
নিজস্ব প্রতিবেদক : বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম, প্রিয় দেশবাসী, আস-সালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ। শুরুতেই মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে শুকরিয়া আদায় করছি। হাজারো শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ—তার স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের অধিকার রক্ষার সংগ্রাম আজ নতুন এক অধ্যায়ে উপনীত হয়েছে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি জবাবদিহিমূলক সরকার আজ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে দেশবাসীকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

স্বাধীনতাপ্রিয়, গণতন্ত্রকামী : জনগণের অদম্য প্রত্যয়ের কারণেই দেশে মানুষের অধিকার, সম্মান ও মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আমি দৃঢ়ভাবে বলতে চাই—মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান; পাহাড়ে কিংবা সমতলে বসবাসকারী; দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে—এই দেশ আমাদের সবার। প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি নিরাপদ, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলাই আমাদের অঙ্গীকার।
আইনশৃঙ্খলা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান : দীর্ঘ দুঃশাসন ও দুর্নীতির কারণে একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল প্রশাসনিক কাঠামো এবং অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমরা দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। জনগণের নিরাপত্তা ও শান্তি ফিরিয়ে আনা আমাদের সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।

জুয়া ও মাদকের বিস্তার : আইনশৃঙ্খলার অবনতির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান চলবে আইন ও বিধিবদ্ধ নিয়মে—কোনো দলীয় প্রভাব, ক্ষমতার অপব্যবহার বা জবরদস্তির স্থান থাকবে না। আইনের শাসনই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার শেষ কথা।

পবিত্র মাহে রামাদান উপলক্ষে আহ্বান : আগামীকাল থেকে শুরু হচ্ছে পবিত্র মাহে রামাদান। আমি দেশবাসীকে রামাদানের শুভেচ্ছা জানাই। রামাদান আত্মশুদ্ধির মাস। এ মাসে ভোগান্তি বাড়ানো নয়, বরং সংযম, সহমর্মিতা ও ন্যায়পরায়ণতার চর্চাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। ব্যবসায়ী ভাইদের প্রতি আহ্বান জানাই—এই পবিত্র মাসকে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করবেন না।
দ্রব্যমূল্য যেন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে না যায়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকুন। একটি মাফিয়া সিন্ডিকেটের পতনের মধ্য দিয়ে আমরা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছি—সব ধরনের অনিয়ম ও সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে সরকার বদ্ধপরিকর, ইনশাআল্লাহ।
ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ—সকল ব্যবসায়ীর স্বার্থ রক্ষা করেই বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। আপনাদের পরামর্শ ও অভিযোগ গ্রহণে সরকার প্রস্তুত। এই সরকার জনগণের সরকার—আপনাদের সরকার।
নিরবচ্ছিন্ন সেবা ও কৃচ্ছতা সাধন : রামাদান মাসে ইফতার, তারাবিহ ও সেহরির সময় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অপচয় রোধে সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানাই। কৃচ্ছতা সাধন শুধু অর্থনৈতিক দায়িত্ব নয়—এটি নৈতিক দায়িত্বও।
সরকারের মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের দিয়ে আমরা দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছি। বিএনপির সংসদীয় দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কোনো এমপি ট্যাক্স-ফ্রি গাড়ি বা প্লট সুবিধা গ্রহণ করবেন না। ন্যায়পরায়ণতা ও জবাবদিহিতার আদর্শ বাস্তবায়নেই আমাদের এই অঙ্গীকার।
অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থা : রাজধানী ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে যানজট ও জনদুর্ভোগ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। রাজধানীর ওপর চাপ কমাতে বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি। মানুষ যেন নিজ জেলা বা বাসস্থান থেকেই নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারেন—সেই লক্ষ্য নিয়ে সারাদেশে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা আধুনিক ও সম্প্রসারিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রেল, নৌ, সড়ক ও সেতু খাতের কার্যক্রম পুনর্বিন্যাস ও সমন্বয়ের কাজ শুরু হয়েছে। সহজ, সুলভ ও নিরাপদ রেলব্যবস্থা গড়ে উঠলে নগরকেন্দ্রিক চাপ কমবে এবং পরিবেশের উন্নতিও হবে।
জনশক্তিকে জনসম্পদে রূপান্তর : আমাদের সমস্যা আছে, তবে সম্ভাবনাও কম নয়। বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে পারলে সেটিই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। বিশ্ব এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর যুগে প্রবেশ করেছে। প্রতিযোগিতামূলক এই বিশ্বে টিকে থাকতে হলে দক্ষতা ও পারদর্শিতার বিকল্প নেই। দেশের শিক্ষার্থী ও তরুণদের উদ্দেশ্যে বলছি—মেধা ও জ্ঞানে নিজেদের প্রস্তুত করুন। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উপযুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
অঙ্গীকার পূরণের প্রত্যয় : গত বছর ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরে আমি বলেছিলাম—“I have a plan।” জাতীয় নির্বাচনের আগে সেই পরিকল্পনার রূপরেখা আপনাদের সামনে তুলে ধরেছিলাম। আপনারা ভোট দিয়ে আমাদের দায়িত্ব দিয়েছেন। এখন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পালা।
দলমত নির্বিশেষে—যারা আমাদের ভোট দিয়েছেন, দেননি, কিংবা ভোট দেননি—এই সরকারের কাছে সবার অধিকার সমান। দল যার যার, রাষ্ট্র সবার। একজন বাংলাদেশি হিসেবে প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য।
পরিশেষে, মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া করি—তিনি যেন আমাদের সবাইকে সুস্থ ও নিরাপদ রাখেন এবং দেশের কল্যাণে কাজ করার তৌফিক দান করেন। আল্লাহ হাফেজ। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।
