
জসিম উদ্দিন : রাষ্ট্র মেরামত বড় কঠিন। এটা কোনো সাধারণ কাজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন সততা, মানবিক মূল্যবোধ ও দেশপ্রেম। এসবের ভেতরে নিহিত আছে জবাবদিহিসহ রাষ্ট্রের কল্যাণ ভাবনা এবং প্রতিহিংসাহীন রাজনীতি।

রাষ্ট্র মেরামতের প্রথম দায় রাজনীতিবিদদের। কারণ আইন বানানো, বাজেট পাস, প্রতিষ্ঠান চালানো—এসবের চাবি তাদের হাতে। বাধা দূর করতে তাদের তিনটি কাজ জরুরি। প্রথম, দলীয় স্বার্থের ওপরে জাতীয় স্বার্থকে রাখা। আজ যে দল ক্ষমতায়, কাল সে বিরোধী দলে যাবে—এই বাস্তবতা মেনে নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, বিচার বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংককে সত্যিকারের স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে।
নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতিতে মেধা ও জ্যেষ্ঠতাকে মানদণ্ড করলে প্রশাসন দলীয় লাঠিয়াল থেকে রাষ্ট্রের সেবকে পরিণত হয়। দ্বিতীয়, নীতির ধারাবাহিকতা রক্ষা। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল—এগুলো কোনো দলের না, দেশের সম্পদ। সরকার বদলালে প্রকল্প বাতিল বা ধীরগতি যেন না হয়, সে জন্য পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাকে সংসদে সর্বদলীয় সম্মতিতে পাস করার সংস্কৃতি লাগবে।

তৃতীয়, নিজেদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। প্রতিবছর সংসদ সদস্যদের সম্পদের হিসাব ওয়েবসাইটে প্রকাশ, সংসদে উপস্থিতি ও বিল নিয়ে বিতর্কের রেকর্ড জনগণের সামনে থাকলে ‘কে এলো গেলো’র রাজনীতি থেকে আমরা ‘কী করল’র রাজনীতিতে ঢুকতে পারব। রাজনীতিবিদ যখন বুঝবেন ক্ষমতা চিরস্থায়ী না, কিন্তু সিস্টেম টিকে থাকে—তখনই মেরামত শুরু হয়।

সুশীল সমাজ মানে শুধু টক শোর আলোচক না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গণমাধ্যম, এনজিও, পেশাজীবী সংগঠন, আইনজীবী, সংস্কৃতিকর্মী—এরা সবাই এর অংশ। এদের কাজ তিন স্তরে। প্রথমত, তথ্য দিয়ে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা। তথ্য অধিকার আইন ব্যবহার করে বাজেট কোথায় খরচ হলো, কোন প্রকল্পে কত ব্যয় বাড়ল, সেটা সহজ ভাষায় মানুষকে জানানো। টিআইবি, সিপিডি প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের গবেষণা তখনই কাজে লাগে, যখন সেটা গ্রামের চায়ের দোকান পর্যন্ত পৌঁছায়।
দ্বিতীয়ত, বিকল্প নীতি প্রস্তাব তৈরি করা। শুধু সমস্যা দেখালে হবে না, সমাধান কী হতে পারে—শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর ব্যবস্থায়—তার খসড়া সরকারকে দেওয়া ও জনপরিসরে বিতর্ক তোলা। তৃতীয়ত, নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যে সেতু হওয়া। শ্রমিকের মজুরি, কৃষকের দাম, শহরের জলাবদ্ধতা—এই ইস্যুগুলোতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে এক করা, তাদের পক্ষে আইনি সহায়তা দেওয়া এবং নীতিনির্ধারকের টেবিলে তাদের কথা তুলে ধরা। সুশীল সমাজ যখন দলীয় লেজুড়বৃত্তি ছেড়ে তথ্য ও নৈতিকতার পক্ষ নেয়, তখনই সে জনগণের আস্থা পায় এবং রাষ্ট্র মেরামতের চাপ তৈরি করতে পারে।
২০২৪-এর ছাত্র আন্দোলন দেখিয়েছে, সাধারণ মানুষ চাইলে স্রোত ঘুরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্র মেরামতি শুধু রাজপথের স্লোগান না, এটা প্রতিদিনের ছোট ছোট ‘না’ বলার সাহস। প্রথম ‘না’: দুর্নীতিতে সহযোগী না হওয়া। জমির নামজারি করতে ৫ হাজার টাকা ঘুষ না দিয়ে সময় নিয়ে নিয়মে করা, অফিসে ফাইল আটকে গেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বা দুদকের হটলাইনে অভিযোগ করা। একজন না বললে সিস্টেম বদলায় না, ১০ লাখ মানুষ না বললে বদলাতে বাধ্য। দ্বিতীয় দায়িত্ব: ভোট ও কর। যোগ্য প্রার্থী না পেলেও ভোটকেন্দ্রে যাওয়া, কারণ ভোটের হার কমলে জবাবদিহি কমে।
একইভাবে আয়কর রিটার্ন দেওয়া—রাষ্ট্রকে টাকা দিলে রাষ্ট্রের কাছে হিসাব চাওয়ার নৈতিক অধিকার জন্মে। তৃতীয় দায়িত্ব: নিজের জায়গায় সৎ থাকা। ব্যবসায়ী ভ্যাট ফাঁকি না দিলে, শিক্ষক ক্লাসে ফাঁকি না দিলে, ডাক্তার অপ্রয়োজনীয় টেস্ট না দিলে—রাষ্ট্রের ভিতটা মজবুত হয়। ৬০% তরুণ জনগোষ্ঠী যদি দক্ষতা অর্জন করে ফ্রিল্যান্সিং, উৎপাদন, সেবা খাতে ঢোকে এবং একই সঙ্গে সামাজিক মাধ্যমে গুজব না ছড়িয়ে তথ্য যাচাই করে, তাহলে ‘প্রতিহিংসার রাজনীতির বাজার ছোট হয়ে আসে।
পদ্মা সেতু একদিনে হয়নি, মেট্রোরেলও না। রাষ্ট্র মেরামতও রাতারাতি হবে না। কিন্তু রাজনীতিবিদ যদি দলের আগে দেশ রাখেন, সুশীল সমাজ যদি সত্যের পক্ষে দাঁড়ায়, আর আমি-আপনি যদি ঘুষ না দিই, ভোট দিই, অন্যায় দেখে চুপ না থাকি—তাহলে ১০-১৫ বছরে বদলটা চোখে পড়বে।
গার্মেন্টস, রেমিট্যান্স ও আইটি—আমাদের হাতে শক্তি আছে। ২০ লাখ তরুণ প্রতিবছর শ্রমবাজারে আসছে—এরা বোঝা না, সম্ভাবনা। রাষ্ট্র মেরামতি তাই কোনো ‘পণ্য’ না, এটা ১৭ কোটি মানুষের দৈনন্দিন সিদ্ধান্তের যোগফল। বাধা আছে, থাকবে। কিন্তু বাধা ডিঙানোর পথ আমাদের তৈরি করতে। কেউ এসে করে দিয়ে যাবে না।
