
নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশের একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে ভয়াবহ দুর্নীতি ও অনিয়মের চিত্র উন্মোচন করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

কাজ না করেই বিল উত্তোলন, ঘুস বাণিজ্যে অবৈধ সম্পদের পাহাড়, রাষ্ট্রীয় তেল গায়েব, হাসপাতালের খাবারে প্রতারণা এবং স্কুল ভবনে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগে একযোগে একাধিক এনফোর্সমেন্ট অভিযান চালিয়েছে সংস্থাটি। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর বিরুদ্ধে গুরুতর দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে বলে জানিয়েছে দুদক সূত্র।
এলজিইডিতে ‘কাজ নেই, বিল আছে’—অর্থ আত্মসাতের ভয়াবহ চিত্র : স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-তে কাজ না করেই বিল উত্তোলনের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ এবং ঘুস বাণিজ্যে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে প্রধান কার্যালয় থেকে দুদকের বিশেষ টিম অভিযান চালায়। অভিযানে সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর কর্মকালীন সময়ে সার্ভেয়ার থেকে উপসহকারী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি এবং ১,১২৫ জন আউটসোর্সিং জনবল নিয়োগ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি জব্দ করা হয়েছে।

দুদক সূত্র জানিয়েছে—এই নিয়োগ ও পদোন্নতির আড়ালে বিপুল অঙ্কের ঘুস লেনদেন এবং প্রকল্পের অর্থ লোপাটের প্রাথমিক আলামত পাওয়া গেছে। নথি বিশ্লেষণ শেষে কমিশনে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।

রাষ্ট্রীয় তেল গায়েব! ইস্টার্ন রিফাইনারিতে প্রায় ১৪ কোটি টাকার ক্রুড অয়েল উধাও : অন্যদিকে চট্টগ্রামে ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসিতে ক্রুড অয়েল খালাসের সময় প্রায় পৌনে ১৪ কোটি টাকার তেল গায়েব হওয়ার অভিযোগে দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন ও ইস্টার্ন রিফাইনারি কার্যালয়ে অভিযান চালায়।
সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আগত ‘নরডিক স্কিয়ার’ ও ‘নরডিক ফ্রিডম’ জাহাজ থেকে তেল খালাসের সময় স্বাভাবিক ওশান লস বাদ দিয়ে যে পরিমাণ তেল কম পাওয়া গেছে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দেয়। দুদক টিম তেল পরিমাপ, যৌথ সার্ভে রিপোর্টসহ গুরুত্বপূর্ণ নথি সংগ্রহ করেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে—এই ‘শর্ট লেন্ডিং’-এর আড়ালে সংঘবদ্ধ তেল চুরির বড় সিন্ডিকেট সক্রিয়।
হাসপাতালে ডাক্তার নেই, রোগীর মাংস গায়েব ! মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অভিযান চালিয়ে দুদক দেখতে পায়—৩১ শয্যার হাসপাতাল চলছে মাত্র ১৯ শয্যায়। তিনজন চিকিৎসক দীর্ঘদিন অনুমোদিতভাবে কর্মস্থলে অনুপস্থিত।
রোগীদের খাবারের চার্টে মাংস থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে নিম্নমানের মাছ পরিবেশন করা হচ্ছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে খাবার সরবরাহে অনিয়মের অভিযোগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ—চিকিৎসা সেবায় চরম অব্যবস্থাপনার পেছনেও রয়েছে দুর্নীতির শক্ত বলয়।
স্কুল ভবনে নিম্নমানের ইট—শিক্ষা অবকাঠামোয় লুটপাট : চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় একটি স্কুল ভবন নির্মাণে নিম্নমানের ইট ও নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকল্পে অভিযান চালায় দুদক।
পরিদর্শনে স্থানীয় জনগণ প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানায়। দুদক টিম নমুনা সংগ্রহ করেছে। পরীক্ষায় নিম্নমান প্রমাণিত হলে ঠিকাদার ও প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছে কমিশন।
একই চিত্র, একই কাহিনি—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির শিকড় গভীর
এলজিইডি, ইস্টার্ন রিফাইনারি, হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর—চারটি ভিন্ন খাত, কিন্তু দুর্নীতির ধরন একই: কাজ না করেই বিল, নিয়োগে ঘুস বাণিজ্যের বিস্তার অভিযোগ।
রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ, সেবায় প্রতারণা এবং নির্মাণে নিম্নমানের উপকরণের ব্যাবহার। দুদক জানিয়েছে, সংগৃহীত সব নথি ও নমুনা বিশ্লেষণ শেষে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশসহ পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন কমিশনে দাখিল করা হবে।
জনমনে প্রশ্ন : রাষ্ট্রীয় অর্থ ও জনগণের অধিকার লুটপাটের এই উৎসব বন্ধ হবে কবে? দুর্নীতিবাজদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে এসব অভিযান কি শুধুই আনুষ্ঠানিকতা হয়ে থাকবে?
দেশবাসী এখন তাকিয়ে—দুদক কি এবার সত্যিই বড় দুর্নীতির রাঘববোয়ালদের ধরতে পারবে?
