ডিজি বদলি, কিন্তু বিতর্কের অবসান কোথায় ?

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত গ্রাম বাংলার খবর চট্টগ্রাম জাতীয় বিশেষ প্রতিবেদন সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিনিধি  : বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বোরি) দেশের সামুদ্রিক গবেষণা, সমুদ্রসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও নীল অর্থনীতি বিকাশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে গবেষণা, সামুদ্রিক সম্পদের সম্ভাবনা অনুসন্ধান, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মূল্যায়ন এবং সমুদ্রভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণে প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকার কথা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, গত কয়েক বছরে গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক অর্জনের চেয়ে প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, ক্রয় কার্যক্রম, ক্ষমতার প্রভাব এবং অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিয়েই বেশি আলোচনায় এসেছে প্রতিষ্ঠানটি।


বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি বোরির মহাপরিচালক কমোডর মো. মিনারুল হককে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত নতুন করে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের অনেকেই মনে করেছিলেন, দীর্ঘদিন ধরে চলমান বিতর্ক ও অস্থিরতার একটি পরিসমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। মহাপরিচালকের বদলির পরও থামেনি অভিযোগ, কমেনি উত্তেজনা; বরং নতুন করে শুরু হয়েছে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের লড়াই।

প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশের অভিযোগ, মহাপরিচালকের বদলি কেবল দৃশ্যমান প্রশাসনিক পরিবর্তন মাত্র। অথচ দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্প বাস্তবায়ন, ক্রয় কার্যক্রম, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে যাদের নাম ঘুরেফিরে এসেছে, তাদের ভূমিকা এখনও কার্যকর রয়েছে। ফলে ব্যক্তি পরিবর্তন হলেও ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটেনি বলেই মনে করছেন তারা।


বিজ্ঞাপন

সূত্রমতে, গত কয়েক মাসে বোরিকে ঘিরে প্রকাশিত একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ক্ষমতার অপব্যবহার, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক ভয়ভীতি, সরকারি সম্পদের ব্যবহার, প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সীমিত গোষ্ঠীর প্রভাবের মতো নানা বিষয় উঠে আসে। এসব প্রতিবেদনের পরই বিষয়গুলো মন্ত্রণালয় পর্যায়ে আলোচনায় আসে এবং শেষ পর্যন্ত মহাপরিচালকের বদলির সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে।


বিজ্ঞাপন

তবে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের দাবি, আলোচিত ঘটনাগুলোর গভীরে গেলে দেখা যাবে, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, ক্রয় কার্যক্রম এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী প্রভাববলয় সক্রিয় ছিল। তাদের মতে, সহকারী প্রকৌশলী আব্দুর রউফ তালুকদার এবং সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার জাকারিয়াকে ঘিরে যে প্রভাববলয়ের কথা দীর্ঘদিন ধরে অভ্যন্তরীণভাবে আলোচনা হয়ে আসছে, সেটি নিয়েই এখন নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বোরির দ্বিতীয় পর্যায়ের উন্নয়ন প্রকল্প, বিভিন্ন ক্রয় কার্যক্রম, টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে একই ব্যক্তিদের প্রভাব বারবার দৃশ্যমান হয়েছে। তাদের অভিযোগ, প্রকল্পের আর্থিক ও প্রশাসনিক কাঠামো এমনভাবে পরিচালিত হয়েছে যাতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সীমিত কয়েকজনের নিয়ন্ত্রণেই থাকে।

অভিযোগ রয়েছে, অনুমোদিত জনবল কাঠামো থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ অনেক পদ শূন্য রাখা হয়েছে। নতুন নিয়োগ হলে বিদ্যমান প্রভাববলয়ের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে যেতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকেই নিয়োগ প্রক্রিয়া কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোয়নি বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা। যদিও এ অভিযোগের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন, তবুও বিষয়টি এখন প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরে আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

বোরির অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, মহাপরিচালকের বদলির পর প্রকল্প ও প্রশাসনিক নথিপত্র পুনর্মূল্যায়নের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় একটি অংশের মধ্যে অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। কারণ নতুন নেতৃত্ব দায়িত্ব গ্রহণ করলে গত কয়েক বছরের প্রকল্প ব্যয়, ক্রয় কার্যক্রম, বিল-ভাউচার, যানবাহন ব্যবহার, জ্বালানি খরচ এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নতুন করে পর্যালোচনার সুযোগ সৃষ্টি হবে।

এমন প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি কয়েকজন কর্মকর্তা ও বিজ্ঞানীর বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযোগ তুলে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একটি সূত্রের দাবি, এসব অভিযোগের অনেকগুলোই এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্তে প্রমাণিত হয়নি। কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব, ব্যক্তিগত বিরোধ কিংবা মতপার্থক্যকে নতুনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তাদের বিষয়ে সহকর্মীদের একটি অংশ আবার ভিন্ন মত পোষণ করেন। তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা, বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ, প্রকাশনা এবং মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন। প্রশাসনিক মতবিরোধ বা নীতিগত দ্বন্দ্ব থাকতেই পারে, কিন্তু কোনো স্বাধীন তদন্ত ছাড়া কাউকে দায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে না।

এদিকে বোরির অভ্যন্তরে এখন সবচেয়ে আলোচিত হচ্ছে, মহাপরিচালকের বদলির পরও কেন বিতর্ক থামছে না? কেন প্রশাসনিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নতুন করে অভিযোগের স্রোত তৈরি হলো? এবং কেন একই সময়ে প্রকল্প ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত কিছু নামকে ঘিরে প্রশ্নগুলো আরও জোরালো হয়ে উঠছে?

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ব্যক্তি নয়, পুরো ব্যবস্থাকে তদন্তের আওতায় আনতে হবে। গত কয়েক বছরের প্রকল্প বাস্তবায়ন, টেন্ডার কার্যক্রম, ক্রয় প্রক্রিয়া, নিয়োগ ব্যবস্থা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, যানবাহন ব্যবহার এবং আর্থিক লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন অডিট ছাড়া প্রকৃত চিত্র উদঘাটন করা সম্ভব নয়।

অভিযোগ রয়েছে, সহকারী প্রকৌশলী আব্দুর রউফ তালুকদার মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর জন্য এমন একটি আবেদনপত্র প্রস্তুত করেছেন, যেখানে বিদায়ী প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকজন কর্মকর্তাকে চলমান প্রকল্পে বহাল রাখার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, নতুন প্রশাসনের অধীনে প্রকল্পের নথিপত্র, আর্থিক হিসাব, ক্রয় কার্যক্রম এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পুনঃমূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হলে গত কয়েক বছরের বহু অজানা তথ্য সামনে চলে আসতে পারে। আর সে কারণেই বর্তমানে কিছু কর্মকর্তা ও বিজ্ঞানীর বিরুদ্ধে নতুন করে অভিযোগ ছড়িয়ে দিয়ে ভিন্নখাতে আলোচনার মোড় ঘোরানোর চেষ্টা চলছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে।

বোরির ভেতরের একাধিক সূত্রের দাবি, বর্তমানে যেসব গুরুতর অভিযোগ বিভিন্ন মহলে প্রচার করা হচ্ছে, তার অনেকগুলোর সঙ্গেই কোনো প্রামাণ্য তদন্ত প্রতিবেদন, নিরীক্ষা প্রতিবেদন কিংবা আদালতের সিদ্ধান্ত যুক্ত নেই। বরং দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত টেন্ডার কার্যক্রম, প্রকল্প ব্যয়, যানবাহন ব্যবহার, জ্বালানি খরচ, বিল-ভাউচার অনুমোদন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে যেসব প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, সেগুলো আড়াল করতেই নতুন করে ‘দোষী খোঁজার অভিযান’ শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি সূত্র জানায়, “যাদের বিরুদ্ধে প্রকৃত অনুসন্ধান হওয়া প্রয়োজন, তারাই এখন অন্যদের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে নিজেদের দায়মুক্তির পথ তৈরি করতে চাইছে।”

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

👁️ 38 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *