
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি : নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার মুছারচর এলাকায় শারীরিক প্রতিবন্ধী অটোরিকশা চালক সোহেল (৪১) হত্যাকাণ্ডে মাত্র চার দিনের মধ্যে রহস্য উদঘাটন করে চাঞ্চল্যকর সাফল্য অর্জন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) নারায়ণগঞ্জ। হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত দুই ঘাতকসহ মোট পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। একই সঙ্গে উদ্ধার করা হয়েছে নিহতের ছিনতাইকৃত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। গ্রেফতারকৃত দুই প্রধান আসামি বিজ্ঞ আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছে, যা মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

নিখোঁজ থেকে লাশ উদ্ধার—শোকের শুরু : গত ১৯ জানুয়ারি বিকেলে শারীরিক প্রতিবন্ধী অটোরিকশা চালক সোহেল বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফিরে আসেননি। পরিবারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি শুরু হয়।
পরদিন ২০ জানুয়ারি সকাল আনুমানিক ৭টায় নিহতের ভাই মো. মহসিন মিয়া লোকমুখে জানতে পারেন, মুছারচর এলাকায় সড়কের পাশে একটি অজ্ঞাত লাশ পড়ে আছে। ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি লাশটি তার ভাই সোহেলের বলে শনাক্ত করেন। পরে তিনি সোনারগাঁও থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।

মাঠে নামে পিবিআই—ছায়া তদন্তে দ্রুত অগ্রগতি : হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই পিবিআই নারায়ণগঞ্জ জেলার ক্রাইম সিন টিম ছায়া তদন্ত শুরু করে। মামলাটি পিবিআই-এর সিডিউলভুক্ত হওয়ায় সংস্থাটি স্ব-উদ্যোগে তদন্তভার গ্রহণ করে এবং এসআই (নিঃ) পুলক সরকারকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়।

পিবিআইয়ের প্রধান অ্যাডিশনাল আইজিপি মোঃ মোস্তফা কামালের সার্বিক তত্ত্বাবধান এবং পিবিআই নারায়ণগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার মো. মোস্তফা কামাল রাশেদ (বিপিএম)-এর প্রত্যক্ষ দিকনির্দেশনায় একটি বিশেষ তদন্ত দল গঠন করা হয়।
সিসিটিভি ও প্রযুক্তিনির্ভর অভিযানে গ্রেফতার : তথ্যপ্রযুক্তি, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গত ২৩ জানুয়ারি, বিকেল আনুমানিক ৫টা ৩০ মিনিটে সোনারগাঁও, আড়াইহাজার ও রূপগঞ্জ এলাকায় একযোগে অভিযান চালিয়ে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত দুই আসামি—মোঃ সুজন মিয়া (৩৩) ও মোঃ শফিকুল ইসলাম হীরা (৩৯) —কে গ্রেফতার করা হয়।
তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অটোরিকশা ক্রয়-বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িত আরও তিনজন— মোঃ দুলাল মিয়া (৪৫), মোঃ আব্দুর রহিম মিয়া (৫৫) ও মোঃ আবুল কাশেম (৪০)—কে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তীতে তাদের হেফাজত থেকে নিহতের ছিনতাইকৃত অটোরিকশা উদ্ধার করা হয়।
পূর্বপরিকল্পিত ছিনতাইয়ের ভয়ংকর ছক : প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, আর্থিক সংকটের কারণে সুজন ও শফিকুল ইসলাম হীরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ায় সোহেলকে টার্গেট করে।
গত ১৯ জানুয়ারি বিকেলে তারা নানাখীবাজার থেকে আনন্দবাজার যাওয়ার কথা বলে অটোরিকশা ভাড়া নেয়। পরে কৌশলে ভিকটিমকে অতিরিক্ত মাত্রায় কোমল পানীয় ও কাশির সিরাপ মিশ্রিত পানীয় পান করায় এবং সন্ধ্যার পর মুছারচরের নির্জন এলাকায় নিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে। এরপর লাশ ফেলে রেখে অটোরিকশা নিয়ে পালিয়ে যায় এবং সেটি বিভিন্ন হাত বদলের মাধ্যমে বিক্রি করে।
আদালতে স্বীকারোক্তি, তদন্ত চলমান : গ্রেফতারকৃত পাঁচ আসামিকে আদালতে হাজির করা হলে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত সুজন ও শফিকুল ইসলাম হীরা ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন। অপর তিন আসামির তিন দিনের পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
পিবিআইয়ের দক্ষতায় জনমনে আস্থা : মাত্র চার দিনের মধ্যে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন, ঘাতক গ্রেফতার এবং ছিনতাইকৃত অটোরিকশা উদ্ধার—সবকিছুই পিবিআই নারায়ণগঞ্জের দক্ষতা, প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত ও পেশাদারিত্বের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই সাফল্যে এলাকাবাসীর মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে এবং পিবিআইয়ের প্রতি জনআস্থা আরও সুদৃঢ় হয়েছে।
