
নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ঘিরে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, টেন্ডার কারসাজি, নদীবন্দর ব্যবস্থাপনা এবং সম্পদ অর্জনসংক্রান্ত অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে।


দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা দেওয়া একাধিক অভিযোগপত্র, অনুসন্ধানসংক্রান্ত চিঠি এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে বিআইডব্লিউটিএর বন্দর ও পরিবহন বিভাগের কর্মকর্তা এ কে এম আরিফ উদ্দিন, সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান এবং সাবেক নৌপ্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর নাম উঠে এসেছে।

দুদকের অনুসন্ধান ও চাহিদাপত্র : দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে জারি করা স্মারক নং ০০.০১.২৬০০.৬০৩.০১.২৩৪.২৩-এর আলোকে উপ-পরিচালক মো. হাফিজুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি অনুসন্ধান টিম গঠন করা হয়। ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩ তারিখে জারি করা তাগিদপত্রে বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক (প্রশাসন)-এর কাছে বিভিন্ন নথিপত্র চাওয়া হয়।


চাহিদাপত্র অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জ ও সদরঘাট নদীবন্দর থেকে নির্দিষ্ট সময়ের রাজস্ব আদায়, সরকারি কোষাগারে জমা প্রদান, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবের বিবরণ এবং এ কে এম আরিফ উদ্দিনের চাকরি-সংক্রান্ত ব্যক্তিগত নথি, বেতন-ভাতার হিসাব, দায়িত্ব সংক্রান্ত অফিস আদেশ এবং তার পরিবার-সংশ্লিষ্ট ব্যবসা বা শেয়ার মালিকানার তথ্য সরবরাহ করতে বলা হয়।

দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী, “নানাবিধ দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ” অনুসন্ধানের অংশ হিসেবেই এসব নথি চাওয়া হয়েছিল।

অভিযোগে সাবেক মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর নাম : দুদকে জমা দেওয়া একটি অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, বিগত সরকারের সময় বিআইডব্লিউটিএর কয়েকটি বড় প্রকল্প, ড্রেজিং কার্যক্রম, নদী খনন এবং বিভিন্ন ইজারা কার্যক্রমে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করা হতো।
অভিযোগকারীর ভাষ্যমতে, সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান এবং সাবেক নৌপ্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে কিছু কর্মকর্তা দীর্ঘ সময় ধরে গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে প্রভাব বিস্তার করেন।

এ কে এম আরিফ উদ্দিনকে ঘিরে অভিযোগ : অভিযোগপত্রে এ কে এম আরিফ উদ্দিনের বিরুদ্ধে নদী তীর উচ্ছেদ, লিজ প্রদান, নিলাম কার্যক্রম, ঘাট ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, তিনি দীর্ঘ সময় ধরে বিআইডব্লিউটিএর বন্দর ও পরিবহন বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকে উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করেছেন।

নদী তীর উচ্ছেদ, ফোরশোর লিজ, ঘাট ইজারা, নিলাম কার্যক্রম এবং বন্দর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে বহু অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে।
সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন : দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগে এ কে এম আরিফ উদ্দিন ও তার পরিবারের নামে ঢাকা ও পাবনাসহ বিভিন্ন এলাকায় সম্পদ থাকার দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ঢাকার এলিফ্যান্ট রোড, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, পূর্বাচল এবং পাবনার সুজানগর এলাকায় তার বা পরিবারের সদস্যদের নামে বাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট ও অন্যান্য সম্পদের অস্তিত্ব রয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
সদরঘাট টার্মিনালের টেন্ডার নিয়ে নতুন অভিযোগ : সম্প্রতি দুদকে দেওয়া আরেকটি অভিযোগে সদরঘাট টার্মিনালের লেবার হ্যান্ডেলিং ইজারা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

ওঅভিযোগকারীদের দাবি, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের একটি ইজারা কার্যক্রমে দ্বিতীয় দফার টেন্ডার প্রক্রিয়া থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট বাদ দেওয়া হয়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, এর ফলে সরকার সম্ভাব্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হতে পারে। অভিযোগকারীরা এটিকে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অংশ বলে দাবি করলেও এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

অনুসন্ধানের দাবি : অভিযোগকারীরা বিআইডব্লিউটিএর প্রকল্প বাস্তবায়ন, ড্রেজিং কার্যক্রম, ইজারা প্রদান, নদীবন্দর ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সম্পদের উৎস নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি করেছেন।
তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে উত্থাপিত অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে নৌপরিবহন খাতের নানা অনিয়ম ও প্রশাসনিক দুর্বলতার প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে পারে।
অন্যদিকে সুশাসন বিশ্লেষকদের মতে, অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ বা রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে গিয়ে দলিল-প্রমাণনির্ভর তদন্তই এ ধরনের বিতর্কের গ্রহণযোগ্য সমাধান দিতে পারে।

বিশেষ দ্রষ্টব্য : এ প্রতিবেদনে বর্ণিত তথ্যের একটি বড় অংশ দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগপত্র, অনুসন্ধানসংক্রান্ত চিঠি এবং অভিযোগকারীদের উপস্থাপিত নথি থেকে সংগৃহীত। অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোনো আদালত বা তদন্তকারী সংস্থার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রতিবেদনের সময় পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা সংযোজন করা হবে।
