
নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত জেলাপ্রশাসক সম্মেলন ২০২৬-এর চতুর্থ দিনের তৃতীয় অধিবেশন শেষে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রেস ব্রিফিংয়ে দেশজুড়ে আইন-শৃঙ্খলা, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, ভুয়া মামলা প্রত্যাহার এবং ঈদ নিরাপত্তা নিয়ে একাধিক কঠোর ও তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

মন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে জমা না দেওয়া প্রায় ১০ হাজার অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান চালানো হবে। একই সঙ্গে মামলা, বাজেয়াপ্তকরণ ও নজরদারি কার্যক্রম আরও জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে জনসাধারণের কাছ থেকে জমা নেওয়া লাইসেন্সকৃত আগ্নেয়াস্ত্রগুলোর বড় অংশ এখনো ফেরত দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে চিঠি জারি করেছে। চিঠিতে তিন শ্রেণির লাইসেন্সধারীদের অস্ত্র ফেরত দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে—২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারির পূর্বে লাইসেন্সপ্রাপ্ত আগ্নেয়াস্ত্র, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর লাইসেন্সপ্রাপ্ত অস্ত্র, এবং ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত রাজনৈতিক বিবেচনায় দেওয়া লাইসেন্সগুলোর মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে নীতিমালা অনুযায়ী বৈধ বলে প্রতীয়মান হওয়া অস্ত্র।

মন্ত্রী জানান, এসব লাইসেন্স যাচাইয়ের জন্য পূর্বে গঠিত কমিটি কাজ করছে এবং বৈধতার ভিত্তিতেই অস্ত্র ফেরত দেওয়া হবে।
‘গায়েবি’ ও হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারে নতুন উদ্যোগ : বিগত সরকারের আমলে দায়ের হওয়া ‘গায়েবি’, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও হয়রানিমূলক মামলাগুলো বাতিলে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে বলেও জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি এসব মামলা যাচাই করবে। ভুক্তভোগীরা নির্ধারিত ফরমে এজাহার বা চার্জশিটসহ আবেদন করতে পারবেন।
প্রাথমিক যাচাই শেষে সুপারিশ : স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হয়ে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে এবং ফৌজদারি কার্যবিধির (CrPC) ৪৯৪ ধারা অনুযায়ী মামলা প্রত্যাহারের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একই সঙ্গে ৫ আগস্ট পরবর্তী গণহত্যামূলক মামলাগুলোতে যেন কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি বা সাংবাদিক হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তাদের বিশেষ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঈদুল আযহা ঘিরে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা : আসন্ন ঈদুল আযহাকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভার সিদ্ধান্ত মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান—সড়ক-মহাসড়ক ও রেললাইনের পাশে কোনো পশুর হাট বসতে দেওয়া হবে না, বড় পশুর হাটগুলোতে জালনোট শনাক্তকরণ মেশিন থাকবে, পুলিশ বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করে টহল দেবে, ঈদের সাত দিন আগে পুলিশ সদর দপ্তরে কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেল চালু হবে,, মহাসড়ক সিসিটিভির আওতায় সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে থাকবে,, ফেরিঘাটে মাইকিং ও সতর্কতামূলক সাইনবোর্ডের মাধ্যমে যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
চামড়া শিল্প রক্ষায় বিশেষ পরিকল্পনা : কোরবানির চামড়া সংরক্ষণ ও চামড়া শিল্প রক্ষায়ও সরকার বিশেষ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। উপজেলা পর্যায়ে বিনামূল্যে পর্যাপ্ত লবণ সরবরাহ করা হবে যাতে গ্রামাঞ্চলেই অন্তত সাত দিন পর্যন্ত চামড়া সংরক্ষণ সম্ভব হয়। তিনি আরও বলেন, ঢাকার ইটিপি (ETP) সিস্টেমের ধারণক্ষমতা বিবেচনায় চামড়া ধাপে ধাপে রাজধানীতে আনার বিষয়ে জেলা প্রশাসকদের সচেতনতা বৃদ্ধির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সীমান্তে ‘সর্বোচ্চ সতর্কতা’ : ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য ‘পুশব্যাক’ নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-কে সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মাদক, জুয়া ও অনলাইন বেটিংয়ের বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
প্রেস ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী, আইজিপি মোঃ আলী হোসেন ফকিরসহ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারা।
