ভুয়া “প্রাচীন পিলার-কয়েন” বাণিজ্যে শত কোটি টাকার প্রতারণা : কৃষকলীগ নেতা মাকসুদ–সোহেল সিন্ডিকেটের ভয়ঙ্কর জাল-জালিয়াতি!

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক  : দেশজুড়ে নীরবে বিস্তার ঘটেছে এক ভয়ংকর প্রতারণা সাম্রাজ্যের—যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী সংগঠন কৃষকলীগের দুই প্রভাবশালী নেতা মাকসুদুল ইসলাম ও মাজারুল ইসলাম সোহেল।


বিজ্ঞাপন

“প্রাচীন পিলার ও কয়েন” নামের এক অভিনব প্রতারণার ফাঁদ পেতে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে তাদের নেতৃত্বাধীন একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন প্রতারণা নয়—বরং সুপরিকল্পিত, উচ্চপর্যায়ের টার্গেটিং ও মনস্তাত্ত্বিক কৌশল প্রয়োগ করে গড়ে তোলা একটি শক্তিশালী অপরাধচক্র।

বিলাসবহুল ফাঁদে ‘ঐতিহাসিক সম্পদ’ নাটক  : সোহেলের নেতৃত্বে পরিচালিত চক্রটি সাধারণ ধাতব বস্তু, পাথর কিংবা সিলিন্ডার আকৃতির জিনিসকে বিশেষ রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় কৃত্রিমভাবে “প্রাচীন” রূপ দিত। প্যাটিনা, দাগ, ক্ষয়—সবকিছু নিখুঁতভাবে সাজিয়ে এগুলোকে দুর্লভ ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে উপস্থাপন করা হতো।


বিজ্ঞাপন

এরপর শুরু হতো মূল খেলা—ঢাকার পাঁচতারকা হোটেলের লাউঞ্জ, কনফারেন্স রুম কিংবা অভিজাত রেস্টুরেন্টে আয়োজন করা হতো ব্যক্তিগত প্রদর্শনী। নিজেকে “বিশেষজ্ঞ” পরিচয়ে উপস্থাপন করে সম্ভ্রান্ত ও বিত্তশালী ব্যক্তিদের সামনে তৈরি করা হতো এক ধরনের বিশ্বাসযোগ্যতার আবহ। “গোপন বিনিয়োগ সুযোগ”, “আন্তর্জাতিক কালেক্টরদের চাহিদা”—এমন সব গল্পে মোহিত করে কোটি কোটি টাকার লেনদেন সম্পন্ন করা হতো।


বিজ্ঞাপন

কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ : ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্য ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে— প্রিমিয়ার ব্যাংকের চেয়ারম্যান ডা. এস বি ইকবালের কাছ থেকে প্রায় ৪০ কোটি টাকা, ডজলেন গ্রুপের আরিফের কাছ থেকে প্রায় ১৬ কোটি টাকা এবং সিবিএম গ্রুপের জয়নাল ওরফে জামান সাহেবের কাছ থেকে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা।

এ তালিকা এখানেই শেষ নয়—অভিযোগ রয়েছে, আরও বহু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে, যার প্রকৃত পরিমাণ কয়েকশ কোটি টাকাও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
লেনদেন শেষে প্রতারকেরা হঠাৎ করেই গা ঢাকা দিত অথবা ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে সময়ক্ষেপণ করত। পরবর্তীতে পরীক্ষাগারে যাচাই করে দেখা গেছে—এসব তথাকথিত “প্রাচীন নিদর্শন” আসলে সম্পূর্ণ ভুয়া।

দেশজুড়ে বিস্তৃত প্রতারণা নেটওয়ার্ক  : ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা ও রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই প্রতারণার শিকার হয়েছেন শতাধিক মানুষ। উচ্চবিত্ত, ব্যবসায়ী, এমনকি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও রেহাই পাননি এই সুসংগঠিত প্রতারণা থেকে।

জমি জালিয়াতিতেও জড়িত একই সিন্ডিকেট  ?  অন্যদিকে, একই চক্রের আরেক মুখ—মাকসুদুল ইসলাম—ইতোমধ্যে জমি জালিয়াতির মামলায় কারাগারে। মিরপুরের বাউনিয়া এলাকায় এক ব্যক্তির জমি জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় আদালত তার জামিন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠিয়েছে।

সিআইডি তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করলে বিচারক মাকসুদুল ইসলামসহ চারজনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি—অর্থ প্রতারণা ও জমি জালিয়াতি, এই দুই অপরাধই একই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে থাকতে পারে।

প্রমাণের পাহাড়, তবুও প্রশ্ন—কখন হবে বিচার ?  ভুক্তভোগীরা ইতোমধ্যে ব্যাংক লেনদেনের তথ্য, রশিদ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কথোপকথন, প্রদর্শিত বস্তু এবং প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ সংগ্রহ করেছেন। তবুও এখনো পর্যন্ত বড় ধরনের দৃশ্যমান আইনি অগ্রগতি না থাকায় প্রশ্ন উঠছে—এই শক্তিশালী চক্রের বিরুদ্ধে আদৌ কি কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে?

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা  : ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের মতে, “প্রাচীন” দাবি করা যেকোনো বস্তু যাচাই ছাড়া কেনা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হতে পারে। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ছাড়া এসব দাবির কোনো ভিত্তি নেই। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের কর্মকাণ্ড স্পষ্টভাবে প্রতারণা, জালিয়াতি এবং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের আওতায় পড়ে—যার জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।

আস্থার সংকটে সমাজ  :  বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের সিন্ডিকেট কেবল অর্থ লুটেই সীমাবদ্ধ নয়—এটি সমাজে আস্থার গভীর সংকট তৈরি করছে। ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে যদি এ ধরনের প্রতারণা বারবার পার পেয়ে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয় অপেক্ষা করছে।

শেষ কথা : “দুর্লভ সম্পদ”, “গোপন বিনিয়োগ”, “অস্বাভাবিক লাভ”—এসব শব্দের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে ভয়ংকর প্রতারণা। সংশ্লিষ্টরা তাই স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন—যাচাই ছাড়া কোনো বড় বিনিয়োগ নয়, আর সন্দেহজনক প্রস্তাব দেখলেই সতর্ক থাকুন। এখন দেখার বিষয়—শত কোটি টাকার এই চাঞ্চল্যকর প্রতারণার জাল ভেদ করে সত্য কতদূর সামনে আসে, আর বিচার কতটা নিশ্চিত হয়।

👁️ 201 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *