
গোলাম মোহাম্মদ কাদের , (চেয়ারম্যান জাতীয় পার্টি) : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলে আমরা খুশি। সে কথাটা আমরা নির্বাচন পরবর্তীতে ও সরকার গঠনের পরপরই সরকারি দলকে অভিনন্দন বার্তা দিয়ে জানিয়ে দিয়েছি। নির্বাচন না হলে বা এ ধরনের ফলাফল না হলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। সে অবস্থায় দেশে দুর্ভিক্ষ ও গৃহযুদ্ধ অবধারিত ছিল। ফলে ব্যর্থ রাষ্ট্র ও পর্যায়ক্রমে জঙ্গিকবলিত রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ আভির্ভূত হতো বলে আশঙ্কা করি।

তবে কি নির্বাচনটিকে ভালো নির্বাচন বলা যায় ? আমাদের মূল্যায়ন অনুযায়ী এ নির্বাচনটি ২০১৮/২০২৪ সালের নির্বাচনের থেকেও খারাপ নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচনের গতি প্রকৃতি সম্পর্কে মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন তথ্য, ফলাফল গণনা ও ঘোষণার চিত্র, হ্যাঁ/না ভোটের (বা গণভোটের) মোট ভোটের সঙ্গে দলীয় মোট ভোটের পার্থক্য, দলীয় ভোট, গণভোটের প্রায় দ্বিগুণ ঘোষণা দেওয়া, পরবর্তী সময়ে গণভোটের সংখ্যা বাড়ানো, বাড়াতে গিয়ে অবাস্তব ও ভুল পরিসংখ্যান দিয়ে গোঁজামিল ইত্যাদি এ ধরনের ঘটনা ও কিছু বিষয়কে বিশ্লেষণ করে, অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে ধারণা হয়, এ নির্বাচনের ফলাফল মোটামুটি পূর্ব নির্ধারিত ছিল। তবে, নির্বাচনটি যাতে বাহ্যিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক ও যতটা সম্ভব সুষ্ঠু দেখানো যায় সে বিষয়ে যথেষ্ট মনোযোগ দেওয়া হয়েছিল। লক্ষণীয় বিষয় হলো, জয়ী দল এ কারচুপির সঙ্গে জড়িত ছিল না, বলা যায়। কেননা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে তাদের পক্ষে এত বড় পরিকল্পিত ঘটনা ঘটানোর মতো সুযোগ ছিল না।
উপরোক্ত ঘটনাগুলোর কোনো বস্তুনিষ্ট প্রমাণ আমাদের হাতে নেই। তা ছাড়া, বর্তমান বাস্তবতায় যথাযথ কর্তৃপক্ষের বা বিচারালয়ে এ বিষয়সমূহ নিষ্পত্তির বিষয়ে আমরা আস্থাশীল নই। ফলে আইনগত ভাবে এ নির্বাচন বৈধ বলেই গণ্য হবে, বলা যায়। তবে সাধারণত, সত্য চাপা দিয়ে রাখা যায় না। প্রকৃত ঘটনা কোনো এক সময় জানা যাবে। তখন আমাদের ধারণার সত্যতা পাওয়া যাবে, বিশ্বাস করি। তা ছাড়া, অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সংজ্ঞা অনুযায়ী যে বিষয়গুলো অপরিহার্য এ নির্বাচনে তার ব্যাপক ঘাটতি ছিল।

একটি বৃহৎ দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগসহ আরও বেশ কিছু দলকে নির্বাচন করতে দেওয়া হযনি : এয়োদশ নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ ছিল না। ফলে, অংশগ্রহণমূলক বা অবাধ বলা যায় না। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নিরপেক্ষ পরিবেশ ও সবার জন্য সমান সুযোগ সুবিধা বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু এখানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত দল এনসিপি, ঘনিষ্ঠ দল জামায়াত ও তাদের জোটকে সব ধরনের রাষ্ট্রীয় প্রটোকলসহ, তারা যেন সরকার, এ ধরনের সুযোগ সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

একই ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ : জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি ও তার জোটভুক্ত দলগুলোকে। সরকারের টেলিভিশনে জামায়াত জোটের তিনজন ও বিএনপির প্রধানকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। জাতীয় পার্টিকে এ ধরনের কিছু সুবিধা দেওয়া হয়নি। বরং ভুয়া মামলা দিয়ে জাতীয় পার্টির অনেক নেতা-কর্মীকে ঘরছাড়া করা হয়েছে। তিনজন প্রার্থী জেল থেকে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করেছে। তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলায় তদন্ত হয়নি, চার্জশিট দেওয়া হয়নি।
বার বার জামিন হয়েছে, আবার অন্য মামলায় অজ্ঞাত নামা আসামির তালিকা থেকে আসামি হিসেবে ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’ দেখিয়ে জেলে রেখে দেওয়া হয়েছে। মিথ্যা মামলায় হুলিয়া মাথায় নিয়ে অনেককে নির্বাচনের মাঠে প্রতিযোগিতা করতে হয়েছে। দুজন প্রার্থী নির্বাচন চলাকালীন নিরাপত্তাহীনতার কারণে, নির্বাচন থেকে সড়ে দাঁড়িয়েছেন।
বিগত দেড় বছর ধরে জাতীয় পার্টির মিটিং, মিছিল বা অন্য কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা সৃষ্টি : নির্বাচনের প্রায় দেড় বছর আগে থেকে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত সরাসরি প্রশাসন বা প্রশাসনের ছত্রচ্ছায়ায় এনসিপি, জামায়াত ও বিএনপি যে যখন পেরেছে জাতীয় পার্টির মিটিং, মিছিল বা অন্য কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা সৃষ্টি করেছে। মব সৃষ্টি করে কর্মসূচি ভণ্ডুল করেছে, আমাদের নেতা-কর্মীদের হতাহত করেছে। বিভিন্ন স্থানে জাতীয় পার্টির অফিস ভাঙচুর করেছে। নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়েছে।
সে মামলায় গ্রেপ্তার ও বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়েছে। নির্বাচনের আগে প্রায় বছর খানেক ধরে এবং নির্বাচনের সময় পর্যন্ত উপরোক্ত দলসমূহ বিশেষ করে জামায়াত হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে নির্বাচনকে প্রভাবিত করছে। তা ছাড়া, উপরোক্ত দলসমূহ বিভিন্নভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটারদের, আওয়ামী লীগের সমর্থক সন্দেহ করে সে সকল ভোটারদের এমনকি জাতীয় পার্টির ভোটারদের পর্যন্ত তাদের পক্ষে ভোট না দেওয়ার ভয়াবহ পরিণতির কথা বলে ভয়ভীতি প্রদর্শন করেছে, বলে থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
নিরপেক্ষ পরিবেশে ঠাণ্ডা মাথায় বিচার বিশ্লেষণ করে ভোট দেওয়ার সুযোগ ছিল না ; এ নির্বাচন, অর্থ ও পেশি শক্তি দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত। জাতীয় পার্টি নির্বাচনে নিরপেক্ষ পরিবেশ ও অন্য সকল প্রতিযোগী দলের ন্যায় সমান সুযোগ-সুবিধা পায়নি। বরং নিপীড়ন নির্যাতন ও মামলা হামলার শিকার হয়েছেন। এককথায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও নিরপেক্ষ পরিবেশে সবার জন্য সমান সুবিধা নিশ্চিত ছিল না। সে অর্থে ভালো নির্বাচন বলা যায় না।
জাতীয় পার্টির বর্তমান অবস্থান : জাতীয় পার্টির ফলাফলে আমরা খুশি। যে ধরনের বিরূপ পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল, জাতীয় পার্টির জন্য বড় কিছু বিজয় সম্ভব ছিল না। ধারণাতীত খারাপ ফলাফল ঘোষণার ফলে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ এ ফলাফল গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। জাতীয় পার্টির জনসমর্থনের প্রতি দেশের মানুষের আস্থা আছে বোঝা যায়।
দীর্ঘদিন থেকে জাতীয় পার্টি একটা পরিচয় বিভ্রাট বা আইডেনটিটি ক্রাইসিসে থাকতে হতো : জাতীয় পার্টি সম্পর্কে কোনো আলোচনা আসলেই প্রথম প্রশ্ন দেখা দিত ‘কোন জাতীয় পাটি’। যেহেতু ১৯৯৬ সালের পর থেকে এবং বিশেষ করে ২০১৪-এর পর সুস্পষ্টভাবে সরকারি মদদে জাতীয় পার্টিতে একটি সমান্তরাল সরকারপন্থি বিভাজন রাখা হতো। তাদের কাজ ছিল, জাতীয় পার্টির নাম ব্যবহার করে বা জাতীয় পার্টিতে থেকে জাতীয় পার্টির রাজনীতির বিপক্ষে তৎকালীন সরকারি দল আওয়ামী লীগের দোসর হিসেবে তাদের গণবিরোধী কার্যকলাপে সমর্থন নিশ্চিত করা। এসব সুবিধাবাদি ব্যক্তিদের সহায়তায় জাতীয় পার্টির কর্মসূচি সরকারি সহায়তায় বাধাগ্রস্ত করা হতো। সাধারণভাবে জাতীয় পার্টি দ্বিচারিতা করছে বলে প্রতীয়মান হতো। সে কারণে বিভিন্ন সময়ে গণমুখী কর্মকাণ্ড ও সে কারণে সিংহভাগ নেতা-কর্মীরা হয়রানির শিকার হওয়ার পরও জাতীয় পার্টি জনগণের পক্ষের শক্তি হিসেবে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারেনি।
ত্রয়োদশ নির্বাচনের মাধ্যমে এ বিভাজনটি বিলুপ্ত হয়েছে : আশা করি, এখন থেকে জাতীয় পার্টি একক পরিচয়ে পরিচিতি লাভ করবে। জাতীয় পার্টির শ্লেট এখন পরিষ্কার। সব লেখা মুছে গেছে। নতুন করে লেখার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আমি এবং আমার সঙ্গে যারা আছেন, সবাই অতীতে সবসময় জনগণের পক্ষে ছিলাম ভবিষ্যতেও জনগণের পক্ষে থাকব। জাতীয় পার্টির নিজস্ব গণমুখী রাজনীতি এবং ঐতিহ্যময় বর্ণাঢ্য অতীত আছে। নতুন মুখদের জন্য জাতীয় পার্টি কাম্য হবে, এটাই স্বাভাবিক। সামনে যেকোনো নির্বাচনে আমরা অংশগ্রহণ করব, সেখানেই আমরা এর সুফল পাব আশা করি। শত প্রতিকূলতার মাঝেও আমরা ত্রয়োদশ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছি। যতটা নয় নির্বাচনে জয়লাভের জন্য তার চেয়ে বেশি তৃণমূল থেকে গণমুখী রাজনৈতিক দল হিসাবে পুনর্জন্মের বা নবজন্মের উদ্দেশ্যে।
বর্তমান সরকারের সামনে পাহাড়সম সমস্যা দণ্ডায়মান : এ মুহূর্তে একটি বড় সমস্যা হলো, বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের কাছে বিশ্বের বিভিন্ন পরাশক্তির পরস্পর বিরোধী ব্যবসায়িক ও সমর কৌশল বিষয়ক প্রত্যাশা এবং সে গুলোকে মোকাবিলা করে এগিয়ে যাওয়া।
তা ছাড়া বিদ্যুৎ জ্বালানি ও গ্যাস খাতে বিশাল বকেয়া : অন্যান্য বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের ঋণের সুদ ও আসলের কিস্তি বকেয়া। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রকৃত অবস্থা পরিষ্কার নয়। আশঙ্কা হয়, দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অবস্থা সংকটজনক। সরকারকে সেটা মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক : সকল ধরনের বিনিয়োগ বন্ধ। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও প্রায় বন্ধ। বেকার সমস্যা প্রবল যা প্রতিদিন বাড়ছে। দেশে এখনো উচ্চ হারে মুদ্রাস্ফীতি বিদ্যমান। অর্থনৈতিক মন্দার কারণে অভ্যন্তরীণ কর আদায়ে ঘাটতি হচ্ছে। সরকার চালাতে যে খরচ, কর আদায় ঘাটতির কারণে সরকারকে ঋণ করে বা টাকা ছাপিয়ে মিটাতে হবে। সে ক্ষেত্রে মুদ্রাস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। সরকারের শুধু প্রবাসী আয় ছাড়া রপ্তানি আয় কমতির দিকে। বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি অবশ্যম্ভাবী। টাকার মূল্যমান সামনে কমতে পারে। মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে পারে এ কারণেও। সাধারণ মানুষের আয় কমবে বা আয় থাকবে না কিন্তু ব্যয় বাড়তে থাকবে। অর্ধভুক্ত/অভুক্ত মানুষের সংখ্যা বাড়বে। অভুক্ত হতে থাকবে নতুন নতুন মানুষ। দুর্ভিক্ষের দিকে যেতে পারে দেশ, এ আশঙ্কা আছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবলের ঘাটতি আছে : অভাবের কারণে চুরি, ডাকাতি, খুন রাহাজানি বাড়তে পারে। তাতে করে সামাজিক স্থিতিশীলতা ব্যাহত হতে পারে। ক্ষুধার্ত মানুষের ক্ষোভের কারণে, রাজনৈতিক আন্দোলন শুরু হতে পারে। আওয়ামী লীগসহ অধিকারবিহীন দলগুলো এ আন্দোলনকে বেগবান করতে এগিয়ে আসতে পারে। সে পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট হবার আশঙ্কা আছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া, দেশি/বিদেশি বিনিয়োগ ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে দেশি/বিদেশি অর্থায়ন শুরু হবে না। নতুন কর্ম সংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে না, দেশে অর্থনৈতিক মন্দা কাটবে না। সরকার চালানো কঠিন হবে।
আমাদের সুপারিশ : রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনয়নের দিকে এ সরকারকে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে। সকল দলকে রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। দেশকে বিভাজন না করে ঐক্যবদ্ধ করার প্রচেষ্টা জোরদার করতে হবে। আমরা আশাবাদী, বর্তমান সরকার সস্তা ও অবাস্তব দেশ প্রেমের নামে দেশে হিংসা বিদ্বেষ প্রতিহিংসার রাজনীতির অবসানে উদ্যোগ দিবেন। সকলের মাঝে আস্থা ও নিরাপত্তার পরিবেশ সৃষ্টি করতে সক্ষম হবেন। দেশ তাদের নেতৃত্বে একতাবদ্ধ হবে। সম্মিলিতভাবে, আমরা সবাই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাব। (লেখক : চেয়ারম্যান, জাতীয় পার্টি)
