্রভাবশালীদের ক্ষেত্রে দুদকের গতি শ্লথ, সাধারণ নাগরিকের ক্ষেত্রে কঠোরতা, কর্পোরেট ক্ষমতাবানদের ক্ষেত্রে নীরবতা, দুদক বনাম রূপায়ন—কে জিতল?
এই মুহূর্তে বাস্তব চিত্র বলছে—রূপায়ন গ্রুপ অব্যাহতি পেয়েছে, দুদক হারিয়েছে জনআস্থার আরেকটি বড় অংশ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতীক দুদক যদি প্রভাবের কাছে মাথা নোয়ায়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই— দুদক কি এখনও স্বাধীন, নাকি প্রভাবশালীদের জন্য ‘নির্বাচিত ন্যায়বিচার’-এর কারখানা?
শেষ কথা : এই প্রতিবেদন কোনো চূড়ান্ত রায় নয়—বরং এটি জনস্বার্থে উত্থাপিত গুরুতর প্রশ্ন। এ প্রশ্নের জবাব দেওয়ার দায়িত্ব দুদকেরই। কারণ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ জিততে হলে—দুদককেই হতে হবে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে।
