মধ্য বাড্ডায় ‘নকশা-খেকো’ বহুতল ভবন : নোটিশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি, আইনের চোখে ধুলো !

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী

নিজস্ব প্রতিবেদক :  রাজধানীর বুকে আরেকটি ‘বিতর্কিত বহুতল ভবনের সন্ধান মিলেছে অভিযোগের পাহাড় থাকা সত্বেও  অনুমোদিত নকশা বিকৃত, পাশের জমি দখল, একের পর এক নোটিশ অমান্য করার অভিযোগ উঠেছে  মধ্য বাড্ডার ট-৬৬/২ নম্বর বাড়ির মালিকের বিরুদ্ধে ।


বিজ্ঞাপন

অভিযোগের পাহাড় : অনুমোদিত নকশা বিকৃত, পাশের জমি দখল, একের পর এক নোটিশ অমান্য—সব মিলিয়ে যেন আইনের সঙ্গে প্রকাশ্য তামাশা ! সূত্র জানায়, মো. শামিম আহম্মেদ, মো. সেলিম আহম্মেদ ও সোহেল নামের তিন ব্যক্তি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এর অনুমোদন নিয়ে বহুতল নির্মাণ শুরু করেন।

কিন্তু পরিদর্শনে গিয়ে রাজউকের কর্মকর্তারা দেখতে পান—- কাগজে-কলমে যে নকশা, বাস্তবে তার সঙ্গে বিস্তর গরমিল। কাঠামো, নির্মাণসামগ্রী ও পরিকল্পনায় গুরুতর অসঙ্গতি ধরা পড়ায় সাময়িকভাবে কাজ বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়।


বিজ্ঞাপন

নকশা এক, দখল আরেক  !  রাজউক ০৭৩২ অযুতাংশ জমির ওপর নকশার ছাড়পত্র দিলেও অভিযোগ—ভবন মালিকরা ০৮৩২ অযুতাংশ জমি ‘অধিগ্রহণ’ করে নির্মাণ চালান। অর্থাৎ অনুমোদনের চেয়ে বেশি জমিতে দখল ও নির্মাণ! পাশের বাড়ির মালিক জাহিদুর রহমান খান লিখিত অভিযোগ করলে রাজউক নোটিশ জারি করে এবং বাড্ডা থানাকে কাজ বন্ধে অবহিত করে।


বিজ্ঞাপন

কিন্তু এখানেই প্রশ্ন—নোটিশ কি কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ ? স্থানীয়দের দাবি, “দায়সারা নোটিশ দিয়ে রাজউক দায় ঝেড়েছে, আর মালিকপক্ষ গোপনে চালিয়েছে কাজ।” একাধিক নোটিশ সত্ত্বেও রাতের আঁধারে বা ফাঁক-ফোকরে চলেছে নির্মাণ। আইনের চোখে ধুলো দিয়ে শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে গেছে বহুতলটি!

৪০% খোলা জায়গা উধাও, পার্কিং দখল করে বাণিজ্য  ! বহুতল ভবনে ৪০ শতাংশ খোলা জায়গা রাখার বিধান থাকলেও তা মানা হয়নি বলে অভিযোগ। নির্মাণস্থলে অনুমোদনপত্র প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও পরিদর্শনে তা দেখাতে পারেননি মালিকরা। ছিল না কোনো তথ্যসম্বলিত সাইনবোর্ডও।

অভিযোগ আরও গুরুতর—লিফটের নির্ধারিত স্পেস না রেখে সরু সিঁড়ি নির্মাণ, গ্রাউন্ড ফ্লোরের পার্কিং স্পেসকে কমার্শিয়াল জোনে রূপান্তর, অগ্নিনিরাপত্তা বিধি উপেক্ষা। রাজধানীতে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি যখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু, তখন এ ধরনের নির্মাণকে নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন “সময়বোমা”।

হাইকোর্টে রিট: স্থগিতাদেশের সুযোগে ‘দৌড় ’ !  চূড়ান্ত নোটিশের পর মালিকপক্ষ বাংলাদেশ হাইকোর্ট-এ রিট দায়ের করেন। প্রাথমিকভাবে চার সপ্তাহের জন্য কার্যক্রম স্থগিত করে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় আদালত। পরে ছয় মাস সময় বাড়ানো হলে দ্রুতগতিতে নির্মাণকাজ শেষ করা হয় বলে অভিযোগ।

রিটের কার্যক্রম শেষ হলেও এখনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি রাজউক—এমনই দাবি ভুক্তভোগীদের। আইনি লড়াইয়ের আড়ালে কি সময়ক্ষেপণ করে ভবন ‘ফাইনাল’ করার কৌশল নেওয়া হয়েছিল? প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।

ঘুষের গুঞ্জন: কার ইশারায় রিট ?  অভিযোগ উঠেছে, রাজউকের এক সাবেক অথরাইজড অফিসার প্রবাসী মালিকদের কাছ থেকে মোটা অংকের ঘুষ নিয়ে রিট করার পরামর্শ দেন। বর্তমান অথরাইজড অফিসার ইমরুল হাসানের বিরুদ্ধেও রিটে উৎসাহ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

জোন-৪/১-এর সাবেক পরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, “অনিয়মের জন্য অ্যাকশন নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নির্মাণকাজ বন্ধ করা হয়েছে এবং চূড়ান্ত নোটিশ জারি করা হয়েছে। আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন—তাহলে কার্যক্রম থমকে গেল কেন? তার পোস্টিংয়ের পর কেন স্তব্ধ সব পদক্ষেপ?

দুদকে যাওয়ার হুঁশিয়ারি :  ভুক্তভোগীদের দাবি, রাজউক চেয়ারম্যান দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে তারা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এ অভিযোগ করবেন। তাদের ভাষায়, “এটা শুধু একটি ভবনের প্রশ্ন নয়—এটা আইনের শাসন ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতার প্রশ্ন।”

মধ্য বাড্ডার এই বহুতল এখন কেবল ইট-সিমেন্টের কাঠামো নয়—এটি হয়ে উঠেছে নগর পরিকল্পনার দুর্বলতা, প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা এবং প্রভাব-প্রতিপত্তির কাছে আইনের পরাজয়ের প্রতীক। রাজধানীর বুকে আর কত ‘নকশা-খেকো’ ভবন মাথা তুলবে?

পরবর্তী পর্বে থাকছে : জোন-৬/১-এর নোটিশ ‘গায়েব’ হওয়ার পর মিটার বাণিজ্যের চাঞ্চল্যকর তথ্য—কোন অথরাইজড অফিসার ও দুই পরিদর্শকের ভূমিকা, মিটার প্রতি কত টাকা লেনদেন—সবিস্তারে। চোখ রাখুন আমাদের অনুসন্ধানী ধারাবাহিকে।

👁️ 65 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *