
নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজধানীর নবাবপুর—পুরান ঢাকার বাণিজ্যিক হৃদপিণ্ড। সেই এলাকার শতবর্ষের জনহিতকর প্রতিষ্ঠান মদন-মোহন অন্ন ছত্র ট্রাস্ট এখন নিজেই বাঁচার লড়াইয়ে। ১৯২৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ঐতিহ্যবাহী ট্রাস্টের বিরুদ্ধে উঠেছে কোটি-কোটি টাকা লোপাটের বিস্ফোরক অভিযোগ। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ট্রাস্ট পরিচালনার আড়ালে একটি সঙ্ঘবদ্ধ চক্র বছরের পর বছর ধরে সম্পদ গিলে খাচ্ছে—আর অনাথ-অসহায়দের থালায় ভাত কমছে।

শতকোটি টাকার সম্পদ, হিসাব নেই কোথাও : প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, এক সময় ট্রাস্টের অধীনে ছিল ১৯টি বাড়ি ও ৭/৮টি মার্কেট। এখন সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৭/৮টিতে। নবাবপুর সড়কের ১২২, ১৬৭, ১৯২, ১৯৩ ও ১৯৪ নম্বর হোল্ডিংয়ে রয়েছে ৫টি বহুতল মার্কেট ও আবাসিক ভবন।
এছাড়া কোতোয়ালি থানা এলাকায় ইসলামপুর সড়কের ৫১/এ নম্বর হোল্ডিংয়ে ১০ তলা বাবুলী ইসলামপুর কমপ্লেক্স এবং ওয়াইজঘাট সড়কের ৩/২ নম্বর হোল্ডিংয়ে ১১ তলা বাবুলী স্টার সিটি—দুটি বাণিজ্যিক-আবাসিক ভবন।

সূত্রের দাবি, এসব মার্কেট থেকে প্রতি মাসে অর্ধকোটি টাকারও বেশি ভাড়া ওঠে। একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, বাস্তবে মাসিক ভাড়ার অঙ্ক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু সেই টাকা ট্রাস্টের ব্যাংক হিসাবে জমা না হয়ে ‘ভোগ-বিলাসে’ উধাও হচ্ছে।

কারা এই চক্রের হোতা ? অভিযোগের তীর তিনজনের দিকে—শিবুল (৫২), পরিমল (৬০) ও বিশ্বজিৎ (৫৫)। পরিমল ম্যানেজারের দায়িত্বে থাকলেও দীর্ঘদিন অসুস্থতার কারণে অফিসে অনুপস্থিত। এই সুযোগে সিইও বিশ্বজিৎ ও হিসাবরক্ষক শিবুল কার্যত ট্রাস্টের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন বলে অভিযোগ।
ট্রাস্টি বোর্ডের অন্যতম সদস্য তপন পালও শারীরিক অসুস্থতায় নিষ্ক্রিয়। ফলে বার্ষিক অডিট রিপোর্ট সদস্যদের সামনে উপস্থাপনের বিধান থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ে চলছে ‘নয়-ছয়’—এমন অভিযোগ স্থানীয়দের। গোপন আম-মোক্তারনামা, কোটি টাকার ভাগ-বাটোয়ারা সরেজমিন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য।
অভিযোগ রয়েছে, বিশ্বজিৎ, শিবুল ও পরিমল গোপনে বাবুলী ডেভলপার কোম্পানি লিমিটেড-কে ব্যাপক ক্ষমতাসম্পন্ন আম-মোক্তারনামা দিয়ে ভবন নির্মাণ ও ফ্লোর বিক্রির অধিকার দেন। ১১ তলা ভবনের ৪র্থ থেকে ১১তম তলা পর্যন্ত ৫৬টি ফ্ল্যাট এবং নিচতলা থেকে ৩য় তলা পর্যন্ত বাণিজ্যিক ফ্লোর বিক্রি করে প্রায় ৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ।
ইসলামপুরের ১০ তলা ভবনের ক্ষেত্রেও ৬০ কোটি টাকার গোপন চুক্তির মধ্যে ৩০ কোটি টাকা সংশ্লিষ্ট ট্রাস্ট কর্তারা নিয়েছেন—এমন দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রের। অভিযোগ আরও গুরুতর—নির্মাতা কোম্পানি মাসে মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে বছরের পর বছর ভবন “নির্মাণাধীন” দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে।
অনাথদের থালায় কমছে ভাত : একসময় প্রতিদিন শতাধিক অনাথ-অসহায় মানুষ এখানে ডাল-ভাত-ভাজি পেতেন। এখন সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ৪০-৫০ জনে। সম্প্রতি খাবার বিতরণে উপস্থিত থেকেও ৮২ জনের বেশি অসহায়কে খাবার পেতে দেখা যায়নি। যেখানে ট্রাস্টের সম্পদ শতকোটি টাকার, সেখানে উপকারভোগীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় স্থানীয়দের প্রশ্ন—“অন্ন কোথায় গেল?”
দুদক তদন্ত ও ‘গৃহপালিত’ মিডিয়ার অভিযোগ : কয়েক মাস আগে অভিযোগ যায় দুর্নীতি দমন কমিশন-এ। তদন্তও শুরু হয়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ ও কিছু ‘গৃহপালিত’ গণমাধ্যমকর্মীর তদবিরে সে যাত্রায় রক্ষা পান অভিযুক্তরা। এমনকি বিশ্বজিৎ ও শিবুলের বিরুদ্ধে দুটি করে পাসপোর্ট থাকা এবং ভারতে সম্পদ গড়ার অভিযোগও উঠেছে—যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু নিশ্চিত হয়নি।
বক্তব্য মিলেনি : অভিযোগের বিষয়ে জানতে একাধিকবার মোবাইলে যোগাযোগ করা হলেও শিবুল ও বিশ্বজিৎ ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের দাবি: “এবার কঠোর ব্যবস্থা নিন” : শতবর্ষী এই জনহিতকর প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব এখন প্রশ্নের মুখে। স্থানীয়রা বলছেন, দ্রুত নিরপেক্ষ অডিট, পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং আইনগত ব্যবস্থা না নিলে মদন-মোহন অন্ন ছত্র ট্রাস্ট ইতিহাসের পাতায় নামমাত্র হয়ে যাবে। অনাথ-অসহায়দের দাবি স্পষ্ট—“যারা অন্নের নামে সম্পদ লুটছে, তাদের বিচার চাই।”
সরকারের দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ এখন কী পদক্ষেপ নেয়, সেটিই দেখার বিষয়। নবাবপুরের মানুষ অপেক্ষায়—অন্ন ছত্র কি আবার অন্নের সুবাস ফেরাবে, নাকি লুটেরাদের গহ্বরে বিলীন হবে?
