
বিশেষ প্রতিবেদক : নতুন মন্ত্রিসভা ঘোষণার পরপরই রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা। বিশেষ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন সরকারের ঘোষিত কয়েকটি মন্ত্রণালয় বণ্টন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে দলীয় ও বিরোধী শিবিরে চলছে বিস্তর বিতর্ক।

আইন মন্ত্রণালয়ে আসাদুজ্জামান, রাজনৈতিক বার্তা না কৌশল ? আওয়ামী লীগকে আইনিভাবে নিষিদ্ধ না করার অবস্থানের পক্ষে পরিচিত আসাদুজ্জামান-কে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়াকে অনেকে দেখছেন একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এটি “প্রতিশোধ নয়, প্রক্রিয়া”–এই নীতির প্রতিফলন হতে পারে।
তবে সমালোচকদের প্রশ্ন—দলীয় অবস্থানের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় আইননীতির সীমারেখা কীভাবে নির্ধারিত হবে?
ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বিতর্কের ছায়ায় : ভূমি প্রতিমন্ত্রী
শহীদ ওসমান হাদীর খুনের মামলায় জামিন আদেশ দেওয়ার ঘটনায় আলোচনায় আসা ব্যারিস্টার কায়সার কামাল-কে ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী করার সিদ্ধান্তে নতুন করে বিতর্ক দানা বেঁধেছে। সমর্থকরা বলছেন, “আইনজীবীর পেশাগত দায়িত্বকে রাজনৈতিকভাবে বিচার করা ঠিক নয়।” অন্যদিকে বিরোধীরা এটিকে “নৈতিকতার প্রশ্ন” হিসেবে তুলে ধরছেন।

পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে আব্দুল আউয়াল মিন্টু, প্রতীকী দ্বন্দ্ব ?
বনখেকো হিসেবে অভিযুক্ত আব্দুল আউয়াল মিন্টু-র হাতে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব—এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে চলছে কটাক্ষ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিবেশ রক্ষার মতো সংবেদনশীল খাতে অতীত বিতর্ক থাকা ব্যক্তির নিয়োগ জনআস্থার প্রশ্ন তুলতে পারে। আবার সরকারপক্ষের যুক্তি—“অভিযোগ আর প্রমাণ এক জিনিস নয়।”

শেখ রবিউল আলম, তিন মন্ত্রণালয়ের ভার, নাকি তিনগুণ বিতর্ক ? চুয়েটের সাবেক শিক্ষার্থী তামিম হত্যাকাণ্ডের মামলার আসামি ও চাঁদাবাজির অভিযোগে আলোচিত শেখ রবিউল আলম-এর হাতে সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌ-পরিবহন—তিনটি বড় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সমালোচকদের মতে, “পরিবহন খাত এমনিতেই দুর্নীতিপ্রবণ—এখানে স্বচ্ছ ভাবমূর্তির মানুষ দরকার ছিল।” সরকারি মহল বলছে, “অভিযোগ মানেই দোষী নয়; দক্ষতাই বিবেচ্য।”
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, অর্থনৈতিক বার্তা নাকি ঝুঁকি ? ৮৪০ কোটি টাকার ঋণখেলাপির অভিযোগে আলোচিত খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির-কে বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া অর্থনৈতিক অঙ্গনে বিস্ময় তৈরি করেছে। অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, এটি ব্যবসাবান্ধব নীতির ইঙ্গিত হতে পারে। তবে প্রশ্ন উঠছে—- ঋণখেলাপির অভিযোগ থাকা ব্যক্তির হাতে অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণ কতটা গ্রহণযোগ্য?
পররাষ্ট্রে খলিলুর রহমান: টেকনোক্র্যাট কার্ড : বিদেশি নাগরিক পরিচয়ের বিতর্কে থাকা খলিলুর রহমান-কে টেকনোক্র্যাট কোটায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত কূটনৈতিক মহলে কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। কেউ বলছেন, আন্তর্জাতিক যোগাযোগে অভিজ্ঞতা কাজে লাগতে পারে। অন্যরা বলছেন, “জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নে স্বচ্ছতা জরুরি।”
রাজনৈতিক কৌশল না বিতর্কিত ভারসাম্য ? পুরো মন্ত্রিসভা বিন্যাসকে অনেকে দেখছেন বিএনপির একটি ‘রাজনৈতিক বাস্তববাদী’ পদক্ষেপ হিসেবে—যেখানে দলীয় আনুগত্য, অভিজ্ঞতা, আর্থিক সক্ষমতা ও রাজনৈতিক ভারসাম্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আবার বিরোধী শিবির এটিকে আখ্যা দিচ্ছে “বিতর্ককে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া” হিসেবে।
সামনে কী ? আদালতে চলমান মামলা ও অভিযোগগুলোর অগ্রগতি জনমত প্রভাবিত করবে। প্রশাসনিক দক্ষতা ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপই শেষ পর্যন্ত মন্ত্রিসভার গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন সরকারের ভাবমূর্তি নির্ভর করবে পররাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক কূটনীতির সফলতার ওপর।
উপসংহার : বাংলাদেশের রাজনীতিতে মন্ত্রিসভা শুধু প্রশাসনিক কাঠামো নয়—এটি একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা। বিতর্ক থাকলেও চূড়ান্ত বিচার হবে কর্মদক্ষতা ও নীতিগত অবস্থানের ভিত্তিতে। এই মন্ত্রিসভা কি সমালোচনাকে পেছনে ফেলে ফলাফল দিয়ে জবাব দিতে পারবে, নাকি বিতর্কই হবে তাদের স্থায়ী ছায়া—সেই উত্তর দেবে সময় ও জনমত।
