
মুন্সিগঞ্জ প্রতিনিধি :৷ মানুষের কষ্টার্জিত সঞ্চয়, বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এনজিও খাত, আর এক অসহায় নারীর ভবিষ্যৎ—সবকিছু একসাথে কাঁপিয়ে দিয়েছে ৬ লাখ ৫ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ। অভিযুক্ত: মুন্সিগঞ্জের সিপাহিপাড়া (কাঠালতলা) শাখার সাবেক ম্যানেজার মোঃ মনিরুজ্জামান (৫৩)। বর্তমানে তিনি পলাতক। আদালতে মামলা, গ্রেফতারি পরোয়ানা, সম্পত্তি জব্দের সম্ভাবনা—সব মিলিয়ে আইনের জালে ক্রমেই সঙ্কুচিত হচ্ছে তার পরিসর।

প্রতারণার অভিযোগ : বিশ্বাসের ফাঁদ, লভ্যাংশের প্রলোভন
অভিযোগ অনুযায়ী, মনিরুজ্জামান দীর্ঘ সময় ধরে ভুক্তভোগী নাছিমা আক্তারের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন। প্রতিষ্ঠানের নাম ও ভাবমূর্তি ব্যবহার করে উচ্চ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে তিনি একাধিক কিস্তিতে মোট ৬,০৫,০০০ টাকা গ্রহণ করেন।
পরবর্তীতে নাছিমা আক্তার অফিসে যোগাযোগ করলে জানানো হয়—তার নামে কোনো অর্থ জমা হয়নি। তখনই সামনে আসে অভিযোগিত আত্মসাতের বিষয়টি।

ভুক্তভোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, এটি শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়—এটি ছিল তার জীবনের সঞ্চয় ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার উপর আঘাত।

আইনি প্রক্রিয়া: কোন ধারায় বিচার ? মুন্সিগঞ্জ জেলা দায়রা জজ আদালতে সি.আর মামলা নং ১৭৮/২৫ দায়ের হয়েছে। পাশাপাশি, Negotiable Instruments Act, 1881–এর ১৩৮ ধারা অনুযায়ী পৃথক মামলা হয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতে প্রযোজ্য আইনি ধারা , দণ্ডবিধি ৪০৬ ধারা (Criminal Breach of Trust): বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদণ্ড। দণ্ডবিধি ৪২০ ধারা (Cheating): প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানা। এন.আই অ্যাক্ট ১৩৮ ধারা: চেক সংক্রান্ত আর্থিক অঙ্গীকার ভঙ্গের ক্ষেত্রে ১ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড (আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সীমা পর্যন্ত)। আদালত প্রয়োজন মনে করলে অভিযুক্তের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি জব্দ (ক্রোক) করে ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দিতে পারেন—এমন নজিরও রয়েছে।
তদারকি ও প্রশাসনিক দিক : বাংলাদেশে এনজিও কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে এনজিও বিষয়ক ব্যুরো। কোনো প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ আর্থিক অনিয়ম প্রমাণিত হলে তা প্রশাসনিক তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপের আওতায় আসতে পারে। প্রশিকা কর্তৃপক্ষ অভিযুক্তকে বরখাস্ত করেছে বলে জানা গেছে। চূড়ান্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান সংক্রান্ত বিষয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিধি অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।
পলাতক আসামি ও গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি : মনিরুজ্জামানের স্থায়ী ঠিকানা- গ্রাম ভায়লা, থানা ও জেলা পটুয়াখালী। তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা (ওয়ারেন্ট) নং ৭৭৪/২৫ জারি হয়েছে বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে খুঁজছে। ভুক্তভোগী পরিবার অভিযুক্তকে গ্রেফতারে সহায়তার জন্য নগদ পুরস্কার ঘোষণার কথাও জানিয়েছে।
জনমনে প্রশ্ন: এনজিও খাতে আস্থা কতটা সুরক্ষিত ? এই ঘটনা স্থানীয়ভাবে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এনজিও খাতে স্বচ্ছতা, তদারকি ও আর্থিক নিরাপত্তা জোরদারের দাবি উঠছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন—ব্যক্তিগত লেনদেনের ক্ষেত্রে লিখিত প্রমাণ, অফিসিয়াল রসিদ ও ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার না করলে ঝুঁকি বাড়ে।
শেষ কথা : অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তি অনিবার্য। আর যদি অভিযোগ অসত্য হয়, তবে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়াই তা পরিষ্কার করবে। একটি বিষয় স্পষ্ট—আমানত ও বিশ্বাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যে কোনো অনিয়ম সমাজে গভীর প্রভাব ফেলে। তাই আবেগ নয়, প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতেই হোক চূড়ান্ত বিচার।
