
বিশেষ প্রতিবেদক : দেশজুড়ে দুর্নীতি, অনিয়ম ও হয়রানির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। উন্নয়ন প্রকল্প থেকে শুরু করে নাগরিক সেবা ও স্বাস্থ্যখাত—কোথাও ছাড় নেই। এরই ধারাবাহিকতায় একই দিনে দেশের তিনটি ভিন্ন খাতে পরিচালিত হলো দুদকের একাধিক এনফোর্সমেন্ট অভিযান, যা প্রশাসনে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

নদীভাঙন রোধের প্রকল্পে অনিয়ম: নিম্নমানের সিসি ব্লক নিয়ে প্রশ্ন : জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলায় নদীভাঙন রোধে গৃহীত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুদক, সমন্বিত জেলা কার্যালয়, জামালপুর থেকে একটি এনফোর্সমেন্ট অভিযান পরিচালনা করা হয়।
অভিযান পরিচালনা কালে দুদক টিম পানি উন্নয়ন বোর্ড, জামালপুর-এর নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করে। পরবর্তীতে টিম সরেজমিনে মাদারগঞ্জ উপজেলার পাকেরদহ ও বালিজুরি এলাকায় প্রায় ৬.৭ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে।

পরিদর্শনে নদী তীর সংরক্ষণে ব্যবহৃত প্লেসিং ও ডাম্পিংয়ের সিসি ব্লকসমূহ পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং মান যাচাইয়ের জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, সিসি ব্লক নির্মাণে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে, যা প্রকল্পের স্থায়িত্ব ও জনস্বার্থকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলছে। সংগৃহীত নথিপত্র ও নমুনা পরীক্ষার পর এ বিষয়ে কমিশন বরাবর বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে বলে জানায় দুদক।

বিআরটিএ রংপুরে ঘুসের ছক: বিকাশ লেনদেনে মিলল সন্দেহজনক প্রমাণ : নাগরিক সেবায় হয়রানি ও ঘুস বাণিজ্যের অভিযোগে এবার দুদকের নজরে আসে বিআরটিএ, রংপুর জেলা কার্যালয়। গাড়ির ফিটনেস সনদ, রুট পারমিট ও ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানকালে ঘুস গ্রহণের অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুদক, সমন্বিত জেলা কার্যালয়, রংপুর থেকে পরিচালিত হয় আরেকটি এনফোর্সমেন্ট অভিযান।
অভিযান পরিচালনা কালে দুদক টিম ছদ্মবেশে বিআরটিএ কার্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে এবং সেবা প্রত্যাশীদের কাছ থেকে সরাসরি অভিযোগ সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করে। পরবর্তীতে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মচারীর মোবাইল ফোনে সংঘটিত বিকাশ লেনদেন যাচাই-বাছাই করা হয়।
যাচাইকালে দেখা যায়, কয়েকজন কর্মচারীর বিকাশ হিসাবে অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক লেনদেন, যা ঘুস লেনদেনের প্রাথমিক সত্যতাকে আরও স্পষ্ট করে।
দুদক টিমের প্রাথমিক মূল্যায়নে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে প্রতীয়মান হয়। এ সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন কমিশনে দাখিল করা হবে।
স্বাস্থ্যসেবায় চরম অনিয়ম: চিকিৎসক অনুপস্থিত, রশিদ ছাড়া ফি আদায় : হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে হয়রানি ও অনিয়মের অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুদক, সমন্বিত জেলা কার্যালয়, হবিগঞ্জ থেকে পরিচালিত হয় আরেকটি এনফোর্সমেন্ট অভিযান।
অভিযান পরিচালনা কালে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত ০২ জন চিকিৎসককে অনুপস্থিত পাওয়া যায়। রোগীদের জন্য নির্ধারিত খাবারের চার্ট পর্যালোচনা করা হয় এবং হাসপাতালের ওয়াশরুম ও টয়লেটের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা যাচাই করে দুদক টিম।
এছাড়া জানা যায়, হাসপাতালের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) পদটি শূন্য, ফলে স্থানীয়ভাবে মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট দিয়ে ল্যাব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
একইভাবে এমটি (রেডিওলজি) পদও শূন্য, যার কারণে চুনারুঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একজন এমটি সপ্তাহে মাত্র দুই দিন বাহুবলে এসে দায়িত্ব পালন করেন।
অভিযান পরিচালনা কালে আরও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে আসে—ল্যাব পরীক্ষার ফি আদায়ের ক্ষেত্রে কোনো ভাউচার বা রশিদ প্রদান করা হয় না; কেবল একটি রেজিস্ট্রার খাতায় এন্ট্রি দেওয়া হয়। এ বিষয়ে ভবিষ্যতে যথাযথভাবে রশিদ প্রদানের নির্দেশনা দিতে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানায় দুদক।
দুদকের বার্তা স্পষ্ট: কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয় : এই একযোগে পরিচালিত এনফোর্সমেন্ট অভিযানের মাধ্যমে দুদক স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—উন্নয়ন প্রকল্প, নাগরিক সেবা কিংবা স্বাস্থ্যখাত, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোনো আপস নেই। সংগৃহীত তথ্য ও প্রমাণাদি পর্যালোচনার পর প্রতিটি অভিযানের বিষয়ে কমিশন বরাবর বিস্তারিত ও পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল করা হবে, যা পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করবে।
দুর্নীতির অন্ধকারে আলো জ্বালাতে মাঠে নামা দুদকের এই অভিযান প্রশাসনে যেমন কাঁপুনি তুলেছে, তেমনি সাধারণ মানুষের মধ্যেও জাগিয়েছে নতুন
