গণপূর্ত কাঠের কারখানা স্পেশাল ইউনিটে ‘ফ্যাসিবাদীদের লুটপাট সাম্রাজ্য’ — ঠিকাদারদের রুটিরুজিতে ছুরি, নেপথ্যে প্রভাবশালী এমপি-ঘনিষ্ঠ প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক  :  গণপূর্ত অধিদপ্তরের কাঠের কারখানা স্পেশাল ইউনিটে দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধ অনিয়ম, দুর্নীতি ও বিশেষ সুবিধাভোগী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে শতকোটি টাকার কাজ বণ্টনে কারসাজির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।


বিজ্ঞাপন

অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম—যিনি আওয়ামী লীগ শাসনামলে এক প্রভাবশালী সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হিসেবে পরিচিত এবং স্বৈরাচারী শাসন কাঠামোর সুবিধাভোগী হিসেবে আলোচিত।

ভুক্তভোগী সাধারণ লাইসেন্সধারী ঠিকাদারদের অভিযোগ, স্পেশাল ইউনিটে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর একটি “বিশেষ কৌশলনির্ভর ঘুষ ও কাজ বাণিজ্য ব্যবস্থা” চালু করেছেন। এতে প্রকল্পের এস্টিমেট আগেভাগেই নির্দিষ্ট কয়েকজন ঠিকাদারের কাছে বিক্রি করা হয় অগ্রিম ৩–৪ শতাংশ কমিশনের বিনিময়ে। একই সঙ্গে ফার্নিচার প্রস্তুতকারী নির্দিষ্ট কিছু কোম্পানিকেও গোপন রেট-কোড সরবরাহ করা হয়, যাতে শেষ পর্যন্ত কাজ যায় পছন্দের কোম্পানির হাতেই।


বিজ্ঞাপন

ফলে সাধারণ ঠিকাদাররা অগ্রিম অর্থ দিয়েও কাজ না পেয়ে মাসের পর মাস আশ্বাসের ফাঁদে আটকে থাকছেন। কেউ কাজ পেয়ে গেলেও তাকে বাধ্য করা হচ্ছে নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেই মালামাল সংগ্রহ বা উৎপাদন করতে। অভিযোগ রয়েছে, মৌখিকভাবে হুমকি দেওয়া হয়—নির্দেশ অমান্য করলে চুক্তিপত্র বাতিল করা হবে।


বিজ্ঞাপন

অনুসন্ধানে জানা গেছে, “ফার্নিচার কনসেপ্ট এন্ড ইন্টেরিয়র লিমিটেড” নামের একটি প্রতিষ্ঠান চলতি ও গত অর্থবছরে অস্বাভাবিকভাবে বিপুল সংখ্যক কাজ পেয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রকৌশলী জাহাঙ্গীরের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ব্যবসায়িক স্বার্থ জড়িত।

প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি পেয়েছে— ২০২৫/১৩ নং লটে ৩,৫৩,৪৫,৮০২.৫১৩ টাকার কাজ, ২০২৫/৩ নং লটে ৩,৩৭,৩৭,৯০২.৫১৩ টাকার কাজ এবং ২০২৫/৪ নং লটে ৩,৩৭,৩৭,৯০২.৫১৩ টাকার কাজ। (সবকটিই মডেল মসজিদ প্রকল্পের আসবাবপত্র সরবরাহ ও স্থাপন কাজ) এছাড়া ২০২৫–২৬ অর্থবছরে— রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে ২৭,৩৬,১০০ টাকা, শহীদ নায়েব সুবেদার আশরাফ আলী খান বীরবিক্রম লাইব্রেরিতে ১,৮২,৩৪,৭০০ টাকা এবং পাবলিক লাইব্রেরী বহুমুখী ভবনে ১,৯৩,৩০,৭৫৬.৬৯১ টাকার কাজ।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভবনের মূল নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার আগেই ফার্নিচার সরবরাহ চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে—যা সরকারি ক্রয় বিধিমালার স্বাভাবিক ধারার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন। অন্যদিকে আকতার ফার্নিচারস, নদীয়া ফার্নিচার ও হাতিলসহ কয়েকটি কোম্পানিও কোটি টাকার কাজ পেয়েছে। অভিযোগ রয়েছে , এসব প্রতিষ্ঠান বিভিন্নভাবে সুবিধা প্রদান করে প্রভাব বিস্তার করেছে।

ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের ভাষ্য, আগে যারা সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টসহ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরে বছরের পর বছর মানসম্পন্ন আসবাব সরবরাহ করতেন, তারা এখন কার্যত কাজবঞ্চিত। পরিবর্তে পছন্দের কোম্পানি ও ব্যক্তি বিশেষের হাতে বাজার নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে।

আরও অভিযোগ উঠেছে, পূর্বে অন্য বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে প্রকৌশলী জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে এপিপি প্রকল্পসহ একাধিক উন্নয়ন কাজে বেনামী ঠিকাদারি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ছিল, যার প্রেক্ষিতে একসময় তাকে ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়। তবে রাজনৈতিক প্রভাব ও অবৈধ অর্থের জোরে পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে প্রত্যাবর্তনের ঘটনাও আলোচনায় এসেছে।

সব মিলিয়ে গণপূর্ত কাঠের কারখানা স্পেশাল ইউনিট বর্তমানে একটি “ফ্যাসিবাদী আমলের লুটপাট পুনর্দখল প্রকল্পে” পরিণত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলমের বক্তব্য জানতে একাধিকবার তার মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। বক্তব্য পেলে পরবর্তীতে সংযোজন করা হবে।

বিশেষ নোট (সম্পাদকীয় সতর্কতা) : এই প্রতিবেদনে উত্থাপিত সব বক্তব্য সংশ্লিষ্ট সূত্র, ভুক্তভোগী ঠিকাদার ও প্রাপ্ত নথির ভিত্তিতে উপস্থাপিত অভিযোগ। তদন্তাধীন বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ অনুসন্ধান প্রয়োজন।

👁️ 112 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *