
নিজস্ব প্রতিবেদক : রাষ্ট্র পরিচালনার সবচেয়ে শক্তিশালী ও সংবেদনশীল স্তর—জেলা প্রশাসন। অথচ সম্প্রতি মিডিয়ায় ফাঁস হওয়া একটি তালিকা দেশজুড়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে : জেলা প্রশাসকরা কি রাষ্ট্রের প্রতিনিধি, নাকি রাজনৈতিক দলের ‘নীরব কর্মী’ ? ফাঁস হওয়া তালিকায় দেখা যায়, দেশের ৬৪ জেলার জেলা প্রশাসকদের একটি বড় অংশ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট—যার মধ্যে জামায়াত, এনসিপি ও বিএনপি-র নাম উঠে এসেছে ভয়াবহ সংখ্যায়।

দলীয় বিভাজনের সংখ্যাগত চিত্র : ফাঁস হওয়া তালিকা অনুযায়ী—জামায়াত: ৩২ জন, এনসিপি: ২০ জন এবং বিএনপি: ১২ জন। অর্থাৎ, প্রশাসনের শীর্ষ স্তরে একটি স্পষ্ট আদর্শিক ও রাজনৈতিক ভারসাম্যহীনতা দৃশ্যমান। বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণ: কোথায় কার দখল?
ঢাকা বিভাগ : ক্ষমতার কেন্দ্রেও জামায়াতের প্রভাব ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, গোপালগঞ্জসহ গুরুত্বপূর্ণ জেলাগুলোতে জামায়াতপন্থী বা জামায়াত-ঘনিষ্ঠ প্রশাসকদের আধিক্য লক্ষ্য করা যায়।

বিশেষভাবে লক্ষণীয়—একাধিক জেলা প্রশাসকের অতীতে বিএনপি থেকে জামায়াতে রূপান্তর। প্রশ্ন উঠছে, এটি কি কেবল ‘ব্যক্তিগত মতাদর্শ পরিবর্তন’, নাকি ক্ষমতার বাতাস বুঝে অবস্থান বদলের প্রশাসনিক সংস্কৃতি ?

চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চল : মিশ্র হলেও নিয়ন্ত্রণে জামায়াত-এনসিপি : চট্টগ্রাম বিভাগের ১১টি জেলার মধ্যে জামায়াত ও এনসিপির উপস্থিতি স্পষ্ট। পার্বত্য তিন জেলাতেও এনসিপি ও জামায়াতপন্থীদের নাম উঠে আসায় জাতিগত সংবেদনশীল অঞ্চলগুলোর প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন জাগছে।

রাজশাহী ও রংপুর : বিএনপি কোণঠাসা : উত্তরাঞ্চলের রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে বিএনপি প্রায় প্রান্তিক। এনসিপি ও জামায়াত—এই দুই শক্তির মধ্যে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ভাগ হয়ে গেছে বলে তালিকা ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে রংপুর বিভাগে—“প্রায় পুরোটাই এনসিপি ও জামায়াতের দখলে”—এই মন্তব্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের নতুন করে ভাবাচ্ছে।
খুলনা ও দক্ষিণাঞ্চল: জামায়াতের দৃঢ় ঘাঁটি : খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরা, নড়াইল, মাগুরা—দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে জামায়াতপন্থী জেলা প্রশাসকদের সংখ্যা চোখে পড়ার মতো। এটি ঐতিহাসিকভাবে ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি অঞ্চলে নতুন ক্ষমতাকাঠামোর ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রশাসন বনাম রাজনীতি: কোথায় রাষ্ট্রের সীমারেখা ?
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক এক মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন—“জেলা প্রশাসকরা রাষ্ট্রের প্রতিনিধি, কোনো দলের কর্মী নন। ফাঁস হওয়া এই তালিকা যদি সত্য হয়, তবে তা দেশের গণতন্ত্র ও নির্বাচনী ব্যবস্থার জন্য এক অশনিসংকেত।” এই বক্তব্যই মূলত পুরো বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা প্রশ্নটিকে সামনে আনে— রাষ্ট্রযন্ত্র কি ধীরে ধীরে দলীয় যন্ত্রে পরিণত হচ্ছে? নির্বাচন, আইনশৃঙ্খলা ও গণতন্ত্র: ঝুঁকি কোথায় ?

জেলা প্রশাসকরাই— নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার আইনশৃঙ্খলা সমন্বয়ের মূল ব্যক্তি, মাঠ প্রশাসনের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক, এই অবস্থানে যদি দলীয় আনুগত্য প্রাধান্য পায়, তবে— নির্বাচন কতটা নিরপেক্ষ হবে ? বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি কতটা ন্যায্য সুযোগ পাবে ? সাধারণ নাগরিক রাষ্ট্রকে কতটা বিশ্বাস করবে ?
শেষ কথা: তালিকা নয়, এটি একটি সতর্ক সংকেত : এই প্রতিবেদন কোনো দলকে সুবিধা বা অসুবিধায় ফেলতে নয়। বরং এটি একটি রাষ্ট্রীয় অ্যালার্ম—যা উপেক্ষা করলে মূল্য দিতে হবে পুরো গণতন্ত্রকে।
ফাঁস হওয়া তালিকা সত্য হোক বা না হোক, এটি স্পষ্ট করে দিয়েছে—প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এখন আর তাত্ত্বিক বিতর্ক নয়, বরং রাষ্ট্রের অস্তিত্বসংক্রান্ত প্রশ্ন। রাষ্ট্র কার হাতে থাকবে—দলের, না জনগণের ? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি ও গণতন্ত্রের গতিপথ।
