যুদ্ধ করে মানুষ হত্যা করা কোনো পেশা হতে পারে না : সুফি সাগর সামস্

Uncategorized আইন ও আদালত আন্তর্জাতিক জাতীয় বিশেষ প্রতিবেদন রাজনীতি

সুফি সাগর সামস  :  যুদ্ধবাজ শাসকদের দখলদারিত্বের মানসিকতা আদিম। জঙ্গলে শক্তিশালী পশুরা দর্বল পশুদের ভক্ষণ করে! সমুদ্রে সবল প্রাণীরা দুর্বল প্রাণীদের খেয়ে ফেলে। একইভাবে যুদ্ধবাজ শাসকরা পশু চরিত্রে চরিত্রবান। পার্থক্য হলো, সবল পশুরা ক্ষুধা পেলে দুর্বল পশুর রক্ত পান করে আর যুদ্ধবাজ শাসকরা ক্ষুধার জন্য দুর্বল মানুষের রক্তপান করে না। তারা তাদের ক্ষমতা ও দাম্ভিকতার জন্য দুর্বল মানুষের জীবন সংহার করে। তারা দুর্বল রাষ্ট্রের মানুষের অর্থসম্পদ জোরপূর্বক কেড়ে নিতে ভালোবাসে।


বিজ্ঞাপন

এই কেড়ে নেয়ার জন্য তারা যুদ্ধ লাগিয়ে দেয়। এক রাষ্ট্রের শাসক অন্য রাষ্ট্রকে সশস্ত্র আক্রমণ করে। চালায় নৃশংস হত্যা আর ধ্বংসযজ্ঞ। মানুষের রক্তের বন্যা বইয়ে দেয়। রক্তাক্ত মানুষের লাশ শকুনও শিয়াল-কুকুরে খায়। যারা বেঁচে থাকেন তারা হন পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের শরনার্থী। এই নৃশংস যুদ্ধে ব্যবহার করা হয় তরুণ যুবক পবিত্র সৈনিকদের। অর্থাৎ জঘন্য অপবিত্র অপকর্মে পবিত্র সৈনিকদের ব্যবহার করা হয়। কি নির্মম নিষ্ঠুর যুদ্ধ! এরপর দখলকৃত এই রক্তাক্ত ভূমি শাসকদের দোষর শোষক গোষ্ঠীকে লীজের নামে দখল দেয়া হয়। এই দখলের মাধ্যমে শাসক-শোষকরা সম্মিলিতভাবে এই রক্তাক্ত ভূমি ভোগ করে। পরাজিত দেশটির শাসকরা বিদেশে পলায়ন করে। বেঁচে থাকা সৈনিকরা বন্দী হয়ে জেলে পচে মরে। সাধারণ মানুষ দখলদার শাসকের দাসে পরিণত হয়।

যুদ্ধ হলো, দুটি বা একাধিক দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে সশস্ত্র সংঘর্ষ। যুদ্ধে সামরিক বাহিনীর সশস্ত্র আক্রমণে চরম হিংস্রতা, আগ্রাসন, ধ্বংসলীলা এবং বহুসংখ্যক মানুষের মৃত্যুর বিভিষিকা সৃষ্টি হয়। খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০ অব্দ থেকে বিংশ শতাব্দীর শেষের মধ্যে ১৪ হাজার ৫০০ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে ৩.৫ বিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হয়। মানবজাতির ঐতিহাসিক ও প্রাগৈতিহাসিক সময়কালীন যুদ্ধে সর্বমোট ১ হাজার ৬৪ কোটি মানুষ নিহত হয়। বিংশ শতাব্দীতে সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রায় ১৬ লক্ষ ৮০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।


বিজ্ঞাপন

এই সংক্রামক রোগ যুদ্ধের কারণেই সৃষ্টি হয়। যুদ্ধের ক্ষতিকর প্রভাব সুদূরপ্রসারী হয়। যুদ্ধ মানেই মানবতার পরাজয়। যুদ্ধে পেশাদার সৈনিক ও নিরাপরাধ মানুষের মৃত্যু হয়। নারী নির্যাতন ও শিশু মৃত্যুর ঘটনা বিশ্ব বিবেককে স্তম্ভিত করে দেয়। যুদ্ধের পর দুর্ভিক্ষ ও মহামারী অবধারিত হয়। কারণ, যুদ্ধে প্রাণহানির সাথে সাথে সীমাহীন সম্পদহানি বা অর্থনৈতিক ক্ষতিসাধিত হয়। খাদ্যের অভাব তীব্র আকার ধারণ করে। যুদ্ধের ফলে যুদ্ধের সাথে সংশ্লিষ্ট মানুষের মাঝে যে হিংসা-বিদ্বেষ আর সন্দেহ-অবিশ্বাসের জন্ম হয় তা আর দূর হয় না। যুগ যুগ ধরে এমনকি শতাব্দীব্যাপী এই হিংসা-বিদ্বেষ মানুষের চিন্তা-চেতনাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। সমস্ত যুদ্ধই অমানবিক, অগ্রহণযোগ্য ও অনৈতিক। যুদ্ধ মানেই ধ্বংস। যুদ্ধ মানেই নিরাপরাধ মানুষের মৃত্যু। শান্তিকামী মানুষ যুদ্ধ চায় না।


বিজ্ঞাপন

যুদ্ধ কেন সংঘটিত হয়? যুদ্ধ তখনই সংঘটিত হয় যখন দুই বা একাধিক পক্ষের মধ্যে আলাপ-আলোচনা ব্যর্থ হয়। আলাপ-আলোচনা কেন ব্যর্থ হয়? আলাপ-আলোচনা তখনই ব্যর্থ হয় যখন পক্ষগুলো তাদের স্বার্থসম্বলিত বিষয়ে একমত হতে ব্যর্থ হয়। যুদ্ধের মূল কারণ হলো, স্বার্থপরতা। এই স্বার্থ কোন শ্রেণির মানুষের? এই স্বার্থ কি যুদ্ধের সৈনিকদের কিংবা সাধারণ মানুষের? পৃথিবীর সংঘটিত কোনো যুদ্ধেই সৈনিক কিংবা সাধারণ মানুষ লাভবান হয়নি, তাদের অপূরণীয় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সর্বকালের সকল যুদ্ধে লাভবান হয়েছে, ‘শাসক ও শোষক গোষ্ঠী’।

অথচ সর্বকালে সকল যুদ্ধে হত্যার শিকার ও অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে যুদ্ধের ‘সৈনিক ও সাধারণ মানুষ’। যদি যুদ্ধের ফলে সৈনিক কিংবা সাধারণ মানুষ লাভবান হত তাহলে ১০% শাসক ও শোষক গোষ্ঠী পৃথিবীর ৯০% সম্পদের মালিক হতে পারত না। শাসক ও শোষকরা তাদের স্বার্থের উর্দ্ধে উঠতে পারে না। যদি তারা তাদের স্বার্থের উর্দ্ধে উঠতে পারত, যদি তারা উভয় দেশের মানুষকে অর্থসম্পদের চেয়ে মূল্যবান মনে করত তাহলে পৃথিবীর সমস্ত যুদ্ধ বন্ধ হয়ে যেত। যুদ্ধমুক্ত হত পৃথিবী। জীবনহানির কবল থেকে রক্ষা পেত সশস্ত্র সৈনিক ও সাধারণ মানুষ। যুদ্ধমুক্ত হলে বিশ্ব হত, স্বপ্নময় জান্নাত। যুদ্ধবাজ শাসকদের কাছে মানুষের চেয়ে অর্থসম্পদ অধিক মূল্যবান।

যুদ্ধের মূলে হলো, শাসক গোষ্ঠীর ‘ক্ষমতার লালচ’। এক দেশের শাসক নিজেকে অন্য দেশের শাসক থেকে বেশি ক্ষমতাশালী হওয়ার লালচ। এক দেশের শাসক নিজেকে অন্য দেশের শাসকের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ঘৃণ্য বাসনা। নিজেকে অন্যদের থেকে শ্রেষ্ঠজ্ঞান করা। এই ক্ষমতার লালচ আর শ্রেষ্ঠত্বের দাম্ভিকতা সাধারণ সৈনিক কিংবা সাধারণ মানুষের মধ্যে নেই। যুদ্ধ শাসক ও তাদের দোষর শোষকদের স্বার্থেই সংঘটিত হয়। শাসকরা তাদের ক্ষমতা, শ্রেষ্ঠত্ব এবং দেশের অর্থসম্পদ কুক্ষিগত করার জন্য সৈনিকদের রোবটের মত ব্যবহার করে যুদ্ধে লিপ্ত করে। যুদ্ধ লাগলে শাসকদের কোনো সমস্যা নেই। কারণ, তাদের সন্তানরা যুদ্ধ করে না।

তারা নিরাপদে রাজ প্রাসাদে অবস্থান করেন। যুদ্ধ করে প্রাণ হারায় সাধারণ মানুষ ও তাদের সৈনিক সন্তানরা। কজেই যুদ্ধ লাগানোর ক্ষেত্রে শাসকদের কোনো চিন্তা করতে হয় না। যুদ্ধ করে এক দেশ অন্য দেশের সৈনিক ও সাধারণ মানুষকে হত্যা করে জোরপূর্বক তাদের রক্তে গড়া সম্পদ ও মাতৃভূমি দখল করে নেয়। কোনো বিবেকসম্পন্ন মানুষ যুদ্ধনামক এমন জঘন্য কাজে লিপ্ত হতে পারে না। নৃশংস মানুষ হত্যা আর মানুষের আবাস ভূমি ধ্বংসের এই যুদ্ধ বন্ধ হওয়া দরকার। যুদ্ধমুক্ত পৃথিবী গড়ে তুলতে হবে। যুদ্ধমুক্ত পৃথিবী গড়ে তুলতে হলে বিশ্বের সৈনিকদের যুদ্ধ পেশা পরিত্যাগ করতে হবে। মানুষ হত্যার যুদ্ধ পরিত্যাগ করে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশ ঘটাতে হবে। যুদ্ধ করতে হবে মানুষের নিজ কু-প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে। এই কু-প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে বিজয়ী হতে পারলে নিজের মধ্যে সুপ্ত হয়ে থাকা মহাশক্তি অর্জিত হবে। এটাই মানব জীবনের চুড়ান্ত যুদ্ধ।

মানুষ সাধারণত তার ৩ থেকে ৭% মস্তিষ্ক ব্যবহার করে। স্বখ্যাত বিজ্ঞানী ড. আলবার্ট আইনস্টাইন মাত্র ১৩% মস্তিষ্ক ব্যবহার করেছিলেন। তাঁর ৮৭% মস্তিষ্ক অব্যবহৃত ছিল। বর্তমান মানুষ আইনস্টাইনের উত্তরসুরী। যদি আইনস্টাইন ১৩% মস্তিষ্ক ব্যবহার করে এত বড় বিজ্ঞানী হতে পারেন তাহলে তাঁর উত্তরসুরী বর্তমান প্রজন্ম আরও বড় বিজ্ঞানী হবেন, এটাই স্বাভাবিক। কারণ, তারা ১৩% থেকে শুরু করবেন।

সুতরাং তারা শতভাগ মস্তিষ্ক ব্যবহার করার লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধ করবেন। পৃথিবীকে জ্ঞান-বিজ্ঞানে পরিপূর্ণ করে তুলতে হবে। জল, বায়ু, আলো ও ভূমিতে রয়েছে অফুরন্ত সম্পদ। এই সম্পদ কিভাবে অর্জন করতে হবে তার তথ্য বা কোড আছে মানুষের মস্তিষ্কে। জ্ঞান-বিজ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে এই কোডগুলি অর্জন করতে হবে। এই কোডগুলি অর্জন করা সম্ভব হলে পৃথিবী হবে অফুরন্ত সম্পদের অধিকারী। কেন শাসকরা যুদ্ধ করে অন্যের সীমিত সম্পদ লুণ্ঠন করবেন? যুদ্ধে যে অর্থ বিনষ্ট হয় সেই অর্থ জ্ঞান-বিজ্ঞান অর্জনের জন্য ব্যবহার করতে হবে। সামরিক বাজেট জ্ঞান-বিজ্ঞানের বাজেটে রূপান্তর করতে হবে। বিশ্বের ক্যান্টনমেন্টগুলিকে জ্ঞান-বিজ্ঞান অর্জনের ল্যাবে পরিণত করতে হবে। যুদ্ধাস্ত্র তৈরির কারখানাগুলোকে বিজ্ঞান বিকাশের অত্যাধুনিক মেশিনারিজ তৈরির কারখানায় রূপান্তর করতে হবে। তাহলে বিশ্ব হবে, শান্তিসুখের বসুন্ধরা।

শাসকদের পাহাড়া দিতে হবে কেন? জনগণের ভয়ে তারা কঠিন নিছিদ্র নিরাপত্তার মধ্যে কেন থাকেন? তারা কি জনবিরোধী ভয়ঙ্কর ক্রিমিনাল? একজন শাসক হবেন জনগণের প্রাণপ্রিয়। জনগণ তাকে নিজেদের জীবনের চেয়ে বেশি ভালোবাসবেন। নিজের প্রাণ দিয়ে প্রিয় শাসকদের রক্ষা করবেন। যে শাসকদের জনগণ ভালোবাসে না, যে শাসকদের জনগণের ভয়ে নিছিদ্র নিরাপত্তার মধ্যে থাকতে হয় তাদের উচিৎ নয় শাসক হওয়া কিংবা জোরপূর্বক ছলেবলে শাসকের পদে আসীন থাকা।

জনবিরোধী শাসকদের জনগণের রাষ্ট্র পরিচালনার কোনো অধিকার থাকে না। কোনো অপবিত্র ক্রিমিনাল শাসকদের পাহাড়া দেয়ার জন্য পবিত্র সৈনিকদের জন্ম হয়নি। ক্রিমিনালদের পাহাড়া দেয়া পবিত্র সৈনিকদের দায়িত্ব বা পেশা হতে পারে না। পবিত্র সৈনিকদের পাহাড়ায় ক্রিমিনাল শাসকরা জনগণের বিরুদ্ধে শোষণ-শাসন চালাবে, এই প্রথা পরিসমাপ্তির সময় পরিপক্ক হয়েছে।

শাসকদের কিংবা উর্দ্ধতন অফিসারদের ন্যায় আদেশ পালন করা যেমন সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ বাহিনী এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব ও কর্তব্য, তেমনি অন্যায় আদেশ বর্জন করাও দায়িত্ব ও কর্তব্য। ন্যায়কে ধারণ করা অন্যায় বর্জন করা সশস্ত্র বাহিনীর সৈনিক, পুলিশ বাহিনীর অফিসার, সিপাহি এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগের প্রধান শর্ত। বড়-ছোট সকল পদের সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্ব-স্ব পদে দায়িত্ব পালনের স্বাধীনতা রয়েছে। সকলেই সকলের সহযোগী, কেউ কারো দাস নয়। প্রত্যেকেটি মানুষের বিবেক-বিবেচনা আছে। কোনো শাসকের উচিৎ নয় তার সহযোগীদের ওপর বিবেকবর্জিত আদেশ জারি করা। নিঃসন্দেহে সশস্ত্র যুদ্ধ বিবেকবর্জিত ঘৃণ্য আদেশ।

ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে জর্জরিত সুদান। খাদ্য সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। খাবার নেই। পানি নেই। কিছু খাবার মজুত থাকলেও তা ক্রয় করার টাকা নেই। সর্বোচ্চ সংকটে পতিত হয়েছে দেশটি। কমে গেছে ত্রাণ সরবরাহ। চরম সীমায় পৌঁছে গেছে দুর্ভিক্ষ। ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে না পেরে মানুষ সবজির ছাল ও পশুর মত ঘাস চিবিয়ে খায়। খাবারের বিনিময়ে সেনাবাহিনী ক্ষুধার্ত নারীদের ধর্ষণ করে।

জল পেতে হলেও ধর্ষণের শিকার হতে হয়। সুদানের ওমদুরমান শহর থেকে পালিয়ে আসা নারীরা বলেন, খাবার পাওয়ার শর্তে সেনাদের সঙ্গে যৌন সংসর্গ করতে হয়। বেঁচে থাকার জন্য তাদের অন্যকোন পথ নেই। ধর্ষণের শিকার এক নারী বলেন, ‘আমার বাবা-মা অসুস্থ। খাবারের জন্য মেয়েকে পাঠাইনি। আমি নিজে সেনাদের কাছে গিয়েছি। খাবার জোগারের ওটাই একমাত্র পথ ছিল’। তিনি একটি মাংস প্রক্রিয়াকরণ কারখানায় ধর্ষণের শিকার হন।

পালিয়ে আসা নারীরা বলেন, আরএসএফের দখলে থাকা এলাকায় তারা বার বার ধর্ষণের শিকার হন। যে বাড়ি থেকে তারা জীবন বাঁচাতে পালিয়ে এসেছিলেন, সেখানে আবার ফিরতে চাইলে বা সেখান থেকে কিছু আনতে গেলেও তাদের ধর্ষণের শিকার হতে হয়। একজন নারী বলেন, ‘রান্নার জিনিসপত্র আনতে গিয়েছিলাম নিজের বাড়িতে।

এজন্য তাকে যৌন নিপীড়নের শিকার হতে হয়েছে’। ওমদুরমান শহরের এক বাসিন্দা বলেন, ‘পরিত্যক্ত বাড়িগুলিতে সেনারা নারীদের নিয়ে আসেন। এই বাড়িতে নারীদের পাশবিক অত্যাচার করা হয়। পরিত্যক্ত বাড়িগুলি থেকে তিনি প্রায়ই নারীদের আর্তনাদ শুনতে পান’। ২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে সুদানে গৃহযুদ্ধ চলছে। এরপর থেকে সুদানে নারীরা বার বার সেনাদের দ্বারা ধর্ষিত হন। সুদানে গৃহযুদ্ধে দেড় লাখ মানুষের মৃত্যু এবং এক কোটি ১০ লাখ মানুষ ঘরছাড়া হয়েছে। সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান এবং আধাসামরিক বাহিনী র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সের প্রধান জেনারেল মোহাম্মদ হামদান দাগালো’র মধ্যকার ক্ষমতার লড়াই সুধানকে দুর্ভিক্ষের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।

২০১৭ সালে দক্ষিণ সুদানের দুর্ভিক্ষে সাহায্য বন্ধ করে বিদ্রোহীদের সমর্থনকারীদের অনাহারে রাখা হয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, সরকার বিরোধীদের সমর্থন করার অভিযোগে সেনাবাহিনীর একটি শিপিং কনটেইনারে শ্বাসরোধ করে ৬০ জনেরও বেশি সাধারণ মানুষকে হত্যা করেছে। সরকারের সুদান পিপলস লিবারেশন আর্মি বিদ্রোহ বিরোধী অভিযানে বেশ কয়েকটি গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়, শত শত নারী ও শিশুকে ধর্ষণ করে এবং অসংখ্য সাধারণ মানুষকে হত্যা করে। নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা জানান, আঙ্গুলের নখ ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। শিশুদের উপর ফোঁটা প্লাস্টিকের ব্যাগ পোড়ানো হয়েছে। গ্রামবাসীদের কুঁড়েঘরে মানুষ জীবন্ত পুড়িয়ে দিয়েছে। তথ্য সূত্র : সংবাদ সংস্থা দ্য গার্ডিয়ান ও উইকিপিডিয়া।

প্রথম মহাযুদ্ধে প্রায় ৩৩৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অপব্যয় হয়। ৯০ লক্ষ সৈনিক এবং ১ কোটি ২০ লক্ষ সাধারণ মানুষ নিহত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রায় এক কোটি সৈনিক এবং ২ কোটি ১০ লক্ষ সাধারণ মানুষ আহত হয়। এদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ছিল লক্ষাধিক সৈনিক। যুদ্ধের ফলে, ইনফ্লুয়েঞ্জায় ৫ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়। সাধারণ জনগণের উপর হিটলার গণহত্যা চালায়। পারমাণবিক আক্রমণ করা হয়।

এই যুদ্ধে প্রায় সাড়ে ৮ কোটি মানুষ নিহত হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মেশিনগানের মত আধুনিক অস্ত্র, টুকরো টুকরো কামান এবং বিষাক্ত গ্যাস প্রতিটি দেশের সৈন্যদের আহত করে এবং তাদের পরিবারের কাছে ফেরত পাঠানো হয় ছিন্নভিন্ন এবং বিকৃত হয়ে যাওয়া লাশ। অসংখ্য সৈনিক শরীরে ক্ষতচিহ্ন নিয়েছিল, যাতে তাদের জীবন চালিয়ে নিতে পারে। কেউ কেউ হাত-পা হারিয়ে কাজে ফিরতে পারেনি। অনেকের মুখ ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল। অসংখ্য সৈনিকের চেহারা পুনর্গঠন করতে হয়েছিল। ফ্রান্সে এই সৈনিকরা মঁবঁষবং পধংংল্কবং নামে পরিচিত ছিল, অর্থাৎ ভাঙ্গা মুখের পুরুষ। অন্যান্য সৈন্যদের কোনো শারীরিক ক্ষত ছিল না, কিন্তু তারা যুদ্ধে যা দেখেছিল তাতে তারা মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়েছিল। এই সৈনিকরা ভিক্ষাবৃত্তি করে বেঁচে ছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অসংখ্য মানুষ শরণার্থী হয়। শুধু ইউরোপেই ৪০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ শরণার্থী ছিল। জাতিসংঘ ত্রাণ ও পুণর্বাসন প্রশাসনের সহায়তায় ৭ মিলিয়ন মানুষ নিজ বাসভূমিতে ফিরে যায়। উদ্বাস্তু এক মিলিয়ন মানুষ নিজ ভূমিতে ফিরে যেতে অস্বীকৃতি জানায়। প্রায় পাঁচ মিলিয়ন জার্মান সাধারণ মানুষ রেড আর্মির কবল থেকে বাঁচার জন্য ম্যাকলেনবার্গ, ব্রান্ডেনবার্গ এবং স্যাক্সনিতে উদ্বাস্তু হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিল।

হাজার হাজার জার্মানের সাধারণ মানুষ সোভিয়েত ইউনিয়নে দাসত্বের জন্য পাঠানো হয়। এই শরণার্থী স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় ১৫ মিলিয়ন জার্মানির সাধারণ মানুষ অন্তর্ভুক্ত ছিল। এছাড়া দুই মিলিয়নেরও অধিক জার্মান সাধারণ মানুষ যুদ্ধের সময় বিতাড়িত হয়ে প্রাণ হারায়। এই মানবতাবিরোধী অপকর্মের জন্য যুদ্ধবাজ শাসকরাই দায়ী। তাদের স্বার্থেই এসব যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রায় এক কোটি শরণার্থী বাংলাদেশ থেকে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। মহামারি ও অপুষ্টিতে ভুগে মৃত্যুবরণ করেছিল অসংখ্য শরণার্থী। শাসক গোষ্ঠীর নির্দেশে পাকিস্তানি সৈনিকরা ৩০ লক্ষ মানুষকে হত্যা এবং দুই লক্ষাধিক মা-বোনকে ধর্ষণ করেছিল। শাসকরা বিগত তিন দশকে মিয়ানমার থেকে ২২ লাখ রোহিঙ্গাকে বাস্তুচ্যুত করেছে।

অধিকাংশ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এসময় এক রোহিঙ্গা মা নিহত হন। কিন্তু তার দুধের শিশুটি বেঁচে যায়। এই শিশু মৃত মায়ের দুধ পান করছিল! দুধ না পেয়ে সে চিৎকার করে কাঁদছিল। সে ভাবছিল তার মা ঘুমিয়ে আছে। কান্না করে সে তার মাকে জাগানোর চেষ্টা করছিল! মিয়ানমারের শাসকরা এই অপকর্মে সৈনিকদের ব্যবহার করেছিল।

ভিয়েতনাম যুদ্ধে প্রায় ৩ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ নিহত হয়। এর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি ছিল ভিয়েতনামী সাধারণ মানুষ। সমর বিশেষজ্ঞ কার্ল ভন ক্লজবীৎস বলেন, ‘যুদ্ধ আর কিছুই নয়, যুদ্ধ হলো জবরদস্তির মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা। যুদ্ধ এবং আগ্রাসন দুটোই রাজনীতির একটা হাতিয়ার। যুদ্ধ হচ্ছে মৃত্যু ও ধ্বংসের উন্মত্ত লীলা’। রনাঙ্গনের একজন ডাক্তার বলেন, ইরাক-ইরান যুদ্ধে হত্যা করা হয়েছে অসংখ্য নারী, শিশু ও সাধারণ মানুষ। ইরাকের তেল সমৃদ্ধ বসরার দখল নিয়ে লড়াইয়ে ১০ হাজার ইরাকির মৃত্যু হয়।

অন্যদিকে মরু ভূমিতে ৫০ হাজার ইরানির মৃতদেহ পচে পড়েছিল। তিন দিনে প্রায় দেড় হাজার সৈনিক নিহত হয়। রক্তে ভেজা আহত সৈন্যরা যন্ত্রণায় চিৎকার করত। ভয়ানক দৃশ্য সব। এখনও সেই বারুদ মেশানো ধোঁয়ার গন্ধ পাই। কম-বেশি ১০ লাখ ইরাকি নিহত হয়। ১৯৮৮ সালের ২০ অগাস্ট আট বছর স্থায়ী ইরাক-ইরান যুদ্ধের সমাপ্তি হয়।

যুদ্ধ করে মানুষ হত্যা এবং দেশ ধ্বংস করা কোনো সভ্য মানুষের পেশা হতে পারে না। যুদ্ধ করে মানুষ হত্যা করার মধ্যে যুদ্ধের সৈনিক কিংবা সাধারণ মানুষের কোনো স্বার্থ নেই। সশস্ত্র বাহিনীর সৈনিকদের জাতীয়তাবাদী ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব বিষয়ে ইমোশনাললি ব্লাকমেইল করে শাসকরা যুদ্ধের নামে নৃশংসভাবে মানুষ হত্যা এবং মানুষের রক্তে গড়া মাতৃভূমি ধ্বংস করে। যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বিজয়ী রাষ্ট্র পরাজিত রাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের অর্থসম্পদ ও ভূখন্ড দখল করে নেয়।

পরাজিত শাসক ও শোষক গোষ্ঠী যুদ্ধের পূর্বেই তাদের অর্থসম্পদ বিদেশে পাচার করে দেয়। আত্মসমর্পণের পূর্বে তারা তাদের অর্থ পাচার করা রাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয়লাভ করে। কিন্তু নির্বচারে হত্যার শিকার হয় সাধারণ সৈনিকরা। তাদের মধ্যে যারা প্রাণে বেঁচে যায় তারা চরম লাঞ্চনার মধ্য দিয়ে জেলখানায় পচে মরে। চরম দুর্ভিক্ষে নিপতিত হয় সাধারণ মানুষ। তাদেরকে ত্রাণশিবিরে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় খাবারের আশায়। যদি ত্রাণ শিবির থেকে খাবার দেয়া হয় তাহলে খেতে পায়; অন্যথায়, অভুক্ত থাকতে হয়। এর মধ্যেই নারীদের ওপর চলে পাশবিক নিপীড়ন। শিশুরা পড়ে চরম বিপাকে। তাদের বেঁচে থাকা আর মরে যাওয়া একই সমান হয়। সুতরাং যুদ্ধ করে মানুষ হত্যা করা মানুষের কোনো পেশা হতে পারে না।

মানুষকে সমাজ ও সংসারের সৎকর্ম করতে হবে। যুদ্ধ করে মানুষ হত্যা করা ছাড়াও পৃথিবীতে অনেক সৎকর্ম আছে; যা করে সৈনিকরা যিবিকা নির্বাহ করতে পারেন। সৈনিকদের পিতা-মাতা সৈনিকদের যুদ্ধ করে মানুষ হত্যা করার জন্য জন্ম দেয়নি। মানুষ হত্যা করা মহাপাপ। এই হত্যা যেভাবেই করা হোক না কেন। এই পাপকার্য কোনো মানুষের পেশা হতে পারে না। মধ্যযুগে রাজা-বাদশাদের আমলে শাসকরা মানুষকে তাদের গোলাম করে রাখার জন্য, জোর করে তাদের থেকে খাজনা আদায় করার জন্য এবং জোর করে প্রজা বানিয়ে রাখার জন্য সৈন্যবাহিনী বা পেটোয়া বাহিনী তৈরি করেছিল। সেই ধারাবাহিকতা বর্তমানেও অব্যাহত রয়েছে। আদিম যুগের সেই গোলামী প্রথা কিংবা রাজা-প্রজা ব্যবস্থাপনা বর্তমান জ্ঞান-বিজ্ঞানময় আধুনিক মানবসভ্যতার যুগে মানবসভ্যতার কলঙ্ক। এই কলঙ্ক মোচন হওয়া দরকার।

লেখক  :  সুফি সাগর সামস্ মানবিক বিশ্বব্যবস্থার রূপকার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।

👁️ 28 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *