উৎপাদন বন্ধ, শ্রমিক ছাঁটাই, অর্থপাচারের অভিযোগ : এ্যাংকর সিমেন্টকে ঘিরে প্রশ্নের পাহাড় !

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত কর্পোরেট সংবাদ জাতীয় বরিশাল বিশেষ প্রতিবেদন সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক  : ক্রমাগত ব্যবসায়িক লোকসান, কাঁচামাল সংকট এবং এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খুলতে অক্ষমতার কারণ দেখিয়ে বরিশালভিত্তিক এ্যাংকর সিমেন্টের উৎপাদক প্রতিষ্ঠান অলিম্পিক সিমেন্ট লিমিটেড উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেছে।


বিজ্ঞাপন

একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির শ্রমিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্তও জানানো হয়েছে। গত ১১ জুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিকা রহমানের স্বাক্ষরিত এক নোটিশে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।

নোটিশে বলা হয়েছে, শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রাপ্য পাওনা ও ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করা হবে। তবে উৎপাদন বন্ধের এই ঘোষণার পর শুধু শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ নয়, প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ব্যাংক ঋণ, ভ্যাট সংক্রান্ত অভিযোগ এবং কথিত অর্থপাচার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।


বিজ্ঞাপন

উৎপাদন বন্ধের পেছনে কী শুধুই লোকসান ?  কোম্পানি কর্তৃপক্ষ উৎপাদন বন্ধের কারণ হিসেবে ব্যবসায়িক লোকসান, কাঁচামালের সংকট এবং এলসি জটিলতার কথা উল্লেখ করলেও সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র বলছে, বিষয়টি শুধুমাত্র ব্যবসায়িক সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।


বিজ্ঞাপন

অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান জুলিয়া রহমান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিকা রহমান এবং পরিচালক রিফাতের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে অর্থ স্থানান্তর ও সম্পদ গঠনের নানা অভিযোগ ঘুরে বেড়াচ্ছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, এসব আর্থিক অনিয়মের প্রভাবেই প্রতিষ্ঠানটি ক্রমশ ঋণ ও তারল্য সংকটে পড়ে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ব্যাংক ঋণ, এলসি সংকট ও উৎপাদন স্থবিরতা : প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে নেওয়া বড় অঙ্কের ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ঋণের কিস্তি বকেয়া থাকায় এলসি খোলায় জটিলতা তৈরি হয় এবং কাঁচামাল আমদানিও ব্যাহত হতে থাকে।

ফলে ক্লিংকার, স্ল্যাগ, জিপসাম, লাইমস্টোন ও ফ্লাই অ্যাশ সংগ্রহে সমস্যা দেখা দেয়। একপর্যায়ে উৎপাদন ব্যাহত হয়ে প্রতিষ্ঠানটি কার্যত অচল অবস্থায় পৌঁছে যায়।

এদিকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধেও অনিয়ম ও বিলম্বের অভিযোগ উঠেছে। ফলে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে থাকে।

অর্থপাচারের অভিযোগ: দুবাই, লন্ডন ও যুক্তরাষ্ট্রে সম্পদের অনুসন্ধান : একাধিক অভিযোগে বলা হয়েছে, অলিম্পিক সিমেন্ট লিমিটেডের তহবিল থেকে অর্থ বিদেশে স্থানান্তরের মাধ্যমে দুবাই, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, দুবাইয়ে একই বা সংশ্লিষ্ট নামে প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে আমদানি-রপ্তানি ও এলসি লেনদেনের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ বিদেশে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া হুন্ডির মাধ্যমেও অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ রয়েছে ।

অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, এ ধরনের লেনদেনের প্রকৃত চিত্র জানতে এলসি সংক্রান্ত নথি ও আমদানিকৃত পণ্যের মূল্যায়ন তদন্ত করা প্রয়োজন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য জানা যায়নি।

ভ্যাট ফাঁকি ও তদন্তের অভিযোগ : অলিম্পিক সিমেন্ট লিমিটেডের বিরুদ্ধে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ভ্যাট ফাঁকি এবং অতিরিক্ত রেয়াত সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।

সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংশ্লিষ্ট বিভাগ, কাস্টমস গোয়েন্দা ও ভ্যাট অডিট, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর বিষয়গুলো পর্যালোচনা করছে। তবে তদন্তের অগ্রগতি বা চূড়ান্ত ফলাফল সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

দুদকের অনুসন্ধানের দাবি : অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, বিদেশে সম্পদ অর্জন, অর্থপাচার, ব্যাংক ঋণের অর্থের ব্যবহার এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান করছে। এ বিষয়ে দুদকের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

শ্রমিকদের অনিশ্চয়তা ও প্রতারণার অভিযোগ : উৎপাদন বন্ধের ঘোষণার পর সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তায় পড়েছেন প্রতিষ্ঠানটির শত শত শ্রমিক। বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের বরিশাল সমন্বয়ক ড. মনীষা চক্রবর্তী দাবি করেছেন, প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা পরিবর্তনের প্রক্রিয়া চলছে এবং শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দিতে হবে। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, শ্রমিকদের যথাযথ নিরাপত্তা ও পাওনা নিশ্চিত না করেই ছাঁটাই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে কোম্পানি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানা যায়নি।

শ্রম আইন কী বলছে ?  আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ধারা ২৮ মূলত অবসর গ্রহণ সংক্রান্ত বিধান নিয়ে আলোচনা করে।

অন্যদিকে শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে বন্ধ হলে শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ, পাওনা ও মালিকের দায়বদ্ধতা শ্রম আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। সেক্ষেত্রে ছাঁটাই কার্যক্রম আইনসম্মত হয়েছে কি না, তা নির্ভর করবে শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ এবং আইনি প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না তার ওপর।

সামনে যেসব প্রশ্নন  : এ্যাংকর সিমেন্টের উৎপাদন বন্ধ শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়; এটি দেশের শিল্পখাত, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং করপোরেট সুশাসন নিয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।

বর্তমানে আলোচনায় থাকা প্রধান প্রশ্নগুলো হলো—
উৎপাদন বন্ধের প্রকৃত কারণ কী ? ব্যাংক ঋণের অর্থ কোথায় ব্যয় হয়েছে ? এলসি লেনদেনে কোনো অনিয়ম হয়েছিল কি ? ভ্যাট ও শুল্ক সংক্রান্ত অভিযোগের ভিত্তি কতটা শক্ত ? শ্রমিকদের পাওনা ও ক্ষতিপূরণ আদৌ সময়মতো পরিশোধ হবে কি ? কথিত অর্থপাচারের অভিযোগে তদন্ত সংস্থাগুলো কী তথ্য পেয়েছে ? এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থার চূড়ান্ত অনুসন্ধান ও প্রতিবেদনের মাধ্যমে।

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে দেশের শিল্পখাত, ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও করপোরেট সুশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসতে পারে। আর অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে এটি সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় করপোরেট আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় পরিণত হতে পারে।

👁️ 35 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *