পাম্পে রাতভর অপেক্ষা,সকালে প্রভাবশালীদের দাপট—জামালপুরে জ্বালানি বণ্টনে ভয়াবহ অনিয়ম

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত গ্রাম বাংলার খবর জাতীয় বিশেষ প্রতিবেদন সারাদেশ

বিশেষ প্রতিনিধি, (জামালপুর)  :  জামালপুর শহরে এখন পেট্রোল বা অকটেন পাওয়া যেন ভাগ্যের ব্যাপার। কিন্তু অভিযোগ আরও ভয়াবহ—যদি আপনি একটি প্রভাবশালী ‘সিন্ডিকেট’-এর পরিচিত না হন, তাহলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি রাতভর লাইনে দাঁড়িয়েও মিলছে না এক ফোঁটা জ্বালানি।


বিজ্ঞাপন

আর প্রতিবাদ করলেই হুমকি, ধমক, এমনকি মারধরের চেষ্টা। পুরো পরিস্থিতির মাঝখানে দায়িত্বপ্রাপ্তদের রহস্যজনক নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন ভুক্তভোগীরা।

ময়মনসিংহ বিভাগীয় শহর থেকে গত সোমবার সকালে একটি অনুসন্ধানী সাংবাদিক দল তথ্য সংগ্রহের কাজে জামালপুরে যায়। কিন্তু অনুসন্ধানী কাজ শেষ হওয়ার আগেই তাদের মোটরসাইকেলের জ্বালানি প্রায় শেষ হয়ে যায়।


বিজ্ঞাপন

ফেরার মতো পর্যাপ্ত পেট্রোলও ছিল না। এরপরই শুরু হয় এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া, যা শুধু একটি জেলার জ্বালানি সংকট নয়, বরং পুরো ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা, অস্বচ্ছতা এবং কথিত সিন্ডিকেট-নিয়ন্ত্রিত বণ্টনের চিত্র সামনে নিয়ে আসে।


বিজ্ঞাপন

সাংবাদিক দলের সদস্যরা জানান, প্রথমে তারা জ্বালানি পাওয়ার বিষয়ে স্থানীয়ভাবে সহায়তা খোঁজেন। এক পর্যায়ে ফাঁড়ি পুলিশের এক সদস্য কয়েক জায়গায় যোগাযোগ করে নারিকেলি এলাকার রোকেয়া ফিলিং স্টেশনের সঙ্গে সম্পৃক্ত এক ব্যক্তির নাম ও ফোন নম্বর দেন।

পরে রাতে ওই ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ হলে তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, “চিন্তা করবেন না, রাতেই অথবা সকাল ৭টার মধ্যে পেট্রোল পেয়ে যাবেন। কাজও করতে পারবেন, প্রয়োজনে ময়মনসিংহেও ফিরতে পারবেন।”

এই আশ্বাসে সাংবাদিক দলসহ বহু মোটরসাইকেল আরোহী রাতভর অপেক্ষা করতে থাকেন। কেউ মোটরসাইকেল রেখে,কেউ পাশে বসে,কেউ আবার না ঘুমিয়েই পুরো রাত পার করেন। ভোর হওয়ার আগেই পাম্পের সামনে কয়েকশ মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়।

কিন্তু সকাল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় ভিন্ন এক দৃশ্য। কিছু সময় পর পেট্রোল সরবরাহ শুরু হলেও দেখা যায়, লাইনে থাকা সবাই সমানভাবে জ্বালানি পাচ্ছেন না। কেউ পাচ্ছেন অল্প, কেউ পাচ্ছেন না একেবারেই। আবার লাইনের বাইরে থেকে আসা কিছু মোটরসাইকেলকে নির্বিঘ্নে পাম্পের ভেতরে ঢুকিয়ে পর্যাপ্ত জ্বালানি দিয়ে বিদায় করা হচ্ছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, পাম্পে অবস্থানরত একটি প্রভাবশালী চক্র নিজেদের পরিচিত,ঘনিষ্ঠ ও পছন্দের ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ করছিল। রাত থেকে অপেক্ষমাণ অনেক মোটরসাইকেলকে হঠাৎ করে পেছনে ঠেলে নতুন আসা মোটরসাইকেল সামনে নিয়ে যাওয়া হয়। কয়েকজন এর প্রতিবাদ করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এক ভুক্তভোগী প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন, “এখানে লাইনের কোনো মূল্য নেই। এখানে সিন্ডিকেট আছে।

পরিচিত না হলে পেট্রোল পাওয়া যায় না।” অভিযোগ করার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন ব্যক্তি তার দিকে তেড়ে আসেন। উপস্থিত লোকজনের দাবি, তাকে মারধরের চেষ্টা করা হয়। পরে আশপাশের কয়েকজন পরিস্থিতি সামাল দিলে বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই পুরো ঘটনার সময় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের দৃশ্যত নীরব ও নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে। কেউ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে আসেননি, বরং অভিযোগকারীদেরই নানা অজুহাতে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে,তখন প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু সদস্য এবং তথাকথিত ‘ট্যাগ অফিসার’ হঠাৎ করে মোটরসাইকেলের কাগজপত্র, রেজিস্ট্রেশন ও ড্রাইভিং লাইসেন্স যাচাইয়ের বিষয় সামনে আনেন।

যাদের কাগজপত্রে সামান্য ত্রুটি ছিল অথবা লাইসেন্স সঙ্গে ছিল না, তাদের অনেককে জরিমানা কিংবা মামলার ভয় দেখিয়ে পাম্প এলাকা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু একই সময়ে প্রত্যক্ষদর্শীরা দেখেছেন,একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মোটরসাইকেল একের পর এক লাইনের বাইরে থেকে ঢুকে কোনো বাধা ছাড়াই জ্বালানি নিচ্ছে। তাদের ক্ষেত্রে কাগজপত্র,লাইসেন্স বা নিয়ম-কানুনের কোনো প্রশ্ন তোলা হয়নি।

ভুক্তভোগীদের ভাষায়, “সিন্ডিকেটের বাইরে থাকা কেউ নিজের অধিকার, সিরিয়াল বা অভিযোগের কথা বললেই হঠাৎ নিয়ম-কানুন সামনে চলে আসে। কিন্তু যাদের সঙ্গে পাম্পের লোকজনের সম্পর্ক আছে,তাদের জন্য যেন আলাদা নিয়ম।”

অনুসন্ধানী সাংবাদিক দলের সদস্যরা দাবি করেন,তারা সরেজমিনে এমন দৃশ্যও দেখেছেন, যেখানে কোনো কোনো মোটরসাইকেলে মিটারে যথাযথ হিসাব না দেখিয়েই জ্বালানি দেওয়া হচ্ছে। কখনো একটি মোটরসাইকেল ঢুকিয়ে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পেট্রোল সরবরাহ করা হচ্ছে, আবার কখনো লাইনের বাইরে থাকা ব্যক্তিদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে একাধিক বোতল ও পাত্রে জ্বালানি নেওয়ার ঘটনাও দেখা গেছে।

অভিযোগ উঠেছে, পুরো প্রক্রিয়ায় দায়িত্বে থাকা কিছু ব্যক্তি ও প্রশাসনের সদস্যরা দেখেও না দেখার ভান করেছেন। এমনকি একপর্যায়ে সাংবাদিক দলকে দ্রুত ১ হাজার ৩০০ টাকার পেট্রোল দিয়ে পাম্প এলাকা থেকে চলে যেতে বলা হয়। একই সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধও জানানো হয় বলে দাবি করেন তারা।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়—সাংবাদিক দল আগের রাত থেকে অপেক্ষা করেও পরদিন দুপুর ১২টার পর পর্যন্ত কোনো জ্বালানি পায়নি। অথচ একই সময়ে অসংখ্য মোটরসাইকেল, যেগুলো লাইনে ছিল না,নির্বিঘ্নে জ্বালানি নিয়ে চলে গেছে।

স্থানীয় পরিবহনসংশ্লিষ্টরা বলছেন,শুধু জামালপুর নয়, দেশের বিভিন্ন জেলায় জ্বালানি সংকটকে কেন্দ্র করে এমন সিন্ডিকেট, কালোবাজারি ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দৌরাত্ম্য বাড়ছে। সংকট যত গভীর হচ্ছে, ততই সাধারণ মানুষকে লাইনে দাঁড়িয়ে হয়রানি,বৈষম্য ও অপমানের শিকার হতে হচ্ছে।

তাদের আশঙ্কা,দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে যেকোনো সময় বড় ধরনের সংঘর্ষ, সহিংসতা, এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটতে পারে। কারণ, রাতভর অপেক্ষা করে যখন মানুষ দেখে তার সামনে থাকা অন্যরা লাইনের বাইরে থেকেও জ্বালানি পাচ্ছে, তখন ক্ষোভ ও হতাশা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

ভুক্তভোগীদের দাবি:–নারিকেলি এলাকার সংশ্লিষ্ট ফিলিং স্টেশনের সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করতে হবে।–কোন মোটরসাইকেল কত লিটার জ্বালানি নিয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করতে হবে।–দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা,পাম্প মালিক,ট্যাগ অফিসার ও সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা তদন্ত করতে হবে।

কথিত সিন্ডিকেট, কালোবাজারি ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।–জ্বালানি সরবরাহে ডিজিটাল টোকেন বা প্রকাশ্য সিরিয়াল ব্যবস্থা চালু করতে হবে।–পাম্প এলাকায় প্রশাসনের উপস্থিতি থাকলেও কেন বৈষম্যমূলকভাবে জ্বালানি বিতরণ হয়েছে, তার ব্যাখ্যা দিতে হবে।প্রশাসনের বক্তব্য মেলেনি:
প্রতিবেদন প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষ,স্থানীয় প্রশাসন,জেলা পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং ট্যাগ অফিসারের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

তবে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তীতে প্রকাশ করা হবে। বিশেষজ্ঞদের মত: জ্বালানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মতে, সংকটের সময় সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা না থাকলে সেখানে খুব দ্রুত প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। পাম্পে যদি প্রকাশ্য তালিকা,ডিজিটাল টোকেন,সিসিটিভি মনিটরিং এবং প্রশাসনের তাৎক্ষণিক নজরদারি না থাকে,তাহলে সাধারণ মানুষের অধিকার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তাদের মতে,জ্বালানি সংকটের সময় কারা কত লিটার জ্বালানি পেল,কীভাবে পেল,কার নির্দেশে পেল—এসব তথ্য প্রকাশ্যে আনতে হবে। না হলে সাধারণ মানুষ যেমন প্রতারিত হবে, তেমনি দুর্নীতি ও প্রভাবশালী চক্র আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।এখন প্রশ্ন একটাই: রাতভর লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষ কি শুধুই হয়রানির শিকার হবেন? আর পরিচিতি ও প্রভাব থাকলেই কি মিলবে জ্বালানি?

জামালপুরের এই ঘটনা এখন শুধু একটি পাম্পের অনিয়মের অভিযোগ নয়—এটি রাষ্ট্রের নজরদারি,প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং সাধারণ মানুষের ন্যায্য অধিকার নিয়ে বড় এক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন দেখার বিষয়,অভিযোগের বিরুদ্ধে তদন্ত হয় কি না,আর জ্বালানি বণ্টনের আড়ালে থাকা কথিত সিন্ডিকেটের মুখোশ খুলে যায় কি না।

👁️ 206 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *