
নিজস্ব প্রতিবেদক : “মানুষ মানুষের জন্যে, জীবন জীবনের জন্যে”—মানবতার এই অমর বাণীকে বুকে ধারণ করেই একশ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল নবাবপুরের মদন মোহন পাল অন্নছত্র ট্রাস্ট।।

কিন্তু আজ সেই মানবিক প্রতিষ্ঠানই পরিণত হয়েছে এক ভয়ংকর লুটপাটের আস্তানায়! অভিযোগ উঠেছে—বিশ্বজিৎ ও শিবুল নামের এক চক্র পরিকল্পিতভাবে ট্রাস্টের হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি বেহাত করে গিলে খাচ্ছে, আর শতবর্ষী ঐতিহ্যকে ঠেলে দিচ্ছে ধ্বংসের কিনারায়।
দানবীরের সম্পদ এখন দখলবাজদের কবজায় : ১৯২৪ সালে দানবীর জমিদার মদন মোহন পাল তার বিপুল সম্পত্তি দান করে গড়ে তুলেছিলেন এই অন্নছত্র ট্রাস্ট—যেখানে প্রতিদিন অসহায় মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার কথা ছিল। এক সময় ট্রাস্টের মালিকানায় ছিল ৭-৮টি বাড়ি। এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫টিতে—আর সেই ৫টির মধ্যেও ২টি ইতোমধ্যে আবাসন কোম্পানির হাতে চলে গেছে!

স্থানীয়দের অভিযোগ—এই সম্পত্তি হাতছাড়া হওয়ার পেছনে রয়েছে বিশ্বজিৎ-শিবুল চক্রের সুপরিকল্পিত কারসাজি। হাজার কোটি টাকার সম্পদ বেহাত হলেও, এই চক্র মোটা অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ করেছে বলে অভিযোগ।

রহস্যময় ‘কর্তা’—কারা এই বিশ্বজিৎ ও শিবুল ? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কারা এই বিশ্বজিৎ ও শিবুল? ট্রাস্টডিড অনুযায়ী, ট্রাস্ট পরিচালনার দায়িত্ব থাকার কথা মদন মোহন পালের বংশধরদের হাতে। কিন্তু বাস্তবে নেই কোনো কার্যকর ট্রাস্টি বোর্ড।
স্থানীয় প্রবীণদের মতে, বংশধরদের অনুপস্থিতিকে পুঁজি করেই এই চক্র ট্রাস্টের পুরো নিয়ন্ত্রণ দখল করেছে। তপন কুমার পাল, দীপক কুমার পাল বা মিন্টুরঞ্জন পালের নাম শোনা গেলেও—তাদের কোনো দৃশ্যমান উপস্থিতি নেই। ফলে পুরো ট্রাস্ট কার্যত পড়ে আছে একটি অস্বচ্ছ, প্রশ্নবিদ্ধ গোষ্ঠীর হাতে।
ভুয়া কমিটি, জালিয়াতি আর দখলবাজির মহোৎসব : অভিযোগ রয়েছে—বিশ্বজিৎ-শিবুল একটি ভুয়া কমিটি গঠন করে ট্রাস্টের সম্পত্তি একের পর এক বেচে দিচ্ছে বা দখলে দিচ্ছে বিভিন্ন প্রতারক গোষ্ঠীর হাতে। প্রায় ৩ বিঘা জমির ওপর গড়ে ওঠা একটি বিপণি বিতান গত ৫-৬ বছর ধরে দখলে রেখেছে “বাবুলী কনস্ট্রাকশন” নামে একটি প্রতিষ্ঠান।
চুক্তি ও পাওয়ার অব অ্যাটর্নি উপেক্ষা করে তারা সম্পত্তি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে—যা বড় ধরনের যোগসাজশের ইঙ্গিত দেয়। এর আগেও “মুন পাল কমপ্লেক্স” নির্মাণের মাধ্যমে ট্রাস্টের সম্পত্তি আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে একই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।
ভাড়া যাচ্ছে কোথায়? জাল রসিদের খেল ! মার্কেটগুলোর দোকান মালিকরা নিয়মিত ভাড়া দিলেও—তা আদৌ ট্রাস্টের তহবিলে যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে রয়েছে বড় প্রশ্ন।
অভিযোগ—দোকান মালিকদের দেওয়া হচ্ছে সন্দেহজনক রসিদ। এগুলো আসল না জাল—তা নিশ্চিত করতে পারছে না কেউই। কারণ পুরো হিসাব গোপন রেখেছে বিশ্বজিৎ-শিবুল চক্র।
মানবসেবার আড়ালে কোটি টাকার লুট : প্রতিদিন ১০১ জন অসহায় মানুষকে খাওয়ানোর নামে চলছে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি—এমন অভিযোগও উঠেছে স্থানীয়দের কাছ থেকে। এক সময় ট্রাস্টের সম্পত্তি দেখাশোনা করতেন পরিমল ভট্টচার্য। পরে তাকে সরিয়ে দিয়ে পুরো নিয়ন্ত্রণ নেয় বিশ্বজিৎ-শিবুল চক্র। এরপর থেকেই শুরু হয় লাগামহীন লুটপাট।
তদন্তে গিয়ে মিলল না জবাব : সরেজমিন অনুসন্ধানে নবাবপুরের ১২২ নম্বর হোল্ডিংয়ের অফিসে গিয়ে বিশ্বজিৎকে পাওয়া যায়নি। সেখানে উপস্থিত শিবুল ও অনিল নামের দুই ব্যক্তি জানান—সবকিছু জানেন বিশ্বজিৎ। মোবাইল নম্বর নেওয়া হলেও রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রশ্ন একটাই—দেশে কি আইনের শাসন আছে ? একটি শতবর্ষী দাতব্য প্রতিষ্ঠান দিনের পর দিন লুটপাটের শিকার—তবুও নেই কার্যকর পদক্ষেপ। স্থানীয়দের প্রশ্ন—“দেশে কি মগের মুল্লুক চলছে?”
করণীয়—আইনের আওতায় আনতেই হবে : সচেতন মহলের জোর দাবি, ট্রাস্টটিকে দ্রুত ঢাকা জেলা জজের নিয়ন্ত্রণে নিতে হবে সম্পূর্ণ অডিট ও তদন্ত চালাতে হবে দুদক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে হস্তক্ষেপ করতে হবে লুটপাটে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে
শেষ কথা : মানবতার জন্য গড়ে ওঠা একটি প্রতিষ্ঠান যদি লুটেরাদের হাতে ধ্বংস হয়ে যায়—তবে তা শুধু একটি ট্রাস্টের পতন নয়, সমাজের নৈতিকতারও চরম ব্যর্থতা। এখনই ব্যবস্থা না নিলে—ইতিহাসের পাতায় “মদন মোহন পাল অন্নছত্র ট্রাস্ট” হয়তো টিকে থাকবে, কিন্তু তার মানবিক অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে লুটেরাদের পায়ের নিচে। (চলবে)
