!! মন্তব্য প্রতিবেদন !! বাংলাদেশে সাংবাদিকতার বর্তমান অবস্থা : ঝুঁকি, স্বাধীনতা

Uncategorized জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সারাদেশ

শাহিন বাবু  :  বাংলাদেশে সাংবাদিকতা গণতন্ত্রের একটি অপরিহার্য স্তম্ভ হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই পেশা ক্রমশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তার, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং সামাজিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে সাংবাদিকদের কাজের ক্ষেত্র যেমন বিস্তৃত হয়েছে, তেমনি বেড়েছে তাদের ওপর চাপ, হুমকি এবং আইনি জটিলতা। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূচক, মানবাধিকার সংস্থা এবং গণমাধ্যম পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়- বাংলাদেশে সাংবাদিকতার পরিবেশ এখন “সীমিত স্বাধীনতা” এবং “উচ্চ ঝুঁকি”-র মধ্যে অবস্থান করছে।


বিজ্ঞাপন

প্রথমত, আন্তর্জাতিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান সাংবাদিকতার স্বাধীনতার চিত্র স্পষ্ট করে। প্যারিসভিত্তিক সংস্থা Reporters Without Borders প্রকাশিত World Press Freedom Index অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ ১৮০ দেশের মধ্যে ১৫২তম স্থানে রয়েছে। এর আগের বছর ২০২৫ সালে অবস্থান ছিল ১৪৯তম, আর ২০২৪ সালে ছিল আরও নিচে ১৬৫তম। এই ওঠানামা সামান্য উন্নতির ইঙ্গিত দিলেও সামগ্রিকভাবে দেশটি এখনও ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বা ‘সমস্যাপূর্ণ’ ক্যাটাগরিতে রয়ে গেছে। একই সূচকে বাংলাদেশের স্কোর প্রায় ৩৩-৩৪ পয়েন্ট, যা নিম্নমানের গণমাধ্যম স্বাধীনতার প্রতিফলন।

দ্বিতীয়ত, সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের পরিসংখ্যান পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে শত শত সাংবাদিক শারীরিক হামলা, হুমকি এবং প্রশাসনিক হয়রানির শিকার হয়েছেন। একটি সংকলিত হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪–২০২৫ সময়কালে প্রায় ১,০০০-এর বেশি সাংবাদিক কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন- যার মধ্যে শারীরিক হামলা, আইনি মামলা এবং পেশাগত বাধা অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া প্রায় ৬৪০ জন সাংবাদিককে সরাসরি টার্গেট করার অভিযোগ রয়েছে এবং কয়েকশ’ নির্দিষ্ট হামলার ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে। এসব তথ্য ইঙ্গিত করে যে, সাংবাদিকদের জন্য ঝুঁকি এখন বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটি ধারাবাহিক বাস্তবতা।


বিজ্ঞাপন

তৃতীয়ত, আইনি ও রাজনৈতিক চাপ সাংবাদিকতার স্বাধীনতাকে সীমিত করছে। Freedom House এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে শতাধিক ফৌজদারি মামলা চলমান রয়েছে। একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, অন্তত ২৬৬ জন সাংবাদিক আইনি মামলার মুখোমুখি। বিশেষ করে ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ বা মতামতের ক্ষেত্রে আইনি ঝুঁকি বেশি দেখা যায়। এর ফলে অনেক সাংবাদিক আত্মনিয়ন্ত্রণ বা ‘self-censorship’-এর দিকে ঝুঁকছেন, যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য একটি বড় বাধা।


বিজ্ঞাপন

চতুর্থত, সাম্প্রতিক সময়ে ‘মব সহিংসতা’ বা জনতার হামলা একটি নতুন ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম Reuters-এর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালে কিছু বড় সংবাদপত্রের কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ ও হামলার ঘটনা ঘটে, যার ফলে প্রকাশনা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। একই সময়ে সাংবাদিকরা জানান, newsroom-এ কাজ করাও এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে এবং মৃত্যুর হুমকি অনেক ক্ষেত্রে ‘নিয়মিত ঘটনা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রবণতা দেখায় যে ঝুঁকি এখন শুধু রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক গোষ্ঠী থেকে নয়, সামাজিক অস্থিরতার মধ্যেও বিস্তৃত হয়েছে।

পঞ্চমত, রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় সাংবাদিকদের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। Freedom House-এর ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, রাজনৈতিক সহিংসতার সময় সাংবাদিকরা হামলা, আহত হওয়া এবং এমনকি প্রাণহানির শিকার হয়েছেন। নির্বাচনকালীন সময়ে এই ঝুঁকি সাধারণত আরও তীব্র হয়, কারণ তখন তথ্য নিয়ন্ত্রণ ও জনমত প্রভাবিত করার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।

আন্তর্জাতিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান: বিশ্বব্যাপী সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা পরিমাপের অন্যতম সূচক হলো World Press Freedom Index, যা Reporters Without Borders প্রকাশ করে। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ ১৮০ দেশের মধ্যে ১৫২তম স্থানে অবস্থান করছে, ২০২৫ সালে এই অবস্থান ছিল ১৪৯তম এবং ২০২৪ সালে অবস্থান ছিল আরও নিচে, ১৬৫তম। কিছু উন্নতি হলেও সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ এখনও ‘ঝুঁকিপূর্ণ বা সীমিত স্বাধীনতার’ দেশের তালিকায় রয়েছে। এছাড়া ২০২৫ সালে বাংলাদেশের প্রেস ফ্রিডম স্কোর ছিল ৩৩.৭১ পয়েন্ট, যা নিম্নমানের স্বাধীনতার ইঙ্গিত দেয় ।

সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা একটি বড় বাস্তবতা: একটি মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২৯৪টি হামলা ও হয়রানির ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, ২০২৫ সালেই অন্তত ৬২টি নির্দিষ্ট ঘটনা ঘটেছে অন্য এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৬৪০ জন সাংবাদিককে টার্গেট করা হয়েছে। প্রায় ১,০৭৩ জন সাংবাদিক আইনগত, শারীরিক বা প্রশাসনিক হয়রানির শিকার হয়েছেন (২০২৪-২৫ সময়কাল)। এই সংখ্যাগুলো দেখায় যে সাংবাদিকদের জন্য ঝুঁকি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি ধারাবাহিক বাস্তবতা।

সাম্প্রতিক সহিংসতা ও হুমকি (২০২৫–২০২৬): ২০২৫ সালে বড় সংবাদপত্র অফিসে মব হামলা ও অগ্নিসংযোগ হয়, যার ফলে প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়। অনেক সাংবাদিক মৃত্যুর হুমকি, নজরদারি ও ভয়ভীতির মধ্যে কাজ করছেন। সাংবাদিকতার ঝুঁকি শুধু মাঠে নয়, অফিস ও ব্যক্তিগত জীবনেও বিস্তৃত।

আইনি ও রাজনৈতিক চাপ: বাংলাদেশে সাংবাদিকদের ঝুঁকির বড় অংশ আসে আইনি ও রাজনৈতিক চাপ থেকে। বর্তমানে অন্তত ২৬৬ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে প্রেস অ্যাক্রেডিটেশন বাতিল করা হয়, অনেক সাংবাদিক বাধ্য হয়ে আত্মনিয়ন্ত্রণ (self-censorship) করেন।

উপরের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশে সাংবাদিকতার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কয়েকটি স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়- আন্তর্জাতিক সূচকে নিম্ন অবস্থান (১৫২তম),
শত শত হামলা ও হয়রানির ঘটনা, হাজারের বেশি সাংবাদিক বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, আইনি মামলা ও রাজনৈতিক চাপ এবং মব সহিংসতা ও সরাসরি হামলার বৃদ্ধি।

তবে সবকিছুর মধ্যেও কিছু ইতিবাচক দিক লক্ষ করা যায়। অনলাইন গণমাধ্যমের বিস্তার, নতুন প্রজন্মের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার প্রতি আগ্রহ এবং বিকল্প প্ল্যাটফর্মের উত্থান তথ্যপ্রবাহকে আরও গতিশীল করেছে। আন্তর্জাতিক মহলের নজরদারি ও চাপও দীর্ঘমেয়াদে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা উন্নত করতে ভূমিকা রাখতে পারে।

উপসংহারে বলা যায়, বাংলাদেশে সাংবাদিকতা বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পেশা। আন্তর্জাতিক সূচকে নিম্ন অবস্থান, শত শত হামলার ঘটনা, আইনি চাপ এবং সামাজিক সহিংসতা—সব মিলিয়ে সাংবাদিকদের জন্য কাজের পরিবেশ এখনও নিরাপদ নয়। তবুও প্রতিকূলতার মধ্যেও সাংবাদিকরা সত্য তুলে ধরার যে ভূমিকা পালন করছেন, তা গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য অপরিহার্য। তাই সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আইনি সুরক্ষা জোরদার করা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করা এখন সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি।  (লেখক : সংবাদকর্মী ও সংগঠক)

👁️ 67 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *